হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আজ আর শান্ত নেই; সেখানে বইছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বারুদ-মাখা হাওয়া। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ যে সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালী এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি জলজ আগ্নেয়গিরি। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত "টোটাল নেভাল সিজ" (সম্পূর্ণ নৌ-অবরোধ), অন্যদিকে ইরানের বৈপ্লবিক "টোল-পলিসি" এই দুই দানবীয় শক্তির লড়াইয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। ১6 এপ্রিল ২০২৬-এর এই সকালটি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় হয়তো চিরস্থায়ী এক সংকটের শুরু হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।
১. ট্রাম্পের "অপারেশন থান্ডার": কেন ভেস্তে গেল ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনা?
গত কয়েক মাস ধরে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছিল, তা ছিল বিশ্ববাসীর শেষ আশার আলো। কিন্তু ৯ এপ্রিল সেই আশায় বজ্রপাত ঘটে। মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, ইরান আলোচনার আড়ালে প্রণালীর তলদেশে অত্যাধুনিক "স্মার্ট মাইন" এবং উপকূলে হাইপারসোনিক মিসাইল মোতায়েন করেছে।
এর জবাবে হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পের সেই ঐতিহাসিক গর্জন শোনা যায়: "ইরান আমাদের সরলতাকে দুর্বলতা ভেবেছে। তারা আমাদের জাহাজ থেকে কোটি কোটি ডলার টোল হিসেবে ডাকাতি করবে, আর আমরা আঙুল চুষব তা হবে না। আজ থেকে ইরানের প্রতিটি বন্দর আমরা মৃত ঘোষণা করলাম। ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন ৫ম নৌবহর প্রণালীর প্রবেশমুখ ঘিরে ফেলেছে, যাকে সামরিক পরিভাষায় বলা হচ্ছে ডেথ-ব্লক।
২. ২ মিলিয়ন ডলারের "জিপিএস টোল"- ইরানের মাস্টারস্ট্রোক: ইরান এবার কেবল গোলাগুলি নয়, বরং খেলছে "ইকোনমিক গেম"। তারা ঘোষণা করেছে, ওমান ও ইরানের মাঝখানের এই সরু পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতি জাহাজে ২ মিলিয়ন (২০ লক্ষ) মার্কিন ডলার টোল নেবে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরান এই অর্থ দাবি করছে ডিজিটাল ফর্মে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডোনাল্ড রথওয়েল বলছেন, "এটি সামুদ্রিক নেভিগেশনের শত বছরের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। তবে ইরান দাবি করছে, তাদের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করলে ভাড়া দিতেই হবে।"
৩. ডলার সাম্রাজ্যের পতন ও ইউয়ানের নতুন রাজত্ব: এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মোড় হলো মুদ্রা যুদ্ধ। গত ২৪ ঘণ্টায় যে কয়টি জাহাজ ইরানকে টোল দিয়ে পার হয়েছে, তার একটিও মার্কিন ডলারে পরিশোধ করেনি। লয়েডস লিস্ট নিশ্চিত করেছে, সব লেনদেন হয়েছে চীনা ইউয়ানে।
অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং সতর্ক করে বলেছেন, "আমরা যদি এখন ডলারে তেল কেনাবেচা করতে না পারি, তবে আমেরিকান ডলারের মূল্য কাগজের টুকরোয় পরিণত হবে। চীন ইতোমধ্যে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছে, তারা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
৪. বিশ্ববাজারে তেলের দামে "সুনামি": হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৫ ডলার স্পর্শ করেছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি ১৮০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।
এর প্রভাব হবে ভয়াবহ:
আকাশপথ ও পরিবহন: বিমান ভাড়া এক লাফে ৩০-৪০% বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ সংকট: এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: জাহাজ ভাড়া বাড়লে গম, ভোজ্যতেল এবং চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
৫. রাশিয়ার "বিয়ার" ও চীনের "ড্রাগন": মস্কো থেকে পুতিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একতরফা দাদাগিরি তারা বরদাশত করবেন না। রুশ রণতরীগুলো এখন ওমান সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, এটি আসলে একটি ত্রিমুখী জাল যেখানে আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার ছক কষছে বেইজিং ও মস্কো।
৬. বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত: বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক। এই সংকটের ফলে:
১. দেশে ডিজেল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়তে পারে।
২. লোডশেডিংয়ের মাত্রা অস্বাভাবিক হতে পারে।
৩. প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিও ধাক্কা খাবে।
ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর জাতিসংঘের মহাসচিব এন্টনিও গুতেরেস তেহরানের পথে রওনা হয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের "ইগো" আর খামেনির "জেদ" এই দুয়ের মাঝে শান্তি এখন এক সুদূরপরাহত কল্পনা। ২০২৬ সালের এই এপ্রিল মাস হয়তো মানবসভ্যতার জন্য এক নতুন শীতল যুদ্ধের (কোল্ড ওয়ার ২.০ ) সূচনা হিসেবে মনে রাখা হবে।
সাগরের নীল পানি আজ বারুদের রঙ ধারণ করেছে। বিশ্ববাসী এখন প্রার্থনা করছে একটুর জন্য যেন কারো ট্রিগারে আঙুল না পড়ে। কারণ, হরমুজে একবার আগুন লাগলে তা নেভানোর ক্ষমতা হয়তো কারো থাকবে না
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
এমএসএম / এমএসএম
রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়
বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর : স্মার্ট ইকোনমির আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা
সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য
কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য
পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ
ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়
পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি
কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন
বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র
বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ