ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

অসাম্প্রদায়িক ও শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর পঙ্কজ ভট্টাচার্য


মানিক লাল ঘোষ photo মানিক লাল ঘোষ
প্রকাশিত: ২৪-৪-২০২৬ রাত ১০:৪৭

​বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনীতির মহাকাব্যে পঙ্কজ ভট্টাচার্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৩৯ সালের ৬ আগস্ট বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়ায় তাঁর জন্ম। মাস্টারদা সূর্য সেনের স্মৃতিধন্য সেই মাটি থেকেই তিনি আহরণ করেছিলেন দ্রোহের মন্ত্র। কৈশোরেই রাজনীতির পাঠ নেওয়া পঙ্কজ ভট্টাচার্য ১৯৫৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে শুরু করেন এক অবিনাশী পথচলা। ছাত্র ইউনিয়নকে একটি শক্তিশালী গণসংগঠনে রূপ দিতে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। বিশেষ করে ১৯৬৪ সালে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের দোসর মোনায়েম খানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন পণ্ড করার নেতৃত্বে দিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো রাজবন্দি হন। ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি বাঁকেই তিনি ছিলেন অকুতোভয় অগ্রসৈনিক।
​১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে তিনি যুদ্ধের ময়দানে রণকৌশল ও সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘকাল ন্যাপ-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীকালে প্রগতিশীল শক্তির বৃহত্তর ঐক্যের লক্ষ্যে 'ঐক্য ন্যাপ' গঠন করে আমৃত্যু এর নেতৃত্ব দেন। ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনো প্রলুব্ধ করতে পারেনি; মন্ত্রী হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব বিনম্রচিত্তে প্রত্যাখ্যান করে তিনি আমৃত্যু মেহনতি মানুষের পাশেই থেকেছেন।
​জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সখ্য ছিল এক বিরল আদর্শিক বন্ধুত্বের। ১৯৬৭ সালে তথাকথিত ‘স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা’র রাজবন্দি হিসেবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি বঙ্গবন্ধুর গভীর সান্নিধ্য লাভ করেন। সেই দিনগুলোর একটি স্মৃতি আজও ইতিহাসের পাতায় অম্লান। পঙ্কজদার কারামুক্তির দিনে নিয়ম অনুযায়ী বন্দিদের ছোট পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারাকর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন বড় ফটক পুরো খুলে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর সেই সম্মানে মাথা উঁচু করেই কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এই বিপ্লবী। তাঁদের রাজনৈতিক দলের ভিন্নতা থাকলেও অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তাঁরা ছিলেন এক ও অভিন্ন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর একজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। এমনকি ১৯৭৫-এর কালরাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর চরম প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অদম্য সাহস দেখিয়েছেন।
​দীর্ঘ ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে জেল, জুলুম আর হুলিয়া তাঁর আপসহীন চেতনাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি। ব্যক্তিগত জীবনে জীবনসঙ্গিনী ও প্রখ্যাত নারীনেত্রী রাখী দাশ পুরকায়স্থকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেও তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা কখনো ফিকে হয়নি। গড়ে তুলেছিলেন 'সামাজিক আন্দোলন'-এর মতো প্ল্যাটফর্ম। তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার সেই সব দিন’ কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল এই প্রবাদপ্রতিম নেতার জীবনাবসান ঘটে। পঙ্কজ ভট্টাচার্য আজ পার্থিব জগতে নেই, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার সংগ্রাম অনাগত প্রজন্মের জন্য ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। এই মহান বিপ্লবীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
​( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

এমএসএম / এমএসএম

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান