‘ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে আমরা পক্ষভুক্ত নই’- ইরানের হামলা নিয়ে ইউএইর অবস্থান: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক চলমান যুদ্ধের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) একটি সতর্ক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও দেশটি সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পথ থেকে নিজেদের দূরে রাখার সংকেত দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে যে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে।
ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটি এই সংঘাতে কোনো পক্ষ নয় এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হামলার জন্য তাদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রিম আল হাশিমি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে ইউএইর দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো- দেশটির ভূখণ্ড কোনো আঞ্চলিক সংঘাত বা সামরিক অভিযানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
ইউএইর দাবি অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটি ইরানের এক হাজারেরও বেশি হামলার মুখোমুখি হয়েছে। এসব হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে তিনজন বাসিন্দার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এই তথ্য তুলে ধরে ইউএই মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে হামলার ব্যাপকতা ও ঝুঁকি তুলে ধরতে চেয়েছে।
জেনেভায় জাতিসংঘে ইউএইর উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি শাহাদ মাতার বলেছেন, এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইউএই নিজেদের আত্মরক্ষার পূর্ণ ও বৈধ অধিকার সংরক্ষণ করে। তবে তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে দেশটি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে চায় না; বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি হিসাবি কৌশল অনুসরণ করছে।
ইউএই একই সঙ্গে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে তাদের ভূখণ্ড কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা বা আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তারের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) সদস্য রাষ্ট্র এবং অঞ্চলের অন্যান্য আরব দেশের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে দেশটি ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
রিম আল হাশিমি ইউএই এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইউএই সরকার উত্তেজনা প্রশমনে সংযম ও গঠনমূলক কূটনৈতিক সংলাপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে, সামরিক প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ আনতে পারে, কিন্তু স্থায়ী আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই কূটনৈতিক সমাধানকেই তারা সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখছে।
ঘটনার গুরুত্ব সত্ত্বেও ইউএই নিজেদের অবস্থানকে সংযত ও কৌশলগত বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারে না। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইউএই ইতোমধ্যে কয়েকটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেহরানে ইউএই দূতাবাস বন্ধ করা, কূটনৈতিক মিশন প্রত্যাহার করা এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা। এসব পদক্ষেপ সামরিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলের অংশ।
সবশেষে ইউএই জোর দিয়ে বলেছে যে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্য। অর্থাৎ কোনো একটি গালফ দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হলে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইউএই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে তারা এই হামলার নিন্দা জানায় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
সামগ্রিকভাবে ইউএইর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি হিসাবি ভারসাম্যের প্রতিফলন। তারা একদিকে নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার অধিকার বজায় রাখছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই কৌশলই এখন মধ্যপ্রাচ্যের জটিল শক্তির সমীকরণে ইউএইকে একটি সতর্ক কিন্তু সক্রিয় কূটনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
‘ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে আমরা পক্ষভুক্ত নই’- ইরানের হামলা নিয়ে ইউএইর অবস্থান: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে
ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পতন অনিবার্য
৬ মাসের সময়সীমা বনাম ৬০ দিনের ধৈর্য: শাসন, সংকট ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে
দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না—কারণ রাষ্ট্র নয়, রাজনীতিই তার আশ্রয়
পতাকাহীন গাড়ি, সাইরেনহীন পথ: বাংলার ধূলোমাখা পথে এক নিঃসঙ্গ কর্মবীর তারেক রহমানের পদধ্বনি
তারেক রহমানের বিজয় ইতিহাসে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমানের সামনে বাস্তবতা ও প্রত্যাশা
রেলকে বাঁচাতে ইঞ্জিন সংকটের সমাধান খুব জরুরী
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়