ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

শিরোনাম- রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ! ভবিষ্যতের জন্য সুফল নাকি ঝুঁকি বাড়াবে


মো. জাহিদুর রহমান photo মো. জাহিদুর রহমান
প্রকাশিত: ২২-৪-২০২৬ রাত ১০:৪২

সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। ত্রয়োদশ জাতীয়সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৮ এপ্রিল ২০২৬ আওয়ামীলীগের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলো। এর আগে গত বছর ১২ মে ২০২৫ অন্তর্বর্ওীকালীন সরকারের অধ্যাদেশের বলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদে এ–সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও এই আইনে থাকছে। আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান ছিল না। কিন্তু এই নিষিদ্ধকরণ কত দিন বহাল থাকবে? কখনো কি এই আইন রহিত করা হবে? কখনো কি আওয়ামিলীগ রাজনীতি করতে পারবে?  যদি না করতে পারে তাহলে এতদিন দেশের মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ৫২-৫৩% লোক যাদের সাপোর্ট করেছে কি হবে তাদের? সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয়সংসদ নির্বাচন সেই নির্বাচনে পুরো জনগোষ্ঠীর সমর্থন ছিলো না। নির্বাচন নিয়ে অনেক সমালোচনা আমরা দেখেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম দিকে ফেয়ার নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষমেশ নানা ভাবে বিতর্কিত হয়েগেলো। নির্বাচনের স্বচ্ছতা যদি হিসেব করি তাহলে বলবো আগে একপক্ষ ভোট দিয়েছে এবার আরেক পক্ষ ভোট দিয়েছে যারা বিগত ১৭ বছর ভোট দিতে পারেনি বা দেয়নি। এককথায় নির্বাচনটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ছিলোনা। তারপরও বলবো এতদিন একটা পক্ষের মনে ক্ষোভ ছিলো ক্ষমতায় না যাওয়ার যে ভাবে হোক তারা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে। ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের একটা অভিনব টেকনিক ছিলো আওয়ামীলীগের ভোট পাওয়া। এজন্য বিএনপি ও জামায়াত সকলের পক্ষথেকে প্রতিশ্রুতি ছিলো তাদের উপর কোন ধরনের মানসিক, শারিরীক বা অন্যকোন ভাবে আঘাত না করা। এজন্য নির্বাচনের পরে বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামিলীগের কিছু কিছু অফিস খুলেও দেয়া হয়েছিলো এতেকরে তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলো কিন্তু আইন করে নিষিদ্ধ ও শাস্তির বিধানযুক্ত করায় যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা হলো। আইন করে কারো অধিকার হরণ করা কি যৌক্তিক? কখনোই নয়। বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা দেখি বাঁধার মুখে প্রেম ভালোবাসা আরো বেগবান হয়ে ওঠে তেমনি এই নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা হতে পারে।
আইন করে কোন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে তা কোন দলের কল্যাণ বয়ে আনলেও দেশের সার্বিক কল্যাণের পথে বাঁধা সৃষ্টি করে। 

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করণের আন্তর্জাতিক মানদন্ড :

কোন দলকে নিষিদ্ধ করার আগে বুঝতে হবে আন্তর্জাতিক নিয়ম কী বলে, তা দেখা দরকার। ইউরোপের ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’-এর অধীন ভেনিস কমিশন ২০০০ সালে একটি গাইডলাইন দেয় (গাইডলাইনস অন প্রোহিবিশন অ্যান্ড ডিসলিউশন অব পলিটিক্যাল পার্টিজ অ্যান্ড অ্যানালগাস মেজারস)। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলকে সহজে নিষিদ্ধ করা যাবে না; এটি করা যাবে শুধু খুবই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, যেমন দলটি সহিংসতা সমর্থন করে বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভাঙতে সহিংস পথ নেয়। শুধু রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেই দল নিষিদ্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়। 
এ দৃষ্টিতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ক্ষেত্রে কেউ অপরাধ করলে ব্যক্তিগতভাবে তার বিচার হওয়া উচিত, পুরো দলকে দায়ী করা নয়। 
আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, দল নিষিদ্ধ হবে একেবারে শেষ উপায়—‘আটমোস্ট রেস্ট্রেইন্ট’ বা সর্বোচ্চ সংযম মেনে। নইলে এটি ‘কালেকটিভ পানিশমেন্ট’ বা সমষ্টিগত শাস্তি হয়ে যেতে পারে, যা রাজনীতিকে একপেশে ও প্রতিশোধমূলক করে তোলে। তাই ভেনিস কমিশন এবং অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ বলেছে, এ ক্ষেত্রে ‘প্রপোরশনালিটি’ (মাত্রার ভারসাম্য রাখা), ‘নেসেসিটি’ (অপরিহার্যতা) ও ‘জুডিশিয়াল স্ক্রুটিনি’ (বিচারিক যাচাই-বাছাই) মানা জরুরি। 
আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেখলে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়। সব দেশে দল নিষিদ্ধ করলে একই ফল হয় না, কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই এতে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি ব্রিফিং (ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ব্রিফিং অন পলিটিক্যাল পার্টি ব্যানস’, আগস্ট ২০২৫) দেখায়, সেখানে দল নিষিদ্ধকে গণতন্ত্র বাঁচানোর শেষ অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়; সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়ার উপায় হিসেবে নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে দেশভিত্তিকভাবে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। 
বিজ্ঞাপন
অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, তা হলো প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিকে দুর্বল করে কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বিএনপির জন্য এখানেই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞাকে যদি স্থায়ী আইনি কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়, কিন্তু একই সঙ্গে বিচার, মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত সংস্কারগুলো পিছিয়ে যায়, তাহলে তা একটি সংকট সৃষ্টি করবে। 

ডেমোক্রেসি’ (প্রতিরক্ষামূলক গণতন্ত্র) ধারণা থাকলেও বাস্তবে কোনো দল নিষিদ্ধ করা খুবই কঠিন। আদালতকে প্রমাণ করতে হয়, দলটি সত্যিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। শুধু অপছন্দ, ঘৃণা বা অতীতের অভিযোগ যথেষ্ট নয়। ভেনিস কমিশনের গাইডলাইনেও (গাইডলাইনস অন লেজিসলেশন অন পলিটিক্যাল পার্টিজ, ২০০০) একই কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শক্ত প্রমাণ ও স্বাধীন আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া দল নিষিদ্ধ করা যায় না। 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরূপ প্রভাব:
স্পেন
স্পেনের অভিজ্ঞতা একটি ভিন্ন চিত্র দেখায়। বাস্ক অঞ্চলের দল ‘বাতাসুনা’ নিষিদ্ধ করা নিয়ে গবেষক আন্দ্রেউ আরেনাস ২০২১ সালে ‘পার্টি ব্যানস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স: এভিডেন্স ফ্রম বাতাসুনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দেখান, দল নিষিদ্ধ করলে কখনো ‘ডিটারেন্স’ (প্রতিরোধমূলক ভীতি–প্রদর্শন) কাজ করলেও ‘ব্যাকল্যাশ’ (তীব্র পাল্টা–প্রতিক্রিয়া) তৈরি হতে পারে। তবে এ উদাহরণ সরাসরি প্রযোজ্য নয়, কারণ সেখানে ইটা (ইউস্কাদি তা আস্কাতাসুনা)-এর মতো সশস্ত্র সংগঠনের বিষয় ছিল। তাই এটিকে সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। :
মিসর
এরপর মিসরের অভিজ্ঞতা আরও বড় সতর্কতা দেয়। ২০১১ সালের পর গণতন্ত্রের সুযোগ থাকলেও তা ব্যর্থ হয় এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করার পরও সংগঠনটি শেষ হয়নি; বরং ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ কার্যক্রম ও ‘ভিকটিমহুড ন্যারেটিভ’ বা সব সময় অন্যের অত্যাচারের শিকার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার বয়ান বেড়েছে। এতে সমাজে বিভাজন ও উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় (সিএফআর, অ্যানালিসিস অন ইজিপ্ট, ২০১৪; ব্রুকিংস রিপোর্ট অন রিথিংকিং পলিটিক্যাল ইসলাম, ২০১৫)। অর্থাৎ নিষিদ্ধ করলেই সমস্যা শেষ হয় না; বরং নতুন রূপ নেয়। 
থাইল্যান্ড
সবশেষে থাইল্যান্ডের ঘটনাও একই শিক্ষা দেয়। ২০২৪ সালে ‘মুভ ফরওয়ার্ড পার্টি’ ভেঙে দেওয়ার পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এটি মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর (ডিপ্রোস মুচেনা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ৭ আগস্ট ২০২৪)। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও এটিকে গণতন্ত্রের জন্য বড় ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছে (থাইল্যান্ড: কনস্টিটিউশনাল কোর্ট ডিসলভস অপজিশন পার্টি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ২০২৪)। এতে বোঝা যায়, বড় বিরোধী দল সরালে রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। 
সহজভাবে বললে, এ অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। একবার যদি ‘পছন্দের নয়’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে বড় রাজনৈতিক দল ভেঙে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার একই পথ ব্যবহার করতে পারে। আজ যদি লক্ষ্য হয় আওয়ামী লীগ, কাল সেটি অন্য কোনো দলও হতে পারে। 
এ কারণেই ‘বিচার’ ও ‘নিষিদ্ধকরণ’—দুটিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ট্রানজিশনাল জাস্টিস নিয়ে অ্যানজা মিহর তাঁর রেজিম কনসোলিডেশন অ্যান্ড ট্রানজিশনাল জাস্টিস বইয়ে দেখিয়েছেন, বিচার, সত্য উদ্‌ঘাটন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গণতন্ত্রের মান উন্নত করতে পারে, যদি তা প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়। 
আবার জিওফ ড্যান্সি ২০২৫ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ট্রানজিশনাল জাস্টিস’-এ সতর্ক করেছেন, ট্রানজিশনাল জাস্টিস ভুলভাবে ব্যবহার হলে সেটি গণতান্ত্রিক অবক্ষয়েরও কারণ হতে পারে। অর্থাৎ ন্যায়বিচার দরকার, কিন্তু সেটি এমনভাবে দরকার, যাতে তা ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত করে, দলীয় শত্রুতা পাকাপোক্ত না করে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পিছনের কথা:

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং এটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামরিক শাসন, ও রাষ্ট্রীয় আদর্শ পরিবর্তনের সাথে যুক্ত। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে, পরবর্তীতে ১৯৭২-৭৫, ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামল এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে। 
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য সময়কাল:
পাকিস্তান আমল (১৯৫৮-১৯৭১): আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় (১৯৫৮) রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ধারাবাহিকতা শুরু হয়, যার আওতায় আওয়ামী লীগও নিষিদ্ধ হয়েছিল।  পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান সরকার আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ নিষিদ্ধ করে। 
স্বাধীনতার পর (১৯৭২-১৯৭৫): ১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল (BAKSAL) গঠনের মাধ্যমে সব দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করা হয়।
১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসন: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পরিবর্তনের পর সামরিক আইনে বাকশালসহ সব রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরূপ প্রভাবসমূহ:
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবক্ষয়: এটি ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি—সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা—নষ্ট করে। 
সহিংসতা ও উগ্রবাদের ঝুঁকি (Backlash Cost): দল নিষিদ্ধ হলে এর কর্মীরা সহিংস বা ভূগর্ভস্থ কার্যকলাপে লিপ্ত হতে পারে, যা দেশে সন্ত্রাসবাদ বা উগ্রবাদ উস্কে দিতে পারে।
প্রতিশোধমূলক রাজনীতি: এক দল অন্য দলকে নিষিদ্ধ করলে তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দুষ্টচক্র শুরু করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে [১, ৫]।
নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়া: বড় কোনো দল বা তার সমর্থকগোষ্ঠী ব্যালটে না থাকলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয় না এবং জনগণের অংশগ্রহণ কমে যায়। 
সামাজিক বিভাজন: এটি সমাজে গভীর অবিশ্বাস ও বিভেদ সৃষ্টি করে, যা জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করতে পারে ।
আন্তর্জাতিক ও আইনগত ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী দল নিষিদ্ধের আগে 'সর্বোচ্চ সংযম' (Utmost Restraint) মানা জরুরি। অন্যথায় এটি 'সমষ্টিগত শাস্তি' (Collective Punishment) হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন ওঠে। 
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ বিষয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে আসে: বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে নিয়মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা (রুল-বেজড গভর্ন্যান্স) গড়ে তুলছে, নাকি ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনের (পাওয়ার-বেজড গভর্ন্যান্স) দিকে ফিরে যাচ্ছে? 
শাস্তিমূলক আইন যদি দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলে আইন নিজেই নিরপেক্ষতা হারিয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এতে স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে সাংবিধানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধরনের ঝুঁকির উদাহরণ নতুন নয়। ১৯৯৬ ও ২০০৬—দুই সময়েই দেখা গেছে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সুবিধার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্য বিসর্জন দিয়েছে, তখন তার প্রভাব কেবল দলীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। 

এ অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, তা হলো প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিকে দুর্বল করে কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বিএনপির জন্য এখানেই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে।
এ কারণেই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস। রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে যদি স্থায়ী আইনি কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়, কিন্তু একই সঙ্গে বিচার, মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত সংস্কারগুলো পিছিয়ে যায়, তাহলে তা একটি ‘নর্মেটিভ’ সংকট সৃষ্টি করবে। 
তখন প্রশ্নটি আর কেবল রাজনৈতিক থাকবে না; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি জবাবদিহিমূলক ও সংস্কারমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হচ্ছে, নাকি পূর্ববর্তী নিয়ন্ত্রণমূলক শাসনব্যবস্থার নতুন রূপে ফিরে যাচ্ছে? 
এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, দেশের পরবর্তী পথচলা হবে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের দিকে, নাকি কেবল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। 

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

এমএসএম / এমএসএম

শিরোনাম- রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ! ভবিষ্যতের জন্য সুফল নাকি ঝুঁকি বাড়াবে

আকাশপথে স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত: শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক রাডারের যাত্রা শুরু

চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অপরিহার্য

বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!

কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে

“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”

অর্ধেক পাগল, অর্ধেক ভালো-মতপার্থক্যের সীমা কোথায়?

​অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন

হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব

বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা

​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা

পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি

সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক