ইতিহাসের ভয়াবহতম খাদ্য সংকটে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ
যখন প্রযুক্তির উৎকর্ষে পৃথিবী মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই মাটির পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের পাত খালি থাকছে। ক্ষুধার জ্বালায় হাহাকার করছে বিশ্বের ৫৯টি দেশের নাগরিক। "গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি) ২০২৬"-এর ১০ম সংস্করণের তথ্যমতে, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সঙ্গে বিশ্বের দুটি ভিন্ন অঞ্চলে "দুর্ভিক্ষ" ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানের চোখে ক্ষুধার মানচিত্র: জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে এসে তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লাখে। এটি ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৮.২% বা ৬৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার।
ক্ষুধার শীর্ষে থাকা ১০ দেশ: জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তীব্র ক্ষুধার্ত মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই মাত্র ১০টি দেশে সীমাবদ্ধ। দেশগুলো হলো: বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, কঙ্গো (ডিআরসি), মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেন।
দুর্ভিক্ষের "হটস্পট" সুদান ও গাজা: ইতিহাসে এই প্রথম একই বছরে দুটি ভিন্ন ভূখণ্ডে সুদান ও ফিলিস্তিনের গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। সুদানের গৃহযুদ্ধের কারণে ১৯ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এখন অনাহারে। অন্যদিকে, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে না পারায় সেখানে প্রতি দশজনে আটজনই তীব্র ক্ষুধার শিকার। এছাড়া হাইতি, মালি এবং ইয়েমেনকেও দুর্ভিক্ষের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বা "হটস্পট" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেন এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট? (ত্রিমুখী কারণ):
১. সংঘাত ও যুদ্ধ: বিশ্বজুড়ে ৭০ শতাংশ ক্ষুধার্ত মানুষের বসবাসের প্রধান কারণ হলো যুদ্ধ। সুদান থেকে ইউক্রেন, গাজা থেকে মায়ানমার প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রই কৃষিজমি ধ্বংস করেছে এবং খাদ্য সরবরাহ চেইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ডব্লিউএফপি-এর মতে, "যুদ্ধ এখন ক্ষুধার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।"
২. জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো: ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এল নিনো এবং লা নিনা -এর প্রভাবে বৈশ্বিক আবহাওয়া আমূল বদলে গেছে। আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকায় খরা এবং এশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস শস্য উৎপাদন ব্যাহত করেছে। ডব্লিউএমও সতর্ক করেছে যে, ২০২৬-এর মাঝামাঝি থেকে পুনরায় এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. অর্থনৈতিক ধস ও মুদ্রাস্ফীতি : বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। আইএমএফ -এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি মানেই মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ক্ষুধার হার ৩.৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়া। নাইজেরিয়া বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন তাদের আয়ের ৮০ শতাংশই ব্যয়ের করছে খাবারের পেছনে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা: বিশ্বে বর্তমানে ৪ কোটি ২৮ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির (ওয়েস্টিং) শিকার। এদের মধ্যে ১ কোটি ২২ লাখ শিশু মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। এই শিশুরা পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছে, যা একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধসিয়ে দিচ্ছে।
ত্রাণ তহবিলে টান- সংকটের নতুন মাত্রা: জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালে বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের চাহিদ মিটানোর জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু দাতব্য দেশগুলোর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত অর্ধেক তহবিলও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে ডব্লিউএফপি তাদের রেশন কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খাবার দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন:
রাজনৈতিক সদিচ্ছা: যুদ্ধ বন্ধ করে নিরাপদ খাদ্য করিডোর নিশ্চিত করা।
জলবায়ু অর্থায়ন: ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কৃষকদের জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজ ও প্রযুক্তিতে সহায়তা দেওয়া।
খাদ্য অপচয় রোধ: বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপচয় হয়। এটি রোধ করতে পারলে কোটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব।
বিশ্ব আজ এক ক্রান্তিলগ্নে। আজ যদি ধনী রাষ্ট্রগুলো এগিয়ে না আসে, তবে ২০২৬ সাল মানব ইতিহাসের পাতায় একটি অন্ধকার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এমএসএম / এমএসএম
স্বাস্থ্যখাতের অরাজকতা রোধ করা জরুরী
অদম্য প্রত্যয়, নিরলস সেবা ও নিবিড় মনিটরিংয়ে অনিন্দ্য হজ ব্যবস্থাপনা
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমতাভিত্তিক শিক্ষা : প্রতিবন্ধী শিশুরা কি অন্তর্ভুক্ত
মহাসাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী: বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয় ও অলৌকিকতার মহাকাব্য
ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ ও উত্তরণের উপায়
অপরাধ আড়ালের মাধ্যম যেন না হয় ’গণমাধ্যম’
বাংলাদেশের টেকসই কৃষি ও গ্রাম উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের প্রশ্ন
নিরাপদ ট্রেন ভ্রমন নিশ্চিতে সচেষ্ট জিএম সুবক্তগীন
অসাধু কসাইদের প্রতারণা ও আমাদের অজ্ঞতা: সতেজতার আড়ালে অনিরাপদ মাংস
আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঈদুল আজহা
পাহাড়ে শান্তির পথপ্রদর্শক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
বিদ্যুৎ বিল কমানো জরুরি , সরকার উদ্যোগ নিবে এটাই সকলের প্রত্যাশা