ঢাকা সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

জাতীয় সংসদে দরুদ ও সালামের ধ্বনি: ঈমান, আদর্শ ও জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ৬-৫-২০২৬ দুপুর ২:১১

শরীয়তপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সর্বপ্রথম প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি—“আস-সালাতু ওয়াস-সালামু ‘আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ, আস-সালাতু ওয়াস-সালামু ‘আলাইকা ইয়া হাবীবাল্লাহ, আস-সালাতু ওয়াস-সালামু ‘আলাইকা ইয়া রহমাতাল্লিল ‘আলামীন।” এই দরুদ ও সালাম পেশ করে তাঁহার বক্তব্য শুরু করেছেন; যা নিঃসন্দেহে একটি হৃদয়স্পর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

এই মহৎ উদ্যোগ দেশের কোটি কোটি ঈমানদার মুসলমানের অন্তরে গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের সঞ্চার করেছে। একজন জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় এমন আধ্যাত্মিক সূচনা কেবল ব্যক্তিগত ঈমানের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি জাতীয় জীবনে ইসলামী মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রসারের একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দরুদ ও সালাম পাঠ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহাসৌভাগ্যের আমল। শাইখ মুহাম্মদ সাইফুল আজম আল আজহারী-এর ব্যাখ্যায়, নবী করিম (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা কেবল একটি ইবাদত নয়; বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার একটি মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর উপর দরুদ প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর দরুদ ও সালাম প্রেরণ কর।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)

এই আয়াতের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এখানে আল্লাহ নিজেই তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করছেন এবং মুমিনদেরও সেই একই আমলে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। সুতরাং দরুদ পাঠ করা শুধু একটি সুন্নত নয়-এটি সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ পালন, যা মুমিনের ঈমানকে পরিপূর্ণতা দান করে।

হাদিস শরীফেও দরুদ ও সালামের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাজিল করেন।” (সহিহ মুসলিম)

আরেক হাদিসে এসেছে: “কিয়ামতের দিন আমার নিকটতম ব্যক্তি হবে সে, যে আমার উপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।” (তিরমিজি)

এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, দরুদ ও সালাম পাঠ করা মুমিনের জন্য শুধু দুনিয়াতেই বরকত বয়ে আনে না; বরং আখিরাতেও নবীজির নৈকট্য লাভের এক অনন্য মাধ্যম। তাই জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই আমলের সূচনা নিঃসন্দেহে একটি কল্যাণকর উদ্যোগ, যা আল্লাহর রহমত ও বরকত আকর্ষণ করতে সক্ষম।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে সমাজ নানা নৈতিক সংকট, অবক্ষয় ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এমন পরিস্থিতিতে দরুদ ও সালামের মতো আধ্যাত্মিক চর্চা মানুষের অন্তরে নবীপ্রেম, আল্লাহভীতি ও নৈতিকতার বোধ জাগ্রত করতে পারে। শাইখ মুহাম্মদ সাইফুল আজম আল আজহারী-এর ভাষায়, “নবীপ্রেম হলো সেই আলো, যা মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে এবং তাকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।”

নবী করিম (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি ছিলেন দয়ার সাগর, ন্যায়বিচারের প্রতীক এবং সত্যের পথপ্রদর্শক। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা মানুষকে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। সুতরাং সংসদের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানে দরুদ ও সালামের ধ্বনি উচ্চারিত হওয়া একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়, যে আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেও আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার স্থান রয়েছে।

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এটি নতুন প্রজন্মকে তাদের ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতি সচেতন করে। আজকের তরুণ সমাজ যখন নানা সাংস্কৃতিক প্রভাবের মধ্যে নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে, তখন এমন একটি উদাহরণ তাদের মনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের অনুভূতি জাগ্রত করতে পারে। এটি সমাজে ঐক্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করে, যা একটি সুস্থ ও শক্তিশালী জাতি গঠনের জন্য অপরিহার্য।

এছাড়া, দরুদ ও সালাম পাঠ মানুষের অন্তরে প্রশান্তি ও আত্মিক শক্তি প্রদান করে। ইসলামী শিক্ষায় বলা হয়, যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করে, তার জীবনের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হয় এবং তার অন্তরে শান্তি নেমে আসে। এটি ব্যক্তি জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।

জনাব মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে; জান্নাত কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একচেটিয়া অধিকারে নয়; বরং জান্নাতের মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
“এটি তোমাদের কল্পনা নয় এবং আহলে কিতাবদের কল্পনাও নয়; যে মন্দ কাজ করবে, সে তার প্রতিফল পাবে…” (সূরা আন-নিসা: ১২৩); যা প্রমাণ করে যে, মুক্তি ও জান্নাত লাভ নির্ভর করে ঈমান ও আমলের উপর, কোনো গোষ্ঠীগত পরিচয়ের উপর নয়।

এছাড়া আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কাউকে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, এর বাইরে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮); অর্থাৎ চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্ক করে বলেছেন: “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম)

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের শিক্ষায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে; কাউকে নির্দিষ্টভাবে জান্নাতি বা জাহান্নামী ঘোষণা করা মানুষের কাজ নয় (যদি না কুরআন-হাদিসে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে); বরং এটি আল্লাহর ইখতিয়ার। তাই ধর্মকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা, কিংবা আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে চূড়ান্ত দাবি করা, অত্যন্ত নিন্দনীয় ও বিপজ্জনক প্রবণতা।

পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তিনিই তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন…” (সূরা আন-নিসা: ১৪২)

সুতরাং সুন্নি আকীদা অনুযায়ী, মুসলমানের করণীয় হলো: আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা, নবী করিম (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা, এবং নিজ নিজ আমল শুদ্ধ করা। জান্নাতের চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর হাতে, কোনো মানুষ বা গোষ্ঠীর নয়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০% থেকে ৯১% মানুষ মুসলমান; এমন একটি দেশে জনাব মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু-এর এই ঈমানী বক্তব্য নিঃসন্দেহে শুধু প্রশংসার দাবিদারই নয়; বরং এটি একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত। যদি আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সঠিক আকীদা, নবীপ্রেম এবং দরুদ ও সালামের চর্চা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক, শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা প্রতিটি ঈমানদার মুসলমানের দায়িত্ব। এই ভালোবাসা কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের চরিত্র, আচরণ ও কর্মে প্রতিফলিত করা আবশ্যক। তাহলেই আমরা সত্যিকার অর্থে তাঁর উম্মত হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ ও সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হব; ইনশাআল্লাহ।

লেখক:
প্রধান নির্বাহী উপদেষ্টা- বাংলাদেশ রেজভীয়া তালিমুস সূন্না বোর্ড ফাউন্ডেশন

এমএসএম / এমএসএম

লবণ কমাই, জীবন বাঁচাই: বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬

সংস্কার আর জনকল্যাণে তারেক রহমানের ১০০ দিনের দোরগোড়ায় নতুন বাংলাদেশ

জাতীয় সংসদে দরুদ ও সালামের ধ্বনি: ঈমান, আদর্শ ও জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!

শিশু কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া

​মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: বাংলাদেশে কারাবন্দি সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতার সংকট

সারাবছর-ই সম্মানের আসনে থাকুক শ্রমিক

শক্তিই যখন ন্যায় নির্ধারণের মানদণ্ড হয়

ঢাকার প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন দিগন্ত: প্রথম নারী জেলা প্রশাসক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের প্রত্যাশা

দায়িত্বশীল নেতৃত্বের এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত মেয়র শাহাদাত

​শোষিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক

ইতিহাসের ভয়াবহতম খাদ্য সংকটে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ

চাপের বহুমাত্রিক বলয়ে বর্তমান সরকার

অসাম্প্রদায়িক ও শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর পঙ্কজ ভট্টাচার্য