ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ২২-৪-২০২৬ রাত ১২:৩২

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা এখন আর ধীরে বাড়ছে না; এটি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খাত এবং নগরায়নের সম্প্রসারণ-সবকিছু মিলিয়ে জ্বালানির উপর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৬.৫ থেকে ৭.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রয়োজন হয়, যা অদূর ভবিষ্যতে ৯ থেকে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। কিন্তু এই চাহিদার বিপরীতে দেশের নিজস্ব রিফাইনিং সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, যার ফলে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ জ্বালানি প্রস্তুত পণ্য হিসেবে আমদানি করতে হয়, এবং এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। 

এই নির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি কৌশলগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশ যখন ডিজেল, জেট ফুয়েল বা অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত দামের সঙ্গে যুক্ত থাকে রিফাইনিং মার্জিন, ট্রেডিং প্রিমিয়াম এবং পরিবহন ব্যয়। বৈশ্বিক বাজারে রিফাইনিং মার্জিন প্রায়ই প্রতি ব্যারেলে ৮ থেকে ২০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। এর সঙ্গে যোগ হয় আরও ২ থেকে ৫ ডলার সমপরিমাণ খরচ। ফলে বাংলাদেশ এমন একটি পণ্যের জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিচ্ছে, যার একটি বড় অংশ আসলে প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ।

এখানেই বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে সামনে আসে।

এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশ সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রুড অয়েল ক্রয় করে এবং তা বিদেশি রিফাইনারিতে পাঠিয়ে নির্দিষ্ট টোলিং ফি প্রদান করে পরিশোধন করায়। সাধারণত এই টোলিং ফি প্রতি ব্যারেলে ৩ থেকে ৬ ডলারের মধ্যে থাকে। এরপর পরিশোধিত পণ্য দেশে আমদানি করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশ পুরো মূল্যচক্রের উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পায় এবং অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত খরচ কমাতে সক্ষম হয়।

অর্থনৈতিকভাবে এই মডেলটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি প্রতি ব্যারেলে গড়ে ৪ থেকে ৮ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা যায়, তবে দেশের মোট আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ৪১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৫০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একটি দেশের জন্য, যার বার্ষিক পেট্রোলিয়াম আমদানি ব্যয় ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে, এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।

তবে এই মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু খরচ সাশ্রয় নয়; এটি নিয়ন্ত্রণ ও নমনীয়তা প্রদান করে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবহারের একটি বড় অংশ ডিজেল নির্ভর, যা মোট ব্যবহারের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। কিন্তু প্রস্তুত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দেশকে অনেক সময় এমন পণ্যও নিতে হয় যা বাস্তবে কম প্রয়োজন। টোল ব্লেন্ডিং ব্যবস্থায় বাংলাদেশ নিজের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের ধরন নির্ধারণ করতে পারে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে।

এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক সরবরাহকারী দেশের উপর নির্ভরতা বাংলাদেশকে ঝুঁকির মধ্যে রাখে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া বা বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি; এসব পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাব ফেলে। টোল ব্লেন্ডিং ব্যবস্থায় এই নির্ভরতা কমে, কারণ ক্রুড এক দেশ থেকে, রিফাইনিং অন্য দেশে এবং সরবরাহ ভিন্ন পথে করা যায়। ফলে সরবরাহ চেইন আরও স্থিতিশীল হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে Abu Dhabi National Oil Company পরিচালিত রিফাইনারি এবং ফুজাইরাহ ও জেবেল আলির মতো হাবগুলো বিশ্বমানের সুবিধা প্রদান করে। এই অঞ্চলে উন্নত অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বৃহৎ পরিসরের সংরক্ষণ ও ব্লেন্ডিং সুবিধা রয়েছে, যা বাংলাদেশকে দ্রুত ও দক্ষভাবে এই মডেল বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে।

তবে এই মডেল বাস্তবায়ন সহজ নয়। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ক্রুড ক্রয়, রিফাইনিং, পরিবহন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সবকিছু একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা একটি বড় ঝুঁকি, যা সঠিকভাবে হেজিং না করলে লাভ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলি-যেমন উৎপাদনের গুণমান, ক্ষতির সীমা এবং সরবরাহ সময়সূচি-স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

এছাড়া, এই ধরনের মডেল পরিচালনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপিসি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এই উদ্যোগ বাস্তবিক অর্থে জাতীয় স্বার্থে কাজ করে।

বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নিজস্ব রিফাইনিং ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, কিন্তু এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে। সেই প্রেক্ষাপটে বিদেশে টোল ব্লেন্ডিং একটি মধ্যবর্তী সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে-যা তাৎক্ষণিকভাবে খরচ কমাবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।

বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাস্তবতায় নিরাপত্তা মানে শুধু জ্বালানি পাওয়া নয়-বরং তা সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া, সময়মতো পাওয়া এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং বাংলাদেশকে এই তিনটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এটি আর শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও তেল-গ্যাস বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!

কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে

“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”

অর্ধেক পাগল, অর্ধেক ভালো-মতপার্থক্যের সীমা কোথায়?

​অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন

হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব

বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা

​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা

পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি

সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা

চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল দরকার

নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়