ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

আকাশপথে স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত: শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক রাডারের যাত্রা শুরু


আব্দুর রউফ photo আব্দুর রউফ
প্রকাশিত: ২২-৪-২০২৬ দুপুর ৩:৫৪

বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবস্থাপনায় এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ চার দশকের পরনির্ভরশীলতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (এইচএসআইএ) আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ফ্রান্সের থ্যালেস গ্রুপের (থ্যালেস গ্রুপ) তৈরি অত্যাধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) সিস্টেম। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবহারকারী প্রতিটি ফ্লাইটের ওপর এখন থেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ঢাকার হাতে, যা আগে আংশিকভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
দীর্ঘ ৪৪ বছরের জিম্মি দশা থেকে মুক্তি: ১৯৮০ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে স্থাপিত পুরনো রাডারটির ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। আকাশপথে চলাচলকারী বিমানগুলো আধুনিক হলেও বাংলাদেশের রাডার ব্যবস্থা ছিল মান্ধাতা আমলের। ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যাওয়া বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে ভারতের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) ব্যবস্থার সহায়তা নিতে হতো। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি ফ্লাইটের আকাশপথ ব্যবহারের বিনিময়ে বাংলাদেশকে যে ৫০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০,০০০ টাকা) ফি দেওয়ার কথা ছিল, কারিগরি সক্ষমতা না থাকায় সেই অর্থ ভারত আদায় করে আসছিল। নতুন এই রাডার উদ্বোধনের ফলে সেই জিম্মিদশার অবসান ঘটলো। এখন থেকে এই বিশাল অংকের রাজস্ব সরাসরি জমা হবে বাংলাদেশের সরকারি কোষাগারে।

৪৬৩ কিলোমিটারের বিশাল চোখ: ভারতের বড় অংশ এখন নজরদারিতে।
ফ্রান্সের সাথে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত ৯৪২ কোটি টাকার এই চুক্তির আওতায় স্থাপিত রাডারটির সক্ষমতা বিস্ময়কর। এর সর্বোচ্চ কাভারেজ ৪৬৩ কিলোমিটার। এই রাডার শুধু বাংলাদেশের আকাশসীমা নয়, বরং প্রতিবেশী ভারতের বিশাল একটি অংশকে নজরদারির আওতায় নিয়ে এসেছে।

আঞ্চলিক পরিধি: রাডারটির মাধ্যমে ভারতের কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য - আসাম, ত্রিপুরা, গুয়াহাটি, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর এবং অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত নজরদারি সম্ভব। এমনকি মিয়ানমারের একটি বড় অংশের বিমান চলাচলও এই রাডারের পর্দায় ধরা পড়বে।

প্রতিরক্ষায় নতুন শক্তি: এই রাডারের বিশেষত্ব হলো এটি কেবল যাত্রীবাহী বিমান নয়, বরং অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে আসা যুদ্ধবিমান (ফাইটার জেট) বা স্টিলথ প্রযুক্তির উপস্থিতিও শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ও আকাশসীমা রক্ষায় বাংলাদেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছালো।

প্রযুক্তির বিস্ময়: এভিয়েশন হাব হওয়ার পথে বাংলাদেশ। নতুন এই সিস্টেমে শুধুমাত্র রাডার নয়, যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল অটোমেশন ব্যবস্থা। ঢাকা ছাড়াও সিলেট, সৈয়দপুর, বরিশাল ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভেইল্যান্স-ব্রডকাস্ট (এডিএস-বি) এবং কৌশলগত স্থানে মাল্টিল্যাটারেশন সিস্টেম (এমএলএটি) চালু করা হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় তথ্য আদান-প্রদান: এই প্রযুক্তির ফলে বিমানের জিপিএস-ভিত্তিক অবস্থান, গতি, উচ্চতা এবং পরিচয় মুহূর্তের মধ্যেই গ্রাউন্ড স্টেশনে পৌঁছে যাবে। ফলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা অনেক বেশি নির্ভুলভাবে বিমান পরিচালনা করতে পারবেন।

জ্বালানি ও সময়ের সাশ্রয়: আধুনিক এই ব্যবস্থাপনায় বিমানগুলোকে আকাশে বেশিক্ষণ অপেক্ষা (হোল্ডিং) করতে হবে না, ফলে যাত্রীদের সময় বাঁচবে এবং এয়ারলাইন্সগুলোর জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

দুই দেশের বন্ধুত্বের নতুন স্মারক: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, "এই উদ্যোগ দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য নিদর্শন। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় ফ্রান্সের আস্থার প্রতীক"। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী তার বক্তব্যে দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেন যে, এই অত্যাধুনিক সিস্টেম চালুর ফলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অচিরেই একটি গ্লোবাল এভিয়েশন হাবে পরিণত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পটি কেবল একটি রাডার স্থাপন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় স্থাপিত চতুর্থ প্রজন্মের রাডারটি যখন পূর্ণাঙ্গভাবে এই গ্রিডে যুক্ত হবে, তখন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা এবং ব্লু-ইকোনমি জোনের ওপর দিয়ে যাওয়া প্রতিটি যানের গতিবিধি থাকবে হাতের মুঠোয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই অর্জন বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

এমএসএম / এমএসএম

আকাশপথে স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত: শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক রাডারের যাত্রা শুরু

চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন অপরিহার্য

বিদেশে ক্রুড অয়েল টোল ব্লেন্ডিং: জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের কৌশল!

কৃষি কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে

“মরিলেও মরা নহে, যদি লোকে ঘোষে”

অর্ধেক পাগল, অর্ধেক ভালো-মতপার্থক্যের সীমা কোথায়?

​অক্ষয় তৃতীয়া: অবিনশ্বর পুণ্য ও সমৃদ্ধির শাশ্বত আবাহন

হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব

বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা

​পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা

পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি

সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা