শোষিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের মহাকাব্যে যে নামটি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আশ্রয় গড়ে নিয়েছে, তিনি আবুল কাশেম ফজলুল হক। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন বরিশাল জেলার ঝালকাঠি মহাকুমার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। মেধাবী এই রাজনীতিকের দীর্ঘ ৮৯ বছরের কর্মময় জীবন ছিল মূলত সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এক নিরন্তর সংগ্রাম। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল যখন এই মহাপ্রাণ ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন বাংলার আকাশ-বাতাস শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, কারণ সাধারণ মানুষ হারিয়েছিল তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও অকৃত্রিম অভিভাবককে।
শেরে বাংলার শিক্ষাজীবন ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে প্রবেশিকা পাস করার পর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষায় ব্রতী হন। ১৮৯৪ সালে তিনি রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিদ্যায় একযোগে অনার্সসহ বি.এ পাস করেন। মেধায় তিনি এতটাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন যে, মাত্র ছয় মাসের প্রস্তুতিতে ১৮৯৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে আইন শাস্ত্রে বি.এল ডিগ্রি অর্জন করে তিনি ওকালতি পেশায় যোগ দেন এবং দ্রুতই একজন প্রাজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তবে আইনের চেয়েও মানুষের অধিকার আদায়ের ময়দান তাঁকে বেশি আকর্ষণ করেছিল। ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে তাঁর সংসদীয় রাজনীতির সূচনা। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল, যখন তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশভাগের পর ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
শেরে বাংলার রাজনীতির মূল দর্শন ছিল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। তৎকালীন সময়ে বাংলার কৃষক সমাজ যখন মহাজনদের সুদের জালে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি ১৯৩৭ সালে গঠন করেন ঐতিহাসিক 'ঋণ সালিশি বোর্ড'। এর মাধ্যমে তিনি কয়েকশ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ করে কয়েক লক্ষ পরিবারকে ভিটেমাটি হারানোর হাত থেকে রক্ষা করেন। তাঁর হাত ধরে প্রবর্তিত 'প্রজা স্বত্ব আইন' জমিদারী প্রথার জুলুম কমিয়ে কৃষককে মাটির ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিল। এই অসামান্য অবদানের জন্যই সাধারণ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাঁকে ভালোবেসে ‘বাংলার বাঘ’ বা ‘শেরে বাংলা’ উপাধিতে ভূষিত করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশেও শেরে বাংলার প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তিনি তুলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে তাকেই পূর্ণতা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের দিনগুলোতে তরুণ মুজিব এই প্রবীণ নেতার সান্নিধ্যে এসে গণমানুষের হৃদস্পন্দন বুঝতে শিখেছিলেন। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে শেরে বাংলা এক আদর্শিক পাঠশালা। তিনি শিখিয়ে গেছেন উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা হলো সাধারণ মানুষের সেবা করা। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আজও অসাম্প্রদায়িক ও আলোকিত সমাজ গঠনের আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। গণমানুষের জন্য নিবেদিত এমন নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
( মানিক লাল ঘোষ :-- সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)
এমএসএম / এমএসএম
সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?
বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা
কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?
প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
লেখকের কষ্ট