ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

অসাম্প্রদায়িক চেতনার আমৃত্যু সৈনিক জননেতা মোহাম্মদ নাসিম


মানিক লাল ঘোষ photo মানিক লাল ঘোষ
প্রকাশিত: ১৪-৬-২০২২ দুপুর ১২:৬

সময় কত দ্রুত বয়ে যায়! এইতো সেদিনের  কথা , দেখতে দেখতে পার হয়ে গেলো দু'টি বছর। ২০২০ সালের ১৩ জুন সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কর্মীবান্ধব এই জননেতা। মাটি আর মানুষের সাথে ছিল যার নিবিড় সম্পর্ক। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন জননেতা মোহাম্মদ নাসিম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্ট্রোক করেন তিনি। এরপর অস্ত্রোপচার সফল হলেও সংকটাপন্ন ছিল শারীরিক অবস্থা। সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিলো চিকিৎসকের। সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জন্য সর্ব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে অগণিত নেতাকর্মীদের চোখের জলে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন মোঃ নাসিম।

জাতীয় চার নেতার অন্যতম ছিলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। আজীবন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য লড়াই করেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আস্থা রেখে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মোহাম্মদ নাসিমও  বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াই-সংগ্রামে মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন প্রথম কাতারে। গণমানুষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে তাঁর অবদান,  আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ত্যাগ আজ নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। দলের যেকোনো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাঠে। রাত আর দিন নয় নেতাদের বিপদে ফোন ধরেছেন সব সময়। যদি কোনো কারণে ফোন ধরতে না পারতেন, পরবর্তীতে সুযোগমত কলব্যাক করেছেন প্রতিনিয়ত।নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনবান্ধব ও কর্মীবান্ধব নেতা। এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার মতো নয়। শুধু নেতাকর্মীই নয়, সাংবাদিকদের কাছেও প্রিয়ভাজন ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ছিলেন গণমাধ্যমকর্মীদের নিউজের খোরাক। যে কোনো সমস্যা ও সংকটে পাশে থাকতেন অভিভাবক হয়ে। তাঁর মৃত্যুর পর অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মীদের চোখের জল তার উদাহরণ । অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক জানিয়ে লিখেছিলেন দেশের জনগণ হারালো একজন জননেতাকে আর আমরা হারালাম অভিভাবক।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের  চারটি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন  মোহাম্মদ নাসিম। বিভিন্ন সময় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব যেমন সফলভাবে পালন করেছেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবেও  সফল ছিলেন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় একবার ব্রেন স্ট্রোক করেছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। তখন সুস্থ হলেও পুরোপুরি সুস্থ হননি। হাঁটাচলায় কিছু অসুবিধা ছিল। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবে ১৪ দলকে সচল রেখেছিলেন। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলের কর্মসূচি নিয়ে ঘুরতেন সারাদেশ। 

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। ১৯৯২ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হন। তখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ ছিল মাত্র একটি। তারপর থেকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবেও। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা এলে প্রথমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, পরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সর্বশেষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ নাসিম।
যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে প্রথম সারিতে ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্যবার।শাসকের রক্তচক্ষু পিছু হটাতে পারেনি তাকে। অনেক বড় মাপের নেতা ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের হুইপ ছিলেন, তারপর ১৯৯১ সালেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে মন্ত্রী হয়েছেন, ২০১৪ সালেও মন্ত্রী হয়েছেন। সেনা সমর্থিত সরকারের সময় ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, এ সময় তাঁর নির্বাচনী আসন থেকে এমপি হন নাসিমপুত্র তানভীর শাকিল জয়। নিজ নির্বাচনী এলাকায় এতই  জনপ্রিয় ছিলেন যে হারেন নি কোনে নির্বাচনে। মুজিব আদর্শের একজন পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত সাহসী নেতা ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। 

আওয়ামী রাজনীতিতে তাঁর অবদান কতটা তার প্রমাণ মেলে মোঃ নাসিমের মৃত্যুর পর দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোকবার্তায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, পিতার মতোই মোহাম্মদ নাসিম আমৃত্যু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে গেছেন। সকল ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যন্য অবদান রেখেছেন। শেখ হাসিনা আরো বলেছিলেন, মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন দেশপ্রেমিক ও জনমানুষের নেতাকে হারাল। আমি হারালাম বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার আগ পর্যন্ত দলীয় সভাপতির নেতৃত্বের প্রতি তিনি কতটা আস্থাশীল ছিলেনে শেখহাসিনার শোকবার্তায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যু সংবাদ শুনে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর কন্ঠ থেকে শিশুর মত কান্নার শব্দ ভেসে এসেছে টেলিফোনে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর চোখের দিকে তাকানো যায়নি সেদিন। করোনা সংক্রমণকালেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতাল, জানাজা, দাফন সবখানেই ছিলো নেতাকর্মীদের ভালোবাসার বাধভাঙা জোয়ার। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় সিরাজগঞ্জে নেওয়া হয়নি তাঁর লাশ। দাফন করা হয়েছিল বনানীতে।

রাজনীতির আঁকাবাঁকা পথে মোহাম্মদ নাসিম এক সংগ্রামী প্রেরণার নাম। ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন, বিএনপি - জামাত জোট সরকারের দুঃশাসনের বিরূদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। একইসঙ্গে লড়াই করেছিলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধেও। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নিরলসভাবে লড়াই করে গেছেন মোহাম্মদ নাসিম।

শুধু নিজ নিবার্চনী এলাকাতেই নয় , সারাদেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে প্রিয় নেতা ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ব্যক্তি নাসিমের মৃত্যু হলেও  সংগ্রামী জীবনের যে নজির তিনি রেখে গেছেন আমাদের সামনে, তার কোনো মৃত্যু নেই। এ দেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় মোহাম্মদ নাসিম বেঁচে থাকবেন কর্মীবান্ধব ও জনবান্ধব নেতা হয়ে। কে মন্ত্রী, কে এমপি একদিন তা মানুষ  ভুলে যাবে কিন্তু জনবান্ধবের মৃত্যু নেই। মৃত্যুু নেই জননেতাদের। মোহাম্মদ নাসিম হোক আগামী দিনের জনবান্ধব রাজনীতিক প্রতিচ্ছবি। ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে  শ্রদ্ধাভাজন পিতৃতুল্য প্রিয় নাসিম ভাই'র স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

মানিক লাল ঘোষঃ সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ।

এমএসএম / এমএসএম

​শারদীয় দুর্গোৎসব: ইতিহাস, সত্যের জয়গান ও আবহমান বাংলার সম্প্রীতি

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট