ঢাকার প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন দিগন্ত: প্রথম নারী জেলা প্রশাসক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র ও রাজধানী ঢাকা জেলার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক যুক্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব ফরিদা খানমকে ঢাকার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গত ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয় । রাজধানীর মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের প্রশাসনিক শীর্ষপদে একজন নারী কর্মকর্তার নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন ও নারী নেতৃত্বের অগ্রযাত্রার শক্তিশালী প্রতীক। ফরিদা খানমের এই দায়িত্ব লাভ তাঁর সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় পেশাগত অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন । ২৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের মাধ্যমে ২০০৬ সালে কর্মজীবন শুরু করে তিনি মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি এর আগে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাঁকে ঢাকার মতো জটিল প্রশাসনিক কাঠামো সামলানোর জন্য যোগ্য করে তুলেছে । এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে ফেনী ও নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালন এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে রয়েছে । মাঠ পর্যায়ের নীতি বাস্তবায়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং আইন-শৃঙ্খলার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে তাঁর গভীর জ্ঞান রাজধানীর প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে ।
প্রশাসনের উচ্চপদে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ একটি আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য উপাদান। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, এবং তাঁদের পেছনে রেখে দেশের সার্বিক উন্নয়ন যে সম্ভব নয়, তা বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দর্শনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। ঢাকার প্রথম নারী ডিসি হিসেবে ফরিদা খানমের নিয়োগ এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নারীরা এখন সমানভাবে অংশীদার। প্রশাসনিক নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি শুধু লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক সংবেদনশীলতার সংযোজন ঘটায়।
সুশাসনের অন্যতম শর্ত হলো ‘নাগরিকবান্ধব প্রশাসন’। একজন নারী যখন প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকেন, তখন সাধারণ নারী নাগরিকরা তাঁদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত, সামাজিক বা আইনি জটিলতা নিয়ে আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। অনেক ক্ষেত্রে নারী নাগরিকরা একজন নারী প্রশাসকের কাছে নিজেদের সমস্যা আরও স্বাচ্ছন্দ্য ও আস্থার সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারেন, যা বিচারপ্রার্থী বা সেবাগ্রহীতাদের মাঝে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে । ফরিদা খানমের মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তার হাত ধরে ঢাকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা প্রশাসনের কাছ থেকে আরও সহমর্মিতামূলক ও কার্যকর সেবা পাবেন বলে নাগরিক সমাজের বিশ্বাস।
এই নিয়োগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের বৃহত্তর সংস্কার প্রচেষ্টা ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতির একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে নারীদের পদায়ন বর্তমান সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার ভাবনার অংশ, যা বিএনপি ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার কর্মসূচির মৌলিক চেতনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের যে লক্ষ্যগুলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে, এই নিয়োগ তার একটি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি তাঁদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে আসার যে প্রতিশ্রুতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুনর্ব্যক্ত করেছেন, এই পদায়ন তারই ধারাবাহিকতা বলে প্রতীয়মান হয় ।
পরিশেষে বলা যায়, ফরিদা খানমের ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে এই ঐতিহাসিক যাত্রা বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে এক নতুন স্বর্ণালি অধ্যায়ের সূচনা করল। এটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ সুযোগ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে নারীরা রাষ্ট্রের যেকোনো চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালনে সক্ষম। ভবিষ্যতে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নারীর এই কার্যকর অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তাঁদের মেধা ও মননের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে উঠবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা ।
ব্যারিস্টার তামিম মিয়া, সহ-প্রতিষ্ঠাতা, সারাংশ
এমএসএম / এমএসএম
ঢাকার প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন দিগন্ত: প্রথম নারী জেলা প্রশাসক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের প্রত্যাশা
দায়িত্বশীল নেতৃত্বের এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত মেয়র শাহাদাত
শোষিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক
ইতিহাসের ভয়াবহতম খাদ্য সংকটে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ
চাপের বহুমাত্রিক বলয়ে বর্তমান সরকার
অসাম্প্রদায়িক ও শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর পঙ্কজ ভট্টাচার্য
শিরোনাম- রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ! ভবিষ্যতের জন্য সুফল নাকি ঝুঁকি বাড়াবে
আকাশপথে স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত: শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক রাডারের যাত্রা শুরু
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অপরিহার্য
বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!
কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে
“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”