ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে


রায়হান আহমেদ তপাদার  photo রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশিত: ২১-৪-২০২৬ দুপুর ১১:৩২

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো কৃষি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ এখনও কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কৃষি খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ অবদান রাখে; কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির কারণে কৃষক আজও কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। বিগত বছরগুলোতে কৃষিকে যেভাবে জোর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘোষিত ‘কৃষি কার্ড’ এবং ভবিষ্যৎ কৃষি পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন কৃষি খাতের কাঠামোগত সংস্কারের একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।আদি যুগ থেকেই কৃষি মানুষের জীবনধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সময়ের পরিবর্তন ও প্রয়োজনের তাগিদে কৃষিতে নানা রকম বিবর্তন, পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটেছে এবং তা এখনো চলমান। তবে এসব পরিবর্তনের কারণে পুরনো পদ্ধতিগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ বা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই, বরং আবহাওয়া ও বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলোর উন্নত সংস্করণ পুনরায় চালু করার প্রয়োজন দেখা দেয়। অনেক সময় কোনো প্রযুক্তি একটি এলাকায় ব্যবহৃত হলেও যোগাযোগের অভাবে পাশের এলাকায়ই তা অজানা থেকে যায়। আবার জ্ঞানের অভাবেও অনেক কৃষক তাঁদের চাষাবাদ থেকে প্রত্যাশিত লাভ অর্জন করতে পারেন না। বাংলাদেশে বোরো ধান ও সরিষা সাধারণত একই মৌসুমে চাষ করা হয়।অঞ্চল ও জমির উপযোগিতা অনুযায়ী বীজ বপনের সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, বিশেষ করে ষাটের দশকের শেষ ভাগে আই আর আট ধানের প্রচলনের আগে বন্যাপ্রবণ অনেক জমিতে আমন ধান থাকা অবস্থায়ই বিনা চাষে সরিষা, খেসারি, মটরশুঁটি, কলাই বা তিসির বীজ বপন করা হতো। সরিষা আগে পেকে যেত, এরপর খেসারি, মটর বা তিসি পরিপক্ব হলে তা সংগ্রহ করা হতো। এপ্রিল মাসে বৃষ্টি হলে অনেক এলাকায় আউশ ও আমন একসঙ্গে বোনা হতো। আউশ ধান আগে পরিপক্ব হওয়ায় তা কেটে নেওয়া হতো এবং আমনের চারা রেখে দেওয়া হতো। পরে নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে আমন ধান কাটা হতো। পরবর্তী সময়ে উন্নত উফশী জাতের ধানের আবিষ্কারের ফলে এই শস্যবিন্যাসে বড় পরিবর্তন আসে এবং সেচনির্ভর বোরো ধানের চাষ শুরু হয়। কিন্তু বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এই সেচনির্ভর পদ্ধতি হুমকির মুখে পড়েছে। তাই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত না হলে ভবিষ্যতে হয়তো পুরনো পদ্ধতির দিকেই ফিরে তাকাতে হতে পারে। বর্তমানে অনেক এলাকায় আমন ধান কাটার পর জমি চাষ করে সরিষা বোনা হয়, তারপর জমি কর্দমাক্ত করে বোরো ধান রোপণ করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের অভিমত অনুযায়ী সরিষার পর বোরো ধানের চারা রোপণের সময় চারার বয়স প্রায় ৭০ দিন ছাড়িয়ে যায়। কারণ সরিষা বপন ও বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ একই সময়ে করা হয়। দেশের অন্যান্য স্থানেও একই চিত্র দেখা যায়।দেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো ধানের চারার বয়স ৫০ দিনের বেশি হলে প্রতি হেক্টরে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কেজি করে ফলন কমে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, সরিষা কাটার পর বোরো ধান রোপণ করলে জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন কতটা কমে যেতে পারে। কিন্তু সম্প্রসারণ কার্যক্রমে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। 

কৃষকের অভিজ্ঞতাভিত্তিক উদ্ভাবন একটি সুপরিচিত ধারণা হলেও বাস্তবে তা পেশাজীবীদের যথেষ্ট দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, আমন ধানের পর জমি চাষ করে বোরো ধানের বীজের সঙ্গে মুলা, গাজর ও ধনের বীজ একসঙ্গে বপন করা হয়। এসব সবজি ধানের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আগে তুলে বাজারজাত করা হয় বা পারিবারিকভাবে খাওয়া হয়। এরপর জমিতে থাকা ধানের যথাযথ পরিচর্যা করা হয়। অনেক গ্রামের কৃষকরা বহু আগে থেকেই আমন ধানের পর বোরো ধান ও সরিষার মিশ্র চাষ পদ্ধতি চালু করে সফলতা অর্জন করেছেন। তাঁরা একই দিনে জমি চাষ করে বোরো ধান ও সরিষার বীজ বপন করেন। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় প্রায় ১৮ বছর আগে ৮০ একর জমিতে এই পদ্ধতির একটি প্রদর্শনী করা হয়, যেখানে বারি সরিষা- ১৪, বারি সরিষা-১৫ ও ব্রি ধান২৯-এর ফলন কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং এই পদ্ধতি এখনো চালু রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছিল। চলনবিলের মতো অঞ্চলে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। অন্যদিকে হাওর অঞ্চল-যেখানে বোরো ধান প্রধান ফসল, এখনো এই প্রযুক্তির বাইরে রয়ে গেছে। সেখানে বোরো ধানের সঙ্গে সরিষার মিশ্র চাষের সম্ভাবনা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করা হয়নি। হাওর এলাকার ঢালু জমির যে অংশ স্বল্প সময়ের জন্য সরিষা ও বোরো চাষের উপযোগী থাকে, সেখানে এই পদ্ধতি কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।বিদ্যমান আমন ধানের জমিতে রিলে পদ্ধতিতে বিনা চাষে সরিষা চাষ করা সম্ভব-এটি বহু আগেই প্রমাণিত। এই পদ্ধতিতে বীজের পরিমাণ সাধারণের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি লাগে। 

উভয় ফসলের চারা ছোট থাকা অবস্থায় আমন ধান কেটে নেওয়া হয় বলে সরিষা বা বোরো ধানের তেমন ক্ষতি হয় না এবং এগুলো একসঙ্গে বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে এমন সরিষার জাত নির্বাচন করতে হবে, যা সহজে হেলে পড়ে না; যেমন-বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা-১৫। প্রায় দুই মাস পর সরিষা সংগ্রহ করলে জমিতে ধান থেকে যায় এবং পরবর্তী সময়ে বোরো ধানের স্বাভাবিক পরিচর্যার মাধ্যমে ভালো ফলন পাওয়া যায়। কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিকে ডাইরেক্ট সিডেড রাইস (ডিএসআর) বলা হয়। বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট এবং শ্রমিকের অভাব বিবেচনায় গবেষণায় দেখা গেছে, রোপা পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতি অধিক লাভজনক হতে পারে। এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো-ফলনের তেমন ক্ষতি হয় না; সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনায় ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পানি সাশ্রয় সম্ভব; জমি প্রস্তুত, বীজতলা তৈরি, চারা তোলা ও রোপণের খরচ কমে; রোপণজনিত ঝুঁকি থাকে না এবং ধান দ্রুত পরিপক্ব হয়; গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কম হয়; যান্ত্রিক বপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হয়; এবং মোট উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় লাভ বাড়ে। মিশ্র ফসলের জমিতে দু-একবার সেচ দিলে সরিষার ফলন ভালো হয়। সরিষা তোলার পর জমিতে সামান্য আগাছা থাকলে তা পরিষ্কার করে ইউরিয়া সার প্রয়োগসহ ধানের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে। সব শেষে বলা যায়, কৃষির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই চলবে না, বরং অতীতের অভিজ্ঞতা ও কৃষকদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবর্তিত জলবায়ু, পানির সংকট ও শ্রমঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রথাগত ও আধুনিক পদ্ধতির সমন্বয়ই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। 

তাই এ সময়ের দাবি হলো-উপযুক্ত প্রযুক্তির বিস্তার, জ্ঞানের আদান-প্রদান এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষকের তালিকা হালনাগাদ না থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া সুবিধাগুলো সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ন্যায্যমূল্যে সার ও ডিজেলে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজারে কৃত্রিম সংকট, দুর্নীতি বা অনিয়ম দেখা দিতে পারে। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির অভাব থাকলে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় ঠিকভাবে না হলে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।এ উদ্যোগ সফল করতে হলে কৃষকদের একটি নির্ভুল ও ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা, সার-ডিজেল ও অন্যান্য ভর্তুকি বিতরণে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে সফলতা আসবে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। বাংলাদেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে কৃষির উন্নয়ন অপরিহার্য। কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নন, তিনি দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বিএনপির কৃষি কার্ড ও ভবিষ্যৎ কৃষি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় না বানিয়ে এটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ কৃষকের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন, আর কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। কৃষিতে কৃষক কার্ড একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করে এ দেশের কৃষক ও কৃষিকে নতুনভাবে ক্ষমতায়ন করবে এটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে

Aminur / Aminur

কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে

“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”

অর্ধেক পাগল, অর্ধেক ভালো-মতপার্থক্যের সীমা কোথায়?

​অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন

হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব

বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা

​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা

পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি

সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা

চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল দরকার

নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়

নিম্নমানের জ্বালানিতে বিলিয়ন ডলার ক্ষতি: আমরা কি তা উপেক্ষা করছি?