চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অপরিহার্য
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রধান ঘাঁটি এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে সুপরিচিত। এই শহর শুধু একটি বন্দরনগরী নয়, বরং এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের জন্য চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন চট্টগ্রামে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে আসা-যাওয়া করেন। শিল্পাঞ্চল, সমুদ্রবন্দর, রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রম, পর্যটন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কারণে এই শহরের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহরে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এখনো জনসংখ্যা ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে চট্টগ্রামে আরো আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়নের গতি গত কয়েক দশকে অত্যন্ত দ্রুত হয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বে চট্টগ্রাম শহর ও এর আশেপাশের জনসংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৭৮ হাজার। চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ বসবাস করে বলে ধারণা করা হয়। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ১ কোটি (২০২২ সালের জনশুমারী অনুযায়ী ৯১ লাখ ৬৯ হাজার ৪৬৫) লোকে বসবাস, যার একটি বড় অংশ চিকিৎসা সেবার জন্য চট্টগ্রাম শহরের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া আশপাশের জেলা যেমন কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, বি-বাড়িয়া, চাঁদপুর এবং ফেনী জেলার মানুষও উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে আসেন। ফলে শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত। হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হলেও বাস্তবে এখানে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে চিকিৎসা সেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। যা একটি আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য মোটেও কাম্য নয়।
চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক শহরে দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক বেশি। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা, শিল্প দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটে থাকে। এসব দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ট্রমা সেন্টার ও আধুনিক জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রের সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত। ফলে গুরুতর আহত রোগীদের অনেক সময় ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়, যা সময়ের অপচয় ঘটায় এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার ঘাটতি। হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি, নিউরোলজি, শিশু চিকিৎসা এবং মাতৃস্বাস্থ্য সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে পর্যাপ্ত আধুনিক সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি। যদিও কিছু বেসরকারি হাসপাতাল উন্নত চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে, তবে সেগুলোর ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যার ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামে বেসরকারি খাতে কিছু উন্নত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এসব হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের আয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে স্বাস্থ্যসেবায় একটি বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষ উন্নত চিকিৎসা পায়, আর নিম্ন আয়ের মানুষ মৌলিক চিকিৎসা সেবার জন্য সংগ্রাম করে। একটি উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। তাই সরকারিভাবে আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ এবং চিকিৎসা সেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।
চট্টগ্রাম একটি সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক শহর হওয়ায় এখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয়। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী প্রতিদিন কাজ করেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ছাড়া শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। কারণ অসুস্থ কর্মী বা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না হলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় মহামারি বা দুর্যোগের সময়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মহামারির সময় দেখা গেছে, হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ এবং অক্সিজেন সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে জীবন হারিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে ভবিষ্যতে যেকোনো বড় স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার জন্য আধুনিক হাসপাতাল এবং উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তোলে। পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং দূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল থেকে রোগীরা চিকিৎসার জন্য শহরে আসেন। এসব অঞ্চলের অনেক মানুষ সময়মতো চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়ার কারণে জটিল রোগে আক্রান্ত হন। যদি শহরের বিভিন্ন স্থানে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা যায়, তবে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারবেন এবং মৃত্যুহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মা ও নবজাতক বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হন। উন্নত মাতৃসেবা, নবজাতক ইউনিট এবং জরুরি প্রসূতি সেবা না থাকলে মা ও শিশুর মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। একটি উন্নত মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল এই সমস্যাগুলো সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একটি শহরে যদি আধুনিক হাসপাতাল থাকে, তবে তা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সেইসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, যেখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো বিদ্যমান থাকে। তাই চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন শুধু স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নই নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শহরের কেন্দ্রস্থল ছাড়াও বিভিন্ন উপশহর ও শিল্পাঞ্চলে হাসপাতাল স্থাপন করা প্রয়োজন। যেমন; পটিয়া, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই এবং বাঁশখালী অঞ্চলে শিল্প ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় হাসপাতাল স্থাপন করা হলে শহরের কেন্দ্রীয় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমে যাবে।
এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করাও প্রয়োজন। একটি আধুনিক হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা সেবা প্রদান করে না, বরং এটি চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। চট্টগ্রামে যদি আরও মেডিকেল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তবে নতুন নতুন রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এসব প্রযুক্তি চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে চালু করা যায়, তবে রোগীরা দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা সেবা পেতে পারবেন।
চট্টগ্রামের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাসপাতালের সংখ্যা থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা জনসংখ্যা ও রোগীর চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি, আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত। এই বাস্তবতা চট্টগ্রামে নতুন আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে।
চমেক হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। চিকিৎসকসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, ভুল চিকিৎসা বা অসম্পূর্ণ চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকিৎসা সেবা প্রদান করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতাল হলো চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। মহামারির সময় এই হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে শয্যা সংখ্যা সীমিত এবং আইসিইউ সুবিধা কম থাকায় বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এই হাসপাতালের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মা ও নবজাতক এখানে চিকিৎসা গ্রহণ করে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং রোগীর চাপ বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি চট্টগ্রামে বেশ কিছু বেসরকারি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে। এর মধ্যে এভারকেয়ার চট্টগ্রাম ও ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল চট্টগ্রাম উল্লেখযোগ্য। এগুলো আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক হাসপাতাল হলেও চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের ঘাটতি। আধুনিক চিকিৎসায় আইসিইউ একটি অপরিহার্য উপাদান। গুরুতর রোগী, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি বা অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের জন্য আইসিইউ প্রয়োজন হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেক রোগীকে প্রয়োজনীয় সময়ে আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।
আইসিইউ সংকটের কারণে অনেক রোগীকে ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়। এই ঢাকামুখী প্রবণতা চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। গুরুতর রোগে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় নেওয়ার সময় অনেক রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা পথেই মৃত্যুবরণ করে, যা একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
চট্টগ্রামে ক্যান্সার চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও কিছু ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে, তবে সেগুলোর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। অনেক রোগীকে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং মানসিক চাপ; সবকিছুই বেড়ে যায়।
কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ডায়ালাইসিস সুবিধা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। ফলে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় অথবা উচ্চমূল্যে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
চট্টগ্রামে স্বাস্থ্যব্যয়ের বৈষম্য একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া গেলেও সেখানে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও ব্যয় এত বেশি যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ফলে সমাজে একটি দ্বৈত স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে ধনী ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবার মানে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
এই বৈষম্যের ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। কখনো কখনো দেখা যায়, একটি পরিবারের একজন সদস্যের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পুরো পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাতের নয়, বরং একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিল্পাঞ্চলগুলোর বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে। সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা এবং পটিয়া অঞ্চলে দ্রুত শিল্পায়ন হচ্ছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন ভারী শিল্প, জাহাজভাঙা শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কারখানা গড়ে উঠছে। এসব শিল্পে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব এলাকায় পর্যাপ্ত আধুনিক হাসপাতাল না থাকায় দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি বছর দেশি-বিদেশি পর্যটক চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় ভ্রমণ করতে আসেন। পর্যটকদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো পর্যটক অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনায় পড়লে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি। অনেক সময় দেখা যায়, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবল না থাকায় সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় না। তাই নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। নতুন হাসপাতাল নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত জায়গা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত জনবল এবং জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়নের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে আগামী দশকগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে যে স্বাস্থ্য অবকাঠামো রয়েছে, তা ইতোমধ্যেই চাহিদার তুলনায় কম। এই অবস্থায় যদি নতুন আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের অঞ্চলে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা, পটিয়া এবং কর্ণফুলী এলাকায় শিল্পায়নের গতি অত্যন্ত দ্রুত। সরকার ঘোষিত মেগা প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ফলে এই এলাকাগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাবে, এটি একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, শিল্প দূষণ এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য আধুনিক হাসপাতাল এবং উন্নত প্রযুক্তি অপরিহার্য।
মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য একটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। চট্টগ্রামে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক নারী সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অনেক মা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে প্রসবকালীন জটিলতা বৃদ্ধি পায় এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। যদি শহরের বিভিন্ন স্থানে আধুনিক মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল স্থাপন করা যায়, তবে এই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম একটি উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি এখানে তুলনামূলক বেশি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং পাহাড়ধস প্রায়ই এই অঞ্চলে ঘটে থাকে। এসব দুর্যোগের সময় আহত ও অসুস্থ মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। তখন বিদ্যমান হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের সময় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত হাসপাতাল না থাকায় অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আরো একাধিক আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বব্যাপী মহামারি পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে, স্বাস্থ্য অবকাঠামো যত শক্তিশালী হবে, একটি দেশ তত দ্রুত সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। সাম্প্রতিক মহামারির সময় দেখা গেছে, হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ এবং অক্সিজেনের ঘাটতি বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছিল। অনেক রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে বিপদে পড়েছিলেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হলে আধুনিক হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে স্বাস্থ্য অবকাঠামোর একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সেই অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, যেখানে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা, নিরাপদ পরিবেশ এবং আধুনিক অবকাঠামো রয়েছে। তাই চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা হলে তা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রামে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও আধুনিক হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি উন্নত হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা সেবা প্রদান করে না, বরং এটি একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। নতুন রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন, উন্নত ওষুধ তৈরি এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নে গবেষণার ভূমিকা অপরিসীম। যদি চট্টগ্রামে আরও গবেষণাধর্মী হাসপাতাল স্থাপন করা যায়, তবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মান উন্নত হবে।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। আধুনিক হাসপাতালগুলোতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, টেলিমেডিসিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে চিকিৎসা সেবা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে প্রদান করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার রোগীদের জন্য যেমন সুবিধাজনক, তেমনি চিকিৎসকদের কাজকেও সহজ করে। উদাহরণস্বরূপ, টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার রোগীরা শহরে না এসেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি বড় হাসপাতাল পরিচালনার জন্য শত শত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং সহায়ক কর্মীর প্রয়োজন হয়। ফলে নতুন হাসপাতাল স্থাপনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে। বর্তমানে অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে যান। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। যদি দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই অর্থ দেশের মধ্যেই থাকবে এবং জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশবান্ধব হাসপাতাল নির্মাণ। আধুনিক হাসপাতালগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি পরিশোধন এবং শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। এতে পরিবেশ দূষণ কমবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালগুলো এমন স্থানে নির্মাণ করতে হবে, যেখানে সহজে যাতায়াত করা যায় এবং জরুরি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পার্কিং, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং হেলিপ্যাডের মতো আধুনিক সুবিধাও থাকা উচিত।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবসম্মত করণীয় নির্ধারণ করা। শুধু প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করলেই হবে না, বরং কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায় এবং কোথায় কোথায় নতুন হাসপাতাল স্থাপন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি ছাড়া চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামে নতুন হাসপাতাল স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে তা হলো ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার ঘনত্ব। বর্তমানে অধিকাংশ বড় হাসপাতাল শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ফলে শহরের বাইরের এলাকা থেকে রোগীদের চিকিৎসা নিতে শহরে আসতে হয়, যা সময় ও অর্থ উভয়ই ব্যয়বহুল করে তোলে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নতুন আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে পটিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই এলাকায় জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে। পটিয়া একটি পুরোনো প্রশাসনিক এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানে এখনো বড় আকারের আধুনিক সরকারি হাসপাতাল নেই। ফলে স্থানীয় জনগণকে চিকিৎসার জন্য শহরে যেতে হয়। যদি পটিয়ায় একটি ৫০০ থেকে ১০০০ শয্যার আধুনিক সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করা যায়, তবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
একইভাবে সীতাকুণ্ড এলাকা বর্তমানে শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে জাহাজভাঙা শিল্প, ভারী শিল্প এবং বিভিন্ন কারখানা রয়েছে। এসব শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সুবিধা অত্যন্ত প্রয়োজন। সীতাকুণ্ডে একটি বিশেষায়িত ট্রমা সেন্টার ও বার্ন ইউনিট স্থাপন করা হলে শিল্প দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামে নতুন হাসপাতাল স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না, বরং আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হাসপাতাল নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সের অভাবে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্স প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নত দেশগুলোতে জাতীয় বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলে দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে সরকারের যথাযথ নীতিমালা ও তদারকি থাকা প্রয়োজন, যাতে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে না যায়। সরকার চাইলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন হাসপাতাল স্থাপন করতে পারে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। আধুনিক আইসিইউ ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় গবেষণা ও প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রামে একটি উন্নত মেডিকেল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা হবে। এই ধরনের উদ্যোগ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও সময়ের দাবি। ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা এবং টেলিমেডিসিন সেবা চালু করা হলে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা সেবা পেতে পারবেন। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকার রোগীদের জন্য টেলিমেডিসিন একটি অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে।
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। হাসপাতালের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে তা পরিবেশ দূষণের কারণ হতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব হাসপাতাল নির্মাণ এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় রোগী দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারার কারণে জটিলতা বৃদ্ধি পায়। যদি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে জরুরি রোগীদের জীবন রক্ষা করা সহজ হবে।
সবশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি একটি মানবিক ও জাতীয় দায়িত্ব। একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা অপরিহার্য। চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে যদি পর্যাপ্ত আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা যায়, তবে তা শুধু স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে এখন সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি খাত, চিকিৎসক সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার চাইলে আধুনিক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। যদি আজই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে আগামী প্রজন্ম একটি উন্নত ও নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা উপহার পাবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট
এমএসএম / এমএসএম
আকাশপথে স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত: শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক রাডারের যাত্রা শুরু
চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অপরিহার্য
বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!
কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে
“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”
অর্ধেক পাগল, অর্ধেক ভালো-মতপার্থক্যের সীমা কোথায়?
অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন
হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব
বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা
পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা
পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি
সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক