আসন্ন ঈদ-উল-আজহায় ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
বাংলাদেশে ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উচ্ছ্বাস এবং নাড়ির টানে ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রতি বছর ঈদযাত্রা আমাদের জন্য এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ঈদ-উল-আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক, নৌপথ ও রেলপথে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও ভোগান্তি। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের মাতমে। তাই আসন্ন ঈদ-উল-আজহাকে সামনে রেখে দুর্ঘটনারোধে এখন থেকেই সমন্বিত, কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের সড়ক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। ঈদের সময় এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের ঈদযাত্রায় সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই ছিল ৩৪৬টি, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫১ জন। গত বছরের তুলনায় প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা দুটোই বেড়েছে।
এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু মানে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানে একটি জাতির সম্ভাবনার মৃত্যু। অথচ প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে, একই আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হলো অতিরিক্ত যাত্রীচাপ। ঈদের আগে কয়েক দিনের মধ্যে কোটি কোটি মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যান। ফলে সড়কে যানবাহনের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, সিএনজি, নসিমন-করিমনসহ সব ধরনের যানবাহন একসঙ্গে সড়কে নেমে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনও চলাচল করে। যাত্রী পরিবহনের জন্য মালবাহী ট্রাক পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
চালকদের বেপরোয়া মনোভাবও দুর্ঘটনার বড় কারণ। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং প্রবণতা, মোবাইল ফোন ব্যবহার, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা ঈদযাত্রায় ভয়াবহ রূপ নেয়। একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে অনেক চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে রাতের বেলায় ঘুমঘুম অবস্থায় চালানো যানবাহন বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক ঈদযাত্রার দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। শুধু ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরেই ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত হয়েছেন। অনেক তরুণ দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর জন্য ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে দূরপাল্লার যাত্রা করেন। হেলমেট ব্যবহার না করা, তিনজন বহন করা এবং অতিরিক্ত গতিতে চালানোর কারণে দুর্ঘটনা মারাত্মক হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের বেহাল অবস্থা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। কোথাও খানাখন্দ, কোথাও নির্মাণকাজ, কোথাও আবার অপরিকল্পিত ইউ-টার্ন বা অবৈধ বাজার সড়কের নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। মহাসড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং, হাটবাজার এবং ধীরগতির যান চলাচলও দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গমুখী মহাসড়কগুলো ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলেও অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত হয় না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন চালক এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। ফলে অসাধু পরিবহন মালিক ও চালকেরা সুযোগ নেয়। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন সড়ক ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। ঈদের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই মহাসড়কে বিশেষ নজরদারি জোরদার করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন চালক এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণও অত্যন্ত জরুরি। একজন চালককে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গাড়ি চালাতে না দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দূরপাল্লার বাসে বিকল্প চালক বাধ্যতামূলক করা উচিত। চালকদের মাদক পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করতে হবে। কারণ ক্লান্তি ও মাদকাসক্তি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। মহাসড়কে উচ্চগতির মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। মানসম্মত হেলমেট ছাড়া কাউকে মোটরসাইকেল চালাতে দেওয়া যাবে না। তিনজন আরোহী বহন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে ঈদের সময় মহাসড়কে মোটরসাইকেলের আলাদা লেন বা নিয়ন্ত্রিত চলাচল ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
ঈদযাত্রায় গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানোও জরুরি। পর্যাপ্ত বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা থাকলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করবে না। রেলপথকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করা গেলে সড়কের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে নৌপথের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লাইফ জ্যাকেট সংকট এবং অনিয়ন্ত্রিত লঞ্চ চলাচল বন্ধ করতে হবে।
সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মহাসড়কের ভাঙা অংশ দ্রুত সংস্কার করতে হবে। নির্মাণাধীন সড়কে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, আলোকসজ্জা ও বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্ল্যাকস্পটগুলোতে গতি নিয়ন্ত্রণ, স্পিড ক্যামেরা ও পুলিশি নজরদারি বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহারও দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সিসিটিভি নজরদারি, স্পিড মনিটরিং সিস্টেম, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা গেলে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে যানবাহনের ডিজিটাল ফিটনেস ও লাইসেন্স যাচাই ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, মানুষকে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়’ এই ধরনের বার্তা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী গাড়িতে না ওঠা, ঝুঁকিপূর্ণ যান এড়িয়ে চলা এবং চালকের বেপরোয়া আচরণের প্রতিবাদ করা প্রয়োজন।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও সড়ক নিরাপত্তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আকস্মিক বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ এবং সড়কের ক্ষয়ক্ষতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই আবহাওয়া বিবেচনায় রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সড়কের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনা শুধু পরিবহন খাতের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় এবং দেশের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। বাংলাদেশেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। পঙ্গু হাসপাতালগুলোতে দুর্ঘটনায় আহত মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক ঈদযাত্রায় শুধু পঙ্গু হাসপাতালেই দুই হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ব্যবস্থাও এখনও দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না। অ্যাম্বুলেন্স সংকট, ট্রমা সেন্টারের অভাব এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেয়। তাই মহাসড়কভিত্তিক জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা জোরদার করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পরিবহন খাতে অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধ না হলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একটি সভ্য রাষ্ট্র কখনো তার নাগরিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে না। তাই আসন্ন ঈদ-উল-আজহাকে সামনে রেখে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ঈদের আনন্দ হোক নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও দুর্ঘটনামুক্ত। আর কোনো মায়ের বুক খালি না হোক, আর কোনো শিশু এতিম না হোক, আর কোনো পরিবার প্রিয়জন হারিয়ে শোকের সাগরে ডুবে না যাক । নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। ঈদ-উল-আজহা সবার জন্যে হোক আনন্দময়।
লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
এমএসএম / এমএসএম
আসন্ন ঈদ-উল-আজহায় ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
যেখানে হারায় আলো, সেখানে জন্মায় স্বপ্ন
শিক্ষাক্রমে মাধ্যমিক স্তরে কৃষি শিক্ষা পুনরায় বাধ্যতামূলক করা হোক
লবণ কমাই, জীবন বাঁচাই: বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬
সংস্কার আর জনকল্যাণে তারেক রহমানের ১০০ দিনের দোরগোড়ায় নতুন বাংলাদেশ
জাতীয় সংসদে দরুদ ও সালামের ধ্বনি: ঈমান, আদর্শ ও জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!
শিশু কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া
মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: বাংলাদেশে কারাবন্দি সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতার সংকট
সারাবছর-ই সম্মানের আসনে থাকুক শ্রমিক
শক্তিই যখন ন্যায় নির্ধারণের মানদণ্ড হয়
ঢাকার প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন দিগন্ত: প্রথম নারী জেলা প্রশাসক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের প্রত্যাশা
দায়িত্বশীল নেতৃত্বের এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত মেয়র শাহাদাত