ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

গানের মানুষ হওয়ার জন্য কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই


বিনোদন ডেস্ক photo বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৭-১০-২০২৬ সকাল ৭:৩৪

প্রশ্ন : আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই।

বেলাল খান-আমার বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার নলুয়া গ্রামে। এসএসসি পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেছি। পরে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার জন্য প্রথম ঢাকায় আসি। তার আগে ঢাকা সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল মূলত বইপত্র থেকে পাওয়া।

: সংগীতের প্রতি আপনার আগ্রহ তৈরিতে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল?

-আমাদের নলুয়া বাজারে মিজান মামার একটি সিডির দোকান ছিল। স্কুল-মাদ্রাসার ক্লাস শেষ করে বন্ধুরা মিলে সেখানে আড্ডা দিতাম। দোকানে প্রতিদিন নতুন নতুন গানের অ্যালবাম আসত। আমি মন দিয়ে সেগুলো শুনতাম। মামা কখনো বাইরে গেলে আমাকে দোকান দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যেতেন। সেই সুযোগে যত অ্যালবাম ছিল, সব শুনে ফেলতাম। এখন মনে হয়, আমার সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে সেই সিডির দোকানের অনেক অবদান রয়েছে।

: আপনার পরিবারে কি সংগীতচর্চার পরিবেশ ছিল?

-আমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। আমাদের পরিবারে গানকে পেশা হিসেবে নেওয়ার বিষয়টি সহজভাবে দেখা হতো না। তাই গানের প্রতি আমার আগ্রহ কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা পরিবারের কাউকে বলতাম না। তবে মাদ্রাসার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গজল গাইতাম। বার্ষিক অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজন কিংবা জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। অনেক জায়গায় পুরস্কারও পেয়েছি। পুরস্কার পেলে পরিবার খুশি হতো। কিন্তু আমি যে মনে মনে সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, সেটা কেউ জানত না।

: ঢাকায় এসে সংগীতচর্চায় কী পরিবর্তন আসে?

-ঢাকায় আসার পর ধীরে ধীরে নতুন একটি জগতের সঙ্গে পরিচয় হয়। উচ্চমাধ্যমিকের পর প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি। পরে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমার সংগীতচর্চাকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। টিএসসি, শহীদ মিনার, বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাসের আড্ডায় নিয়মিত গান করতাম। বন্ধুরা গান গাওয়ার সুযোগ করে দিত। আমি গান শুরু করলে অনেকে নিজেদের কথা থামিয়ে শুনত। তখন থেকেই বুঝতে পারতাম, মানুষ আমার গান পছন্দ করছে।

: সংগীতাঙ্গনে কাজ পাওয়ার জন্য কীভাবে চেষ্টা শুরু করেছিলেন?

-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রায়ই বেইলি রোডে চলে যেতাম। তখন সেখানে অনেক রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল। স্টুডিওর সামনে বসে থাকতাম। কেউ আমাকে চিনতেন না, আমিও তেমন কাউকে চিনতাম না। কিন্তু সেখানে গেলে আমার স্বপ্নের মানুষদের দেখতে পেতাম। গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও শিল্পীদের আসা-যাওয়া দেখতাম। আস্তে আস্তে কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। আমার উদ্দেশ্য ছিল সংগীতের জগতে প্রবেশ করার পথ খুঁজে বের করা।

: শুরুর দিকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোনো ঘটনা এখনো মনে পড়ে?

-এমন অনেক ঘটনা আছে। একবার একজন পরিচিত সংগীত পরিচালকের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমার গান শুনে কণ্ঠের প্রশংসা করলেন। বললেন, আমার কণ্ঠে একটি অ্যালবাম করতে চান। কিন্তু অ্যালবামটি করতে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা লাগবে বলে জানালেন। তখন আমার পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। পরিবার থেকে মাসে মাত্র ৩ হাজার টাকা পেতাম। সেটি দিয়েই সব খরচ চালাতে হতো। আমি টাকা দিতে পারব না জানানোর পর তিনি বললেন, আমার নাম যেহেতু বেলাল, আর আল্লাহ ভালো গলা দিয়েছেন, তাই যেন আজান দিই। কথাটি আমাকে ভীষণ আঘাত করেছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে রমনা পার্কে গিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। কয়েক দিন বিষয়টি মাথা থেকে বের করতে পারিনি।

পরে সেই কষ্টই আমার মধ্যে নতুন জেদ তৈরি করে। মনে হয়েছিল, আমাকে প্রমাণ করতেই হবে যে আমি গান গাইতে পারি।

: আপনার অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘পাগল তোর জন্য রে’। গানটির প্রথম ভাবনা কীভাবে এসেছিল?

-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই নিজের মনে আসা সুর ও গানের ভাবনা ক্যাসেটে রেকর্ড করে রাখতাম। কোনো কবিতার লাইন কিংবা মনের মধ্যে আসা সুর ভালো লাগলে সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ করতাম। তখন আমাদের এক বন্ধু ছিল, যার প্রেমের গল্প প্রায়ই শুনতাম। সে একটি মেয়েকে খুব পছন্দ করত, কিন্তু মেয়েটি তাকে গুরুত্ব দিত না। বন্ধুর সেই প্রেমের গল্প, আবেগ আর আমাদের আড্ডার পরিবেশ থেকেই একসময় ‘পাগল তোর জন্য রে’ কথাটি মাথায় আসে। প্রথমে শুধু এই অংশটুকুই সুর করে রেখেছিলাম। তখনো জানতাম না, এক দিন এই গানই আমাকে মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলবে। মজার ব্যাপার হলো ‘পাগল তোর জন্য রে’ গানটি প্রথমে আমার গাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু ঘটনাক্রমে গানটি শেষ পর্যন্ত আমার কণ্ঠে প্রকাশিত হয়। গানটি প্রকাশের পর মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ সাড়া পাই। এত মানুষ গানটি শুনবেন, আমাকে খুঁজবেন-এটা কল্পনাও করিনি।

: কিছুদিন আগে ‘যদি আরেক জনম আমি পাই গো’ গানটি আপনার কণ্ঠে নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে। গানটি করার অভিজ্ঞতা কেমন?

-গানটি করার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। আমার এক সিনিয়র বন্ধু অনেক দিন ধরে বলছিলেন, গানটি আমার কণ্ঠে ভালো লাগবে। পরে মূল গানসহ কয়েকটি পরিবেশনা শুনি। একদিন স্টুডিওতে কাজের ফাঁকে শাহরুখকে বললাম, পিয়ানোয় একটু সুর ধরতে। তারপর নিজের মতো করে গানটি গাইলাম। খুব সাধারণ একটি আয়োজন ছিল।

পরে রেকর্ডিং শুনে ভালো লাগল। কাছের কয়েকজনকে শোনালাম। ভিডিওটিও খুব সাধারণভাবে ধারণ করা হয়েছিল। পরে সাদাকালো করে প্রকাশ করি। এত মানুষ গানটি পছন্দ করবেন, তা ভাবিনি।

: অনেক জনপ্রিয় গান আপনার কণ্ঠে এসেছে। নিজের কোন গানটি নিয়ে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি ছিল?

-আমার নিজের তৈরি অনেক গান আছে, যেগুলো নিয়ে অনেক আশা ছিল। মনে হয়েছিল, গানগুলো মানুষের খুব ভালো লাগবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি। আবার এমন গানও আছে, যেগুলো নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা করিনি, অথচ সেগুলো মানুষের কাছে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

: চলচ্চিত্রে গান করতে গিয়েও কি কখনো হতাশ হয়েছেন?

-কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছিলাম। পরে দেখেছি, সিনেমায় গানগুলো আমার কণ্ঠে নেই, অন্য শিল্পীর কণ্ঠে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রথমদিকে এ ধরনের ঘটনায় খারাপ লাগত। কিন্তু পরে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছি। একটি চলচ্চিত্রের জন্য একই গান একাধিক শিল্পীকে দিয়ে রেকর্ড করানো হতে পারে। পরিচালক বা প্রযোজক চলচ্চিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী যাঁর কণ্ঠ উপযুক্ত মনে করেন, সেটিই ব্যবহার করেন। এখন এসব বিষয় নিয়ে খুব বেশি মন খারাপ করি না। এটাও পেশাগত জীবনের একটি অভিজ্ঞতা।

: সংগীতাঙ্গনে সিন্ডিকেট কিংবা গ্রুপিংয়ের প্রভাব কতটা?

-সংগীতাঙ্গনে রাজনীতি আছে, গ্রুপিং আছে। তবে এগুলো শুধু সংগীতের ক্ষেত্রে নয়, প্রায় সব পেশায়ই কমবেশি রয়েছে। আমি একটা বিষয় বিশ্বাস করি, আপনার গান যদি মানুষ গ্রহণ করেন, তাহলে কোনো সিন্ডিকেটই আপনাকে আটকে রাখতে পারবে না।

: আগের গানের সঙ্গে বর্তমান সময়ের গানের পার্থক্য কোথায় দেখেন?

-আগের সময়ের গানগুলোতে কথা ও সুরের প্রতি খুব বেশি যত্ন নেওয়া হতো। একটি গান তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই আলাদা একটা সাধনা ছিল। তখন প্রযুক্তিগত সুবিধা কম ছিল। শিল্পীদের অনেক সময় পুরো গান একসঙ্গে গাইতে হতো। বারবার অনুশীলন করতে হতো। ফলে একটি গান শিল্পীর ভিতরে গভীরভাবে গেঁথে যেত। এখন প্রযুক্তি অনেক উন্নত। রেকর্ডিং ও সংগীতায়োজনে অসাধারণ সব সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শুধু সুন্দর সাউন্ড হলেই ভালো গান তৈরি হয় না। গানের কথা, সুর, অনুভূতি ও পরিবেশনায় গভীরতা থাকতে হবে। প্রযুক্তি সংগীতকে সুন্দর করতে পারে, কিন্তু গানের আত্মা তৈরি করতে পারে না।

: এখনকার গানের কথার মান নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

-একটি ভালো গানের জন্য সুন্দর কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে অনেক গানে সাহিত্যের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। শব্দচয়ন, ভাব, আবেগ-সবকিছুর মধ্যে গভীরতা পাওয়া যেত। এখনো ভালো গান হচ্ছে, ভালো গীতিকার আছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত গান প্রকাশের প্রবণতার কারণে কথার মান নিয়ে যথেষ্ট কাজ করা হচ্ছে না। আমি মনে করি, গানের কথার প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। শুধু সহজে জনপ্রিয় হওয়ার মতো কিছু শব্দ বসিয়ে দিলেই একটি গান দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

গানের কথা এমন হওয়া উচিত, যা শ্রোতার মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়।

: এত বছরের সংগীতজীবনে নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন কী মনে করেন?

-আমার যতটুকু অর্জন, সবই দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফসল। ছোটবেলায় যখন শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, তখন জানতাম না কীভাবে সেই জায়গায় পৌঁছাব। ঢাকায় এসে অনেক মানুষের কাছে গিয়েছি, কাজের সুযোগ চেয়েছি, প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। কিন্তু চেষ্টা বন্ধ করিনি। আজ মানুষ আমার গান শোনেন, ভালোবাসেন-এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শিল্পী হিসেবে মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় অর্জন আর কিছু হতে পারে না।

: নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

-প্রথম পরামর্শ হলো চেষ্টা করতে হবে। আমি ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করতাম, মানুষ চেষ্টা করলে সফল হতে পারে।

আজ পর্যন্ত আমার যতটুকু অর্জন, সবই নিজের চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফল। দ্বিতীয়ত, সংগীতকে ভালোভাবে শিখতে হবে। একজন ভালো শিল্পী হতে হলে শুধু কণ্ঠ সুন্দর হলেই হয় না। সংগীতের নিয়ম, বিভিন্ন ধারা, সুর ও তাল সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এখন প্রযুক্তির কারণে অনেক কিছু সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু সংগীতের মৌলিক শিক্ষার বিকল্প নেই। গানের মানুষ হওয়ার জন্য কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। সংগীতকে সময় দিতে হবে, সাধনা করতে হবে। রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে দীর্ঘদিন ভালো গান করার যোগ্যতা অর্জন করা বেশি।

শান্তা / শান্তা