অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন
বৈশাখের তপ্ত রৌদ্রদাহের মাঝে এক পশলা বৃষ্টির মতো শান্তি আর আশীর্বাদ নিয়ে আসে অক্ষয় তৃতীয়া। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই তিথিটি কেবল একটি পঞ্জিকার তারিখ নয়, বরং এটি অন্তহীন প্রাপ্তি, পুণ্য আর নতুন সূচনার এক মহিমান্বিত ক্ষণ। শাস্ত্রীয় ভাষায় ‘অক্ষয়’ মানে যার ক্ষয় নেই, যা অবিনশ্বর। বিশ্বাস করা হয়, এই পুণ্যলগ্নে সম্পাদিত যেকোনো সৎ কাজ, প্রার্থনা কিংবা দান-ধ্যানের ফল অক্ষয় হয়ে রয় মানুষের জীবনজুড়ে। আকাশমণ্ডলীতে সূর্য ও চন্দ্র যখন নিজ নিজ কক্ষপথে সর্বোচ্চ দীপ্তিতে অবস্থান করে, তখনই মর্ত্যে নেমে আসে এই আধ্যাত্মিক শুভ যোগ।
এই দিনটির তাৎপর্য ইতিহাসের পাতায় ও পুরাণের পরতে পরতে অতি উজ্জ্বলভাবে অঙ্কিত। ভারততত্ত্ব ও হিন্দু শাস্ত্রীয় আখ্যান অনুযায়ী, এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই মর্ত্যবাসীর পাপক্ষালনের তরে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে এসেছিলেন দেবী গঙ্গা। মহর্ষি বেদব্যাস ও সিদ্ধিদাতা গণেশ যখন মহাভারতের মতো মহাকাব্য রচনার সূত্রপাত করেছিলেন, সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিও ছিল এই শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি। এমনকি সত্য যুগের অবসান ঘটিয়ে ত্রেতা যুগের যে নবপ্রভাত সূচিত হয়েছিল, তা-ও ছিল এই পবিত্র দিনে। শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদে দ্রৌপদীর ‘অক্ষয় পাত্র’ লাভের কাহিনী আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, সংকটের দিনে অচলা ভক্তি থাকলে আশীর্বাদের ধারা কখনো শুকিয়ে যায় না।
বাঙালি লোকসংস্কৃতি ও ব্যবসায়িক ঐতিহ্যে অক্ষয় তৃতীয়া এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হালখাতার রঙিন মলাটে নতুন বছরের হিসাব শুরু করার যে রেওয়াজ, তার মূলে রয়েছে লক্ষ্মী ও গণেশের আশীর্বাদ নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। এদিন কেবল ব্যবসায়িক লেনদেন নয়, বরং সামাজিক মিলবন্ধনের এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়। গৃহস্থ ঘরে ঘরে মঙ্গলঘট স্থাপন, পূজা-অর্চনা আর সোনা বা রূপার মতো ধাতু ক্রয়ের মাধ্যমে মানুষ মূলত অমঙ্গলকে দূরে ঠেলে মঙ্গলের আবাহন করে। তবে এই উৎসবের গূঢ় অর্থ কেবল বস্তুগত সম্পদ আহরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আত্মার শুদ্ধি ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মাঝেই এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
অক্ষয় তৃতীয়ায় দানের মাহাত্ম্য অপরিসীম। অন্ন, জল কিংবা বস্ত্র দানের মাধ্যমে যে মানসিক তৃপ্তি ও পুণ্য অর্জিত হয়, তা দাতার জীবনকে ঋদ্ধ করে। আজকের এই বস্তুবাদী পৃথিবীতে অক্ষয় তৃতীয়া আমাদের শেখায় মনের ক্ষুদ্রতা ও মালিন্য বিসর্জন দিয়ে উদার হতে। এই তিথি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জাগতিক সম্পদ সাময়িক হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, করুণা আর সৎ কর্মের যে সঞ্চয়, তা-ই প্রকৃত ‘অক্ষয়’ সম্পদ। অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার এই যাত্রায় অক্ষয় তৃতীয়া হোক আমাদের জীবনের নতুন প্রেরণা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ হবে ইতিবাচকতা আর সমৃদ্ধির জয়গানে মুখরিত।
( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক )
এমএসএম / এমএসএম
কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য
পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ
ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়
পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি
কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন
বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র
বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ
বাসযোগ্য নগর গড়তে ঢাকা’র ওপর চাপ কমান
বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা ও জেন-জি’র সমর্থন: আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নতুন মেলবন্ধন
কৃষক মরছে কীটনাশকে
এই গ্রহের সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের লোভ অসীম