ঢাকা রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

চাপের বহুমাত্রিক বলয়ে বর্তমান সরকার


 মিরাজ হাসান রানা photo মিরাজ হাসান রানা
প্রকাশিত: ২৬-৪-২০২৬ দুপুর ১২:১০

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকার এমন এক সময় দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যেখানে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বার বার । দীর্ঘদিনের জমে থাকা অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও প্রশাসনিক চাপ, সামাজিক অস্থিরতা এবং উচ্চ গণপ্রত্যাশা একসঙ্গে কাজ করছে।

পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ১৬ মাস শেষে দায়িত্ব নেওয়া এই নতুন সরকারকে দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কাঠামোগত সংস্কারের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ গুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে অর্থনীতি। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা আমদানি ব্যয় মেটানো ও মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

একই সাথে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। (ERD)-এর তথ্য অনুযায়ী বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ পর্যায় শুরু হওয়ায় বার্ষিক ঋণসেবা ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল, পদ্মা রেল সংযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মতো বড় বড় প্রকল্পগুলোর দায় এখন জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

অতীতে অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ, ব্যয় বৃদ্ধি, সময়মতো বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং দুর্নীতির অভিযোগের কারণে ঋণনির্ভর উন্নয়ন মডেল এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর বিভিন্ন বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ছাড়া এই চাপ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন।

একই সঙ্গে ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জ্বালানি, খাদ্যশস্য ও শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে সরকারকে একদিকে ব্যয় সংকোচন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক সেবা অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।

এই দ্বৈত বাস্তবতা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনসেবা অব্যাহত রাখা বর্তমান সরকারের জন্য একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির কারণে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে পৌঁছায়, যা মার্চে কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমে আসে। খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি ও আমদানি নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ দুর্বলতা সেই প্রচেষ্টাকে অনেকটাই সীমিত করে দিচ্ছে ।

বর্তমান সময়ে জ্বালানি খাত দেশের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এলএনজি, তেল ও কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে ফেলেছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বাড়লেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়ে এবং জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি হয়। IEEFA-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে LNG আমদানি ব্যয় ৮.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

একই সাথে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্যান্য উৎসের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। কারণ ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানিনির্ভর জ্বালানি, যার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় উৎপাদন ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি খরচ পড়ে। এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে বাড়তি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে  , বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক ঘাটতি বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

এছাড়া দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উন্নয়নে পর্যাপ্ত অগ্রগতি না থাকায় গ্যাস সরবরাহে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। IEEFA-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৬৭৯ MMcfd, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৪,০০০ MMcfd—অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১,৩০০ MMcfd-এর বেশি। একই সঙ্গে FY2018-19 থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গড়ে বছরে ৪.৬৪ শতাংশ হারে কমেছে।

এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। জ্বালানি সংকটের কারণে বহু শিল্পকারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং রপ্তানি সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। যার ফলে এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দুর্বলতা, সরবরাহ সংকট এবং বৈশ্বিক বাজারের মূল্যচাপ একে অপরকে প্রভাবিত করে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। ক্যাপাসিটি চার্জ বলতে বোঝায় কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে প্রস্তুত থাকলেও সরকার বা বিদ্যুৎ বিভাগ যদি তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ না কেনে, তবুও চুক্তি অনুযায়ী সেই কেন্দ্রকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও শুধু প্রস্তুত অবস্থায় থাকার জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়। এটি মূলত একটি ফিক্সড কস্ট, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (BPDB)-এর লোকসানের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত BPDB-এর জমাকৃত লোকসান প্রায় ২.৬৭ লাখ কোটি টাকা বলে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত The Financial Express প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ বছরে সংস্থাটির accumulated loss প্রায়  2.67 trillion-এ পৌঁছেছে।

এই বিপুল লোকসান সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং জ্বালানি খাতে অদক্ষ ব্যয় বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, জ্বালানি সরবরাহ সংকট এবং চাহিদা-সামঞ্জস্যহীনতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে একদিকে কেন্দ্র বসে থাকে, অন্যদিকে সেই কেন্দ্রের জন্য রাষ্ট্রকে অর্থ গুনতে হয় যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি দেশের শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ছে। দেশীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank)–এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ অর্থনৈতিক আপডেটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও উচ্চ ব্যয় শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে গার্মেন্টস ও উৎপাদন খাতে।

একইভাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) তাদের বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে যে, জ্বালানি ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয় বিনিয়োগ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

Asian Development Bank (ADB)–এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ঘাটতি এবং সরবরাহ অস্থিরতা শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে।

এছাড়া স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিবিশ্লেষকদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ইউনিট উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম, লোডশেডিং এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে নগর ও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ নির্ভরতা বেশি হওয়ায় এই সংকট আরও বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।

ফলে একদিকে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর একটি বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করছে।

তবে সংকট শুধু অর্থনীতি ও জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সরকারকে বড় ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা, দুর্নীতি এবং অদক্ষতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। ফলে পরিবর্তনের উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতি, প্রতিরোধ এবং সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সরকারের কাজ সহজ নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঋণ পুনঃতফসিল, নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর ২০২৪–২৫ কর্মসূচি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক রিজার্ভ চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং আর্থিক খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখনও বিদ্যমান, যা কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করা কঠিন।

একইভাবে বিশ্বব্যাংক (World Bank) তাদের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ অর্থনৈতিক আপডেটে উল্লেখ করেছে যে, বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) প্রবাহ বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং।

অন্যদিকে UNCTAD-এর World Investment Report অনুযায়ী, বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে, যা বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করছে।

এছাড়া বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন বাংলাদেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই কারণে সরকারকে বৈদেশিক সম্পর্ক, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্য কৌশলে আরও সতর্ক ও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হচ্ছে।

ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে সরকারের জন্য একটি জটিল ও বহুমাত্রিক নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সামাজিক ক্ষেত্রেও চাপ দিন দিন বাড়ছে। আগের সরকারের সময় তৈরি হওয়া উচ্চ বেকারত্ব ও ছদ্ম-বেকারত্ব এখনো বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত Labour Force Survey 2024 Final Report-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সময়কালে দেশে মোট বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখের বেশি, আর বেকারত্বের হার ৩.৬৬ থেকে ৪.৬৩ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। কর্মসংস্থানের এই চাপ সামাজিক অস্থিরতা, তরুণদের হতাশা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাড়াচ্ছে। ফলে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমান সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অশান্তি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় থাকতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে সরকারকে এক ধরনের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয় অতিরিক্ত কঠোরতা দেখালে মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আবার শিথিলতা দেখালে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।

অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরেও কিছু দুর্বলতা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং খাতে আগের সরকারের আমলে আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা, ব্যাংক দখল ও ব্যাপক অর্থ পাচারের ফলে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে । ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের ৩৫%-এর বেশি খেলাপি, যা চরম তারল্য সংকট এবং প্রভিশন ঘাটতি তৈরি করেছে, এই অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং নতুন সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে 

এই বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। সব সমস্যা এক সাথে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই কোন খাতে আগে গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেটি স্পষ্টভাবে ঠিক করা জরুরি। আমার মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সংস্কার—এই তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দিলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

করণীয় হিসেবে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে । রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া দিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমান সরকার একটি কঠিন ও জটিল বাস্তবতার মধ্যে কাজ করছে। এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ধীরে ধীরে এই চাপ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। জনগণের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই পারে এই বহুমাত্রিক চাপের বলয় ভেঙে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে।


লেখক :

মিরাজ হাসান রানা

রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।

যুগ্ম আহ্বায়ক, কালীগঞ্জ পৌর শাখা ছাত্রদল (গাজীপুর)।

এমএসএম / এমএসএম

চাপের বহুমাত্রিক বলয়ে বর্তমান সরকার

অসাম্প্রদায়িক ও শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর পঙ্কজ ভট্টাচার্য

শিরোনাম- রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ! ভবিষ্যতের জন্য সুফল নাকি ঝুঁকি বাড়াবে

আকাশপথে স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত: শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক রাডারের যাত্রা শুরু

চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অপরিহার্য

বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!

কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে

“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”

অর্ধেক পাগল, অর্ধেক ভালো-মতপার্থক্যের সীমা কোথায়?

​অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন

হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব

বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা

​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা