ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

পেট্রোবাংলার দেউলিয়া দশা, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অনেক দেশ!


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯-১০-২০২৬ দুপুর ১০:৫৪

চড়াদামে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে মারাত্মক আর্থিক সংকটে ভুগছে পেট্রোবাংলা। নেতিবাচক মূলধনের কারণে অনেক দেশেই আরও বাকিতে পণ্য দিতে রাজি হচ্ছে না। সম্প্রতি একটি দেশের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির আলোচনা এ কারণে ভেস্তে গেছে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।

তবে সেই দেশটির নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ওই কর্মকর্তা। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, জি-টু-জি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির বিষয়টি অনেক অগ্রগতি হয়েছিল। পেট্রোবাংলার আর্থিক বিবরণী দেখার পরে বাকিতে এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে আপত্তি তোলেন। আমরা তখন বলেছি, আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠান, আপনিও সরকারি প্রতিষ্ঠান! আমরা আরও অনেক দেশের সঙ্গে ব্যবসা করি, এখানেও একই ফর্মূলা হবে। এলএনজি বাংলাদেশে আসবে, বিল জমা দেবেন আমরা পেমেন্ট দেবো। এতে তারা সম্মতি না দিলে আলোচনাটি ভেস্তে যায়।

ওই কর্মকর্তা জানায়, পেট্রোবাংলা এখন ঋণাত্মক মূলধনে ভূগছে। পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার পরিচালনাগত মুনাফায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে পরিচালনাগত মুনাফা ছিল প্রায় ৫ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের মূল পরিচালনাগত মুনাফা প্রায় ৭৩.৩৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পরিচালনাগত মুনাফা হ্রাসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি চরম নগদ অর্থ সংকটে পড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অপারেটিং কার্যক্রম থেকে নেট ক্যাশ ফ্লো ১ হাজার ৫,৪৭৬ কোটি টাকা ইতিবাচক থাকলেও, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ঋণাত্মকে রূপ নিয়েছে। এই বিপুল নগদ ঘাটতির প্রধান কারণ হলো এলএনজি অপারেশনাল বাবদ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা নগদ পরিশোধ করতে হয়েছে।

নগদ অর্থের এই তীব্র ঘাটতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলাকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হতে হয়েছে। ব্যাংক ও অন্যান্য উৎস থেকে নতুন করে ৪৯ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন টাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং ২৬ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন টাকা স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রদেয় কর ও শুল্ক বাবদ দায়ের পরিমাণ ২০২৫ সালে ৬৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নগদ টাকার অভাবে পেট্রোবাংলা পরিশোধ করতে পারেনি।

মোট পুঞ্জীভূত লোকসান মূলধনের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় এখনো দেউলিয়া দশার মধ্যে রয়েছে। নিজস্ব অপারেটিং আয় দিয়ে এলএনজি আমদানি এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা পেট্রোবাংলার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন ভর্তুকির দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু সেই ভর্তুকির অবস্থায়ও বেসামাল হয়ে পড়েছে ইরান যুদ্ধের কারণে। কমদামে বিক্রির কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে।

প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে খরচ পড়ছে ১১৯ টাকার মতো। দেশীয় গ্যাসের দামের সঙ্গে মিশ্রণের পর ৫২.১৮ টাকা (জুলাই-নভেম্বর) গিয়ে ঠেকেছে। গড়ে ২৩.৯০ টাকা দরে বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ২৮ টাকা ২৮ পয়সা।

একদিকে ঘাটতি অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া সংকটের মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে। এক বিদ্যুৎ খাতের কাছে (৩১ আগস্ট) বকেয়া দাঁড়িয়ে ১৬ হাজার ১৩৫ কোটি। বিসিআইসির কাছে ১ হাজার ৮২০ কোটি এবং শিল্পকারখানার কাছে ২ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। নানা কারণে বিনিয়োগের সক্ষমতা হারিয়ে দিনে দিনে রুগ্ন হয়ে পড়ছে পেট্রোবাংলা।

এই ঘাটতি কমাতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর জরুরি ছিল। সেখানে বর্তমান উৎপাদন ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনেই কয়েক লাখ ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এখন বিকল্প রয়েছে গ্যাসের দাম বাড়ানো। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি কতটা সহ্য করতে পারবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এমপি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ১০-১২ ডলারের এলএনজি এখন ৩০ ডলার দিয়ে কিনতে হচ্ছে। কেউ বুঝতে চায়না আমাদের সমস্যা, এখনও সমস্যার মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। বেশিদামে কিনে কম দামে বিক্রি করছি, জনগণ সেই প্রাইস দিতে রাজি না।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। স্পট মার্কেট থেকে কিনলে এক কার্গো এলএনজিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মতো বেশি দিতে হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে জিটুজি ভিত্তিতে (কাতার এবং ওমান) থেকে গ্যাস আসা বন্ধ থাকায় লোকসান বাড়ছে। চলতি মাসে একটি জাহাজ হরমুজ পার হতে পেরেছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ফেলেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঘাটতি মেটানোর বিষয়টি সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। জ্বালানি একটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য, না দেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুন-মার্চ) গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। তখন গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকা থাকায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর নিয়ে শঙ্কায় পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলা বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস কিনে থাকে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি ঘনমিটারের দাম দেওয়া হয় ১ টাকা, বাপেক্সকে ৪ টাকা। শেভরন বাংলাদেশকে ১২ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৭৬ ডলার) আর টাল্লোকে দেওয়া হয় প্রায় ১০ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৩১ ডলার) হারে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম পড়েছে ৪৬ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.৬৬ ডলার) এবং ওমান থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ৪৪ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.০৯ ডলার)।

দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা, আর ৩০ শতাংশ আমদানির পর দাঁড়াচ্ছে ৫২.১৮ টাকা। ৩০ শতাংশ আমদানিতে ভর্তুতি সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ৭০ শতাংশ আমদানির প্রাক্কলনে কি দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়। তারপরও বিগত সরকারগুলো আমদানির দিকেই ঝুঁকেছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় যখন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি ছিল। তখন আমদানি পথে পা বাড়ানোর কারণে আজকের মহাসংকট বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সেই আমদানির চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে বর্তমান সরকারও। দ্বীপ জেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস আনতে ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা জন্য যখন (ভোলা-বরিশাল) পাইপলাইন আটকা, তখন ২৪ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির জন্য মহেশখালী-বাখরাবাদ সমান্তরাল পাইপলাইন প্রকল্প বেশ জোরেশোরেই এগিয়ে চলছে। ফেনী-বাখরাবাদ অংশের ঠিকাদার নিযুক্তের কাজও প্রায় চূড়ান্ত বলা যায়।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে কমবেশি ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।

এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৫৮৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। বেশি উদ্বেগের বিষয় বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া।ফিল্ডটি থেকে এখনও সাড়ে ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস যোগান আসছে। এক সময়ে ১৩৫০ মিলিয়নের মতো উৎপাদন দিতো, এখন ৭৩৬ মিলিয়নে নেমে গেছে। মজুদ কমে আসায় দ্রুতই কমে যাচ্ছে উৎপাদন।

aliul / aliul

দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

পেট্রোবাংলার দেউলিয়া দশা, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অনেক দেশ!

এলপিজি নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি ক্যাবের

২৮ অক্টোবর ২০২৬: আজকের স্বর্ণের দাম

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ: আইএমএফ

২৭ অক্টোবর ২০২৬: আজকের স্বর্ণের দাম

পুনর্মূল্যায়নে একমি ল্যাবরেটরিজের সম্পদ বাড়লো ৮০ কোটি টাকা

পাঁচ কোম্পানির নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা

জনতা-বেসিক ও অগ্রণী ব্যাংকে নতুন এমডি

ডিজিটাল লেনদেনে বড় পরিবর্তনের আশা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালকের

বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম

ব্যাংকের ৪২ কোটি টাকা আত্মসাতে দুদকের তদন্তে ৬ আসামি

সাইবার হামলার শঙ্কা, এবার বন্ধ জনতা ও বেঙ্গল ব্যাংকের ওয়েবসাইট