ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

হিংসা নয়, মেধা, শ্রম ও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা-ই সফলতা এনে দেয়


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ২৯-৩-২০২৬ দুপুর ১২:২৩

মানুষের জীবনে সাফল্য একটি স্বাভাবিক আকাক্সক্ষা। কেউ সফল হলে আমরা তাকে বাহবা দিতেও জানি, আবার অনেক সময় তার সাফল্য আমাদের মনে জ্বালাও ধরায়। সেই জ্বালার নাম হিংসা। হিংসা এমন একটি মানসিক ব্যাধি, যা অন্যের অর্জনকে ছোট করতে শেখায়, নিজের সক্ষমতাকে নয়। অথচ প্রতিযোগিতা মানুষকে এগিয়ে নেয়, হিংসা মানুষকে পেছনে টানে। সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার এমনকি ব্যক্তিজীবনেও এই দুই মানসিকতার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। যে সমাজে হিংসা প্রবল, সেখানে প্রতিভা দমে যায়; যে সমাজে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে, সেখানে প্রতিভা বিকশিত হয়।

হিংসা মূলত আসে আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে। যখন একজন মানুষ নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনতে পারে না, তখন সে অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ মনে করে। অথচ অন্যের অর্জন আসলে একটি আয়না, যেখানে দেখা যায়, আমিও পারি যদি চেষ্টা করি। কিন্তু হিংসুক মানুষ আয়নায় নিজের মুখ না দেখে আয়নাটাই ভাঙতে চায়। সে গুজব ছড়ায়, কুৎসা রটায়, ষড়যন্ত্র করে, চরিত্র হননের পথ বেছে নেয়। এতে সাময়িক শান্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে সে নিজেই পরাজিত হয়।

ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, যেসব জাতি প্রতিযোগিতাকে গ্রহণ করেছে তারা এগিয়েছে। জাপান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকেও উঠে দাঁড়িয়েছে শৃঙ্খলা, শ্রম ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। দক্ষিণ কোরিয়া একসময় দরিদ্র দেশ ছিল, কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে দক্ষতার প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে, হিংসার রাজনীতি নয়। অন্যদিকে যেসব সমাজে অন্যের উন্নতি সহ্য করা যায় না, সেখানে মেধাপাচার হয়, সৃজনশীলতা নষ্ট হয়, তরুণরা হতাশ হয়ে পড়ে।

ব্যক্তিজীবনের উদাহরণ আরও স্পষ্ট। একই স্কুলে পড়া দুই বন্ধু, একজন নিয়মিত পরিশ্রম করে ভালো ফল করে, অন্যজন তা না করে বন্ধুর সাফল্য নিয়ে কটূক্তি করে। প্রথমজন এগিয়ে যায়, দ্বিতীয়জন ধীরে ধীরে নিজেকে অজুহাতের জালে বন্দি করে ফেলে। বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ চাকরিতে ভালো করলে সহকর্মীর একাংশ তার কাজে সহযোগিতা না করে পেছনে কথা বলে। এতে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়, নিজেরও হয়। অথচ যদি তারা প্রতিযোগিতার মানসিকতা নিত, তবে প্রতিষ্ঠানও লাভবান হতো, ব্যক্তিগত উন্নতিও হতো।

রাজনীতিতেও হিংসা ও প্রতিযোগিতার পার্থক্য স্পষ্ট। সুস্থ গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের সঙ্গে নীতি, কর্মসূচি ও দক্ষতায় প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু যখন সেই প্রতিযোগিতা হিংসায় রূপ নেয়, তখন শুরু হয় প্রতিশোধ, দমন, চরিত্রহনন। ফলাফল, রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ে, জনগণ বঞ্চিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি হতো উন্নয়ন, সততা ও সেবার প্রতিযোগিতা, তবে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত।

হিংসা মানুষকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে। একজন হিংসুক ব্যক্তি কখনো স্বচ্ছ থাকতে পারে না। সে সবসময় তুলনায় বাঁচে, কে কী পেল, কে কোথায় গেল, কে কত এগোল। এই তুলনা তাকে নিজের পথ থেকে সরিয়ে দেয়। প্রতিযোগিতা ঠিক তার উল্টো। প্রতিযোগিতা বলে, আজ আমি যতটা ভালো ছিলাম, কাল তার চেয়ে ভালো হতে হবে। এখানে অন্য মানুষ অনুপ্রেরণা, শত্রু নয়।

ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাতেও হিংসাকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। কারণ হিংসা শুধু অন্যের ক্ষতি চায় না, নিজের আত্মাকেও কলুষিত করে। প্রতিযোগিতা বরং নৈতিক উন্নতির পথ দেখায়। যখন একজন মানুষ অন্যের ভালো কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেও ভালো কাজ করতে চায়, তখন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

শিক্ষাঙ্গনে যদি হিংসা ঢুকে পড়ে, তাহলে তা সবচেয়ে ভয়ংকর হয়। মেধাবী ছাত্রকে হেয় করা, ভালো ফল করা শিক্ষার্থীকে ‘বেশি জানে’ বলে উপহাস করা, এগুলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। অথচ যদি বলা হয়, “সে পেরেছে, আমিও পারব”, তবে একই শ্রেণিকক্ষ থেকেই তৈরি হতে পারে অসংখ্য সফল মানুষ।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিংসা ছড়ানোর নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আজ কাউকে সফল হতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ট্রল, বিদ্রুপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ। খুব কম মানুষই ভাবে, এই সাফল্যের পেছনে কত পরিশ্রম, কত ত্যাগ লুকিয়ে আছে। আমরা ফলাফল দেখি, প্রক্রিয়া দেখি না। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে সমাজ কেবল নেতিবাচকতাই উৎপাদন করবে।

হিংসা মানুষকে ধ্বংস করে নিঃশব্দে। এটি কোনোদিন সরাসরি বলে না, আমি তোমার ক্ষতি করব। বরং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা ও সম্পর্কগুলো শেষ করে দেয়। প্রতিযোগিতা মানুষকে চ্যালেঞ্জ দেয়, শানিত করে, শক্ত করে। প্রতিযোগিতা মানে কাউকে হারানো নয়, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া।

অন্যের অর্জনে আনন্দিত হতে পারা একটি বড় গুণ। এটি দুর্বলতার নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। যে মানুষ নিজের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখে, সে অন্যের সাফল্যে ভয় পায় না। সে জানে, আজ সে এগিয়েছে, কাল আমি এগোবো। এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় সুস্থ সমাজ।

হিংসা ও প্রতিযোগিতার পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয় কর্মক্ষেত্রে। একই অফিসে কাজ করা দু’জন মানুষের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, একজন নিজের কাজকে নিখুঁত করার চেষ্টা করে, অন্যজন খোঁজে কীভাবে সহকর্মীর ভুল ধরা যায়। প্রথমজন ধীরে ধীরে কর্তৃপক্ষের আস্থা অর্জন করে, দক্ষতা বাড়ায়, উন্নতির পথে হাঁটে। দ্বিতীয়জন ব্যস্ত থাকে অভিযোগে, ষড়যন্ত্রে, পেছনে কথা বলায়। শেষ পর্যন্ত সে নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিষ্ঠান কখনোই দীর্ঘদিন হিংসুক মানুষকে বহন করে না; তারা চায় কর্মক্ষমতা, চায় ইতিবাচক প্রতিযোগিতা।

ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে প্রতিযোগিতা ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব। একজন উদ্যোক্তা যদি দেখে অন্য একজন নতুন আইডিয়া নিয়ে সফল হয়েছে, তাহলে তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। এক, সে ওই সফল মানুষকে টেনে নামানোর চেষ্টা করবে, নকল করবে, বদনাম করবে। দুই, সে নিজের পণ্যের মান বাড়াবে, নতুন চিন্তা করবে, নতুন বাজার খুঁজবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দ্বিতীয় পথই টেকসই। বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধ্বংস করার চিন্তা করেনি, বরং প্রতিযোগিতাকে পুঁজি করে নিজের উৎকর্ষ বাড়িয়েছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি দুর্বল, হিংসার সংস্কৃতি প্রবল। কেউ ভালো করলে আমরা প্রশ্ন তুলি, কীভাবে করলো? কার সাহায্য পেলো? নিশ্চয়ই কোনো অসৎ পথ আছে! এই সন্দেহপ্রবণ মানসিকতা সাফল্যকে নয়, ব্যর্থতাকেই স্বাভাবিক করে তোলে। ফলে তরুণরা ভয় পায় বড় স্বপ্ন দেখতে, কারণ তারা জানে, সফল হলে সমাজের একাংশ তাদের শত্রু হয়ে যাবে।
পারিবারিক পর্যায়েও হিংসা ভয়াবহ রূপ নেয়। ভাইয়ের সাফল্যে ভাই খুশি হতে পারে না, আত্মীয়ের উন্নতিতে আত্মীয়ের বুক জ্বলে। উত্তরাধিকার, সম্পত্তি, চাকরি, বিদেশযাত্রা, সবকিছুই হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ পরিবার হওয়া উচিত সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, যেখানে সাফল্য ভাগাভাগি হয়। কিন্তু যখন পরিবারেই প্রতিযোগিতা সুস্থ না হয়ে হিংসায় রূপ নেয়, তখন সম্পর্কগুলো ভেঙে যায় নীরবে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পাঙ্গনও এই হিংসা থেকে মুক্ত নয়। একজন লেখক ভালো লিখলে আরেকজন লেখক তার লেখার মান নয়, তাকে ব্যক্তিত্ব আক্রমণ করে। একজন শিল্পী জনপ্রিয় হলে তাকে নিয়ে চলে কটূক্তি, ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’, ‘অযথা হাইপ’। এতে শিল্পের মান বাড়ে না, বরং শিল্পীসমাজ বিভক্ত হয়। অথচ শিল্পের জগতে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত সৃষ্টিশীলতায়, গভীরতায়, দায়বদ্ধতায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই হিংসাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। আগে মানুষ পেছনে কথা বলত, এখন প্রকাশ্যে আক্রমণ করে। কারো সাফল্যের পোস্ট দেখলেই কেউ না কেউ মন্তব্য করে, ‘ভাগ্য ভালো’, ‘দেখি কতদিন টিকে’। এই বিষাক্ত মন্তব্য আসলে মন্তব্যকারীর নিজের অসন্তুষ্ট জীবনের প্রতিফলন। যে মানুষ নিজের লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত, সে অন্যের অর্জনে সময় নষ্ট করে না।

তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই হিংসার সংস্কৃতিতে। কারণ তারা পথ খুঁজছে, দিশা খুঁজছে। যখন তারা দেখে, পরিশ্রমের চেয়ে তোষামোদ বেশি পুরস্কৃত হয়, দক্ষতার চেয়ে চাতুর্য এগিয়ে দেয়, তখন তারা হতাশ হয়। কেউ কেউ দেশ ছাড়ে, কেউ কেউ স্বপ্ন ছাড়ে। অথচ যদি সমাজ স্পষ্ট বার্তা দিত, এখানে প্রতিযোগিতা আছে, হিংসা নয়, তবে তরুণরা সাহস পেত।

প্রতিযোগিতা মানে অমানবিক চাপ নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত সুযোগ। প্রতিযোগিতা মানে কাউকে দমিয়ে রাখা নয়, বরং সবার জন্য সমান মাঠ তৈরি করা। যখন প্রতিযোগিতা ন্যায্য হয়, তখন মানুষ ফলাফল মেনে নেয়। কিন্তু যখন হিংসা প্রভাব বিস্তার করে, তখন যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়, অযোগ্যতাও টিকে যায়।

একজন মানুষের প্রকৃত উন্নতি তখনই হয়, যখন সে নিজের সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করে। হিংসুক মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে পারে না। সে সব ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপায়, ব্যবস্থা খারাপ, মানুষ খারাপ, সময় খারাপ। প্রতিযোগী মানুষ বলে, আমাকে আরও শিখতে হবে, আরও পরিশ্রম করতে হবে। এই মানসিকতার পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও একই সত্য প্রযোজ্য। যে রাষ্ট্র মেধাকে সম্মান দেয়, সেখানে উন্নয়ন টেকসই হয়। যে রাষ্ট্রে হিংসা ও প্রতিশোধ রাজনীতি চালিকাশক্তি, সেখানে উন্নয়ন ভঙ্গুর হয়। উন্নয়ন তখন কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। কারণ হিংসা কখনো স্থায়িত্ব আনে না।

নৈতিকভাবে দেখলেও হিংসা আত্মঘাতী। এটি মানুষকে ক্রমাগত নেতিবাচক চিন্তায় ডুবিয়ে রাখে। একজন হিংসুক মানুষ কখনোই শান্ত থাকতে পারে না, কারণ অন্যের সাফল্য তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়। প্রতিযোগী মানুষ পরাজিত হলেও শেখে, শক্ত হয়, আবার দাঁড়ায়। হিংসুক মানুষ জয়ী হলেও ভীত থাকে, কেউ আবার তাকে ছাড়িয়ে যাবে না তো?

সফল মানুষের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তারা অন্যের সাফল্যে ভেঙে পড়েনি, বরং অনুপ্রাণিত হয়েছে। তারা ব্যর্থতাকে লজ্জা নয়, শিক্ষা হিসেবে নিয়েছে। তারা জানে, এই পৃথিবীতে জায়গা সীমিত নয়, সীমিত আমাদের সাহস।

শেষ বিচারে প্রশ্নটা খুব সহজ, আমরা কী হতে চাই? হিংসুক দর্শক, না প্রতিযোগী যোদ্ধা? দর্শক অন্যের খেলায় মন্তব্য করে, যোদ্ধা নিজের খেলা তৈরি করে। দর্শক জানে কে জিতলো, যোদ্ধা জানে কীভাবে জিততে হয়।

তাই অন্যের অর্জনে চোখ জ্বালানোর আগে আয়নায় তাকানো জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, আমি কি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি? আমি কি আমার সেরাটা দিয়েছি? যদি উত্তর না হয়, তবে হিংসার কোনো নৈতিক অধিকার আমাদের নেই।

সমাজ বদলাতে হলে মানসিকতা বদলাতে হবে। সন্তানকে শেখাতে হবে, অন্যের ভালো ফল মানে তোমার অপমান নয়। সহকর্মীকে শেখাতে হবে, তোমার উন্নতি আমার সুযোগ কমায় না। রাজনীতিকে শেখাতে হবে, প্রতিপক্ষ শত্রু নয়, প্রতিযোগী।

যেদিন আমরা এই বোধে পৌঁছাবো, সেদিন সাফল্য ব্যক্তিগত থাকবে না, হয়ে উঠবে সমষ্টিগত। সেদিন উন্নয়ন হবে টেকসই, সম্পর্ক হবে মানবিক, রাষ্ট্র হবে শক্তিশালী।

কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, হিংসা মানুষকে ছোট করে, প্রতিযোগিতা মানুষকে বড় করে। আর যারা বড় হতে জানে, সফলতা শেষ পর্যন্ত তাদের কাছেই আসে।

হিংসা কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যখন সমাজের বড় একটি অংশ অন্যের উন্নতিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না, তখন সেই সমাজে উন্নয়ন ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ায়, নিয়ম নয়। সেখানে সাফল্যকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, আর ব্যর্থতাকে দেওয়া হয় অযৌক্তিক সহানুভূতি। এই মানসিকতা জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল করে দেয়। কারণ একটি জাতি তখন আর প্রতিযোগিতায় নামতে সাহস পায় না, তারা শুধু অন্যের পা টেনে ধরতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

শিক্ষাব্যবস্থায় হিংসা ও প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্ব সবচেয়ে সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। আমরা প্রায়ই দেখি, পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীকে কেউ কেউ ‘বইপোকা’ বলে বিদ্রুপ করে। এতে সে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। অন্যদিকে যারা পরিশ্রম করে না, তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এই বিদ্রুপকে অস্ত্র বানায়। যদি শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা হতো দক্ষতা, চিন্তাশক্তি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে, তবে মেধাবী শিক্ষার্থীকে লুকিয়ে থাকতে হতো না।
গ্রাম ও শহরের সামাজিক সম্পর্কেও হিংসার প্রভাব সুস্পষ্ট। গ্রামে কেউ পাকা বাড়ি তুললে কেউ না কেউ বলে, “দেখি কতদিন থাকে।” শহরে কেউ ভালো গাড়ি কিনলে শোনা যায় “নিশ্চয়ই দুর্নীতি আছে।” এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি মানুষকে সৎ পথে সফল হতে নিরুৎসাহিত করে। কারণ তারা জানে, সাফল্যের সাথে সাথে সন্দেহও আসবে। অথচ একটি সুস্থ সমাজে সাফল্য হওয়া উচিত গর্বের বিষয়, অপমানের নয়।

প্রতিযোগিতা মানুষের ভেতরের সেরাটাকে বের করে আনে। খেলাধুলার উদাহরণ নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার। একজন ক্রীড়াবিদ তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘৃণা করে না, বরং সম্মান করে। কারণ সে জানে, শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে তার নিজের দক্ষতা শানিত হবে না। কিন্তু যদি খেলাধুলায় হিংসা ঢুকে পড়ে, তবে খেলা আর খেলা থাকে না, হয়ে যায় সহিংসতা। সমাজেও ঠিক তাই, প্রতিযোগিতা না থাকলে স্থবিরতা আসে, হিংসা থাকলে সংঘাত বাড়ে।

আমাদের সামাজিক সমস্যার একটি বড় কারণ হলো, আমরা সফল মানুষের গল্প শুনতে পছন্দ করি, কিন্তু তাদের পথ অনুসরণ করতে চাই না। আমরা ফলাফলকে ঈর্ষা করি, প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাই। কেউ রাত জেগে পরিশ্রম করে সফল হলে আমরা বলি, ভাগ্য ভালো। অথচ ভাগ্য কেবল প্রস্তুত মানুষের পক্ষেই কথা বলে। এই সত্য স্বীকার করতে না পারাই হিংসার জন্ম দেয়।

সাহসী মানুষ প্রতিযোগিতাকে গ্রহণ করে, দুর্বল মানুষ হিংসাকে বেছে নেয়। কারণ প্রতিযোগিতা মানে নিজেকে উন্মুক্ত করা, ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া। হিংসা মানে আড়ালে থাকা, দায় এড়িয়ে যাওয়া। এই কারণে অনেকেই প্রতিযোগিতার ময়দানে নামতে ভয় পায়। তারা নিরাপদ মনে করে অন্যের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও হিংসা আত্মিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। সব ধর্মেই বলা হয়েছে, অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হও। কারণ মানুষের জীবনে প্রাপ্তি এক নয়, সময় এক নয়, পথও এক নয়। যে ব্যক্তি অন্যের রিজিক বা অর্জন নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে, সে আসলে সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধান্ত নিয়েই অসন্তুষ্ট থাকে। এই অসন্তোষ মানুষকে শান্তি থেকে বঞ্চিত করে।

নারী ও পুরুষের মধ্যকার সামাজিক প্রতিযোগিতাতেও হিংসা বড় বাধা। একজন নারী এগিয়ে গেলে কেউ কেউ বলে, ‘সে সুযোগ বেশি পাচ্ছে’। একজন পুরুষ পিছিয়ে পড়লে বলে, ‘সময় খারাপ’। এই দ্বিমুখী মানসিকতা প্রকৃত প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে দেয়। প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত দক্ষতায়, যোগ্যতায় ও শ্রমে, লিঙ্গ বা পরিচয়ে নয়।

গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যদি সাফল্যের গল্পকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে, তবে সমাজ অনুপ্রাণিত হয়। কিন্তু যদি তারা হিংসা উসকে দেয়, নেতিবাচক তুলনা করে, ব্যক্তিগত আক্রমণকে প্রশ্রয় দেয়, তবে সমাজে বিষ ছড়ায়। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, দায়িত্বহীন গণমাধ্যম হিংসাকে উসকে দেয়।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও এই সত্য প্রযোজ্য। ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা যদি হয় জনসেবায় শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে, তবে রাজনীতি হয়ে ওঠে কল্যাণমুখী। কিন্তু যখন সেই প্রতিযোগিতা হিংসায় রূপ নেয়, তখন রাজনীতি হয়ে যায় প্রতিশোধের হাতিয়ার। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়, প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়।

প্রতিযোগিতা মানুষকে সময়ের মূল্য শেখায়। হিংসা মানুষকে সময় নষ্ট করতে শেখায়। একজন প্রতিযোগী মানুষ সময় ব্যয় করে শেখায়, অনুশীলনে, উন্নয়নে। একজন হিংসুক মানুষ সময় ব্যয় করে গুজবে, সমালোচনায়, ষড়যন্ত্রে। দিনের শেষে কে এগিয়ে থাকবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

মানুষ যখন নিজের লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে পারে, তখন হিংসার জায়গা থাকে না। হিংসা তখনই জন্ম নেয়, যখন লক্ষ্য অস্পষ্ট, আত্মবিশ্বাস দুর্বল। তাই পরিবার, শিক্ষা ও সমাজের উচিত মানুষকে লক্ষ্যনির্ধারণে সহায়তা করা। লক্ষ্য থাকলে মানুষ পথ খুঁজে নেয়।

একটি সুস্থ সমাজে প্রতিযোগিতা কখনো মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না, বরং যুক্ত করে। কারণ সবাই জানে, আজ তুমি এগোচ্ছো, কাল আমি। এই বিশ্বাস থেকেই পারস্পরিক সম্মান তৈরি হয়। কিন্তু হিংসা বিশ্বাস ভেঙে দেয়, সম্পর্ক নষ্ট করে, সমাজকে খণ্ডিত করে।

যে মানুষ অন্যের অর্জনে হাততালি দিতে পারে, সে মানুষ নিজেও একদিন হাততালির যোগ্য হয়। কারণ সে জানে, সাফল্য শূন্য-সমষ্টির খেলা নয়। কারো জয়ে আমার হার নিশ্চিত নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই মানুষকে বড় করে।

শেষ পর্যন্ত জীবন একটি দীর্ঘ দৌড়। এখানে কেউ শুরুতে এগিয়ে থাকে, কেউ শেষে। কেউ দ্রুত দৌড়ায়, কেউ ধীরে কিন্তু স্থির। অন্যের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলে চলবে না। নিজের গতি খুঁজে নিতে হবে। প্রতিযোগিতা মানে নিজের গতিকে উন্নত করা, হিংসা মানে অন্যের গতি থামাতে চাওয়া।

এই দুই পথের ফল একেবারেই ভিন্ন। এক পথ উন্নতির, অন্য পথ পতনের। ইতিহাস, সমাজ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সবকিছুই এই সত্যকে সমর্থন করে।

অতএব সিদ্ধান্ত আমাদেরই, আমরা হিংসার অন্ধকারে থাকব, নাকি প্রতিযোগিতার আলোয় এগোবো। যারা আলো বেছে নেয়, সফলতা শেষ পর্যন্ত তাদেরই সঙ্গী হয়।

তরুণ সমাজ একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এই শক্তিই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হয় হিংসা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতিতে। একজন তরুণ যখন দেখে, পরিশ্রমী ও মেধাবী মানুষের চেয়ে তোষামোদকারী কিংবা চাতুর্যপূর্ণ মানুষ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তার বিশ্বাসে ফাটল ধরে। সে ভাবে, “পরিশ্রম করে লাভ কী?” এই প্রশ্নের জন্মই হিংসার বীজ বপন করে। কারণ তখন সে অন্যের সাফল্যকে ন্যায্য অর্জন হিসেবে নয়, নিজের প্রতি অবিচার হিসেবে দেখতে শুরু করে।

তরুণদের বড় একটি অংশ আজ তুলনার জালে আটকে আছে। কে কোথায় চাকরি পেল, কে বিদেশে গেল, কে কত দ্রুত সফল হলো, এই তুলনা তাদের নিজস্ব পথচলা ব্যাহত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই তুলনাকে আরও তীব্র করেছে। একজন তরুণ নিজের সংগ্রামের দিনগুলো আড়াল করে অন্যের ঝলমলে সাফল্য দেখে হীনমন্যতায় ভোগে। এখান থেকেই জন্ম নেয় হিংসা, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতা। অথচ প্রতিযোগিতা শেখায়, আজ সে এগিয়েছে, কাল আমিও এগোবো, নিজের মতো করে।

যুব সমাজ যদি প্রতিযোগিতাকে গ্রহণ করে, তবে তারা প্রশ্ন করবে, সে কি শিখেছে? কিভাবে পরিশ্রম করেছে? কিভাবে ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠেছে? কিন্তু হিংসা তাদের শেখায়, সে কেন এগিয়ে গেল? তাকে থামানো যায় কিভাবে? এই মানসিকতা তরুণদের সৃজনশীলতা ধ্বংস করে দেয়। কারণ সৃজনশীলতা জন্ম নেয় স্বাধীন চিন্তা থেকে, আর হিংসা জন্ম নেয় সংকীর্ণতা থেকে।
বিশ্বের সফল তরুণ নেতৃত্বের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, তারা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি। তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছে, শিখেছে, নিজেকে গড়ে তুলেছে। তারা অন্যের অর্জনকে পথনির্দেশনা হিসেবে নিয়েছে, বাধা হিসেবে নয়। যে তরুণ অন্যের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হতে পারে, সে কখনো পথ হারায় না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণ সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সঠিক আদর্শের অভাব। যখন তারা দেখে সমাজে হিংসুক মানুষ বেশি আলোচনায় আসে, তখন তারা বিভ্রান্ত হয়। এখানেই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তরুণদের শেখাতে হবে, প্রতিযোগিতা মানে অন্যকে হারানো নয়, নিজেকে তৈরি করা।

এখন সাংবাদিকতার প্রসঙ্গে আসা জরুরি। সাংবাদিকতা একটি পেশা নয়, একটি দায়িত্ব। কিন্তু এই পেশাটিও আজ হিংসা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার শিকার। একজন সাংবাদিক ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করলে আরেকজন সাংবাদিক তার প্রতিবেদনের মান নিয়ে আলোচনা না করে ব্যক্তিগত আক্রমণে নেমে পড়ে। কে কার আগে ব্রেকিং দিল, কে বেশি পরিচিত হলো, এই প্রতিযোগিতা যখন হিংসায় রূপ নেয়, তখন সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।

সুস্থ সাংবাদিকতা মানে তথ্যের প্রতিযোগিতা, সত্যের প্রতিযোগিতা, জনস্বার্থে কাজ করার প্রতিযোগিতা। কিন্তু যখন এই প্রতিযোগিতা হয়ে যায় পদ-পদবি, ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, তখন হিংসা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এতে শুধু সাংবাদিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।

একজন সাংবাদিকের সাফল্য অন্য সাংবাদিকের জন্য হুমকি হওয়া উচিত নয়। বরং তা হওয়া উচিত অনুপ্রেরণা। কারণ একজন সাংবাদিকের সাহসী রিপোর্টিং যদি সমাজে পরিবর্তন আনে, তবে তা পুরো পেশার সম্মান বাড়ায়। কিন্তু হিংসা সেই সম্মানকে ভেঙে দেয়। তখন সাংবাদিকতা আর জনস্বার্থের পক্ষে থাকে না, দাঁড়িয়ে যায় ব্যক্তি স্বার্থের পক্ষে।

তরুণ সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি এই সমস্যার শিকার। তারা যখন নতুন উদ্যম নিয়ে মাঠে নামে, তখন কেউ কেউ তাদের পা টেনে ধরতে চায়। বলা হয়“বেশি এগোতে যেও না”, “সবকিছু বলা যায় না”, “সময় বুঝে চল।” এই ভয় দেখানোর সংস্কৃতি আসলে হিংসারই একটি রূপ। কারণ কেউ চায় না নতুন কেউ আলোয় আসুক।

অথচ ইতিহাস বলে যে সাংবাদিকতা তরুণদের পথ আটকে দেয়, সে সাংবাদিকতা টেকে না। প্রতিযোগিতামূলক ও সাহসী সাংবাদিকতাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। এখানে প্রতিযোগিতা হবে কে বেশি সত্য তুলে ধরতে পারে, কে বেশি দায়িত্বশীল হতে পারে। এখানে হিংসার কোনো জায়গা নেই।

গণমাধ্যম যদি তরুণ সমাজকে সঠিক বার্তা দেয়, যে সাফল্য অর্জনযোগ্য, নৈতিক এবং সম্মানের, তবে তরুণরা হিংসার পথে যাবে না। কিন্তু যদি গণমাধ্যম নিজেই হিংসা, বিভাজন ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে, তবে তরুণদের কাছে ভুল শিক্ষা পৌঁছায়।

তরুণ সমাজ ও সাংবাদিকতা, এই দুই শক্তি একসাথে কাজ করলে সমাজ বদলাতে পারে। কিন্তু শর্ত একটাই, হিংসা নয়, প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা হবে জ্ঞান, সততা ও সাহসে। প্রতিযোগিতা হবে কে বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।

আজকের তরুণ যদি শিখে নেয়, অন্যের সাফল্যে হাততালি দেওয়া নিজের পরাজয় নয়, তবে আগামী দিনের সমাজ হবে আলোকিত। আর যদি সাংবাদিকতা শিখে নেয়, অন্য সাংবাদিকের সাহসী কাজ নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি নয়, তবে গণমাধ্যম আবার মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত সত্য একটাই, যে সমাজ তরুণদের হিংসা শেখায়, সে সমাজ নিজেই হারিয়ে যায়। আর যে সমাজ তরুণদের প্রতিযোগিতা শেখায়, সে সমাজই ভবিষ্যৎ গড়ে। হিংসা কখনো কাউকে বড় করেনি, প্রতিযোগিতা করেছে। হিংসা মানুষকে অন্ধ করে, প্রতিযোগিতা চোখ খুলে দেয়। যারা জীবনে সত্যিকার সফল হতে চায়, তাদের উচিত অন্যের অর্জনকে শত্রু না ভাবা, বরং প্রেরণা হিসেবে নেওয়া। কারণ সূর্য একা উঠলেও আলো সবার জন্য। আকাশে জায়গার অভাব নেই, শুধু উড়বার সাহস দরকার।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি বিশ্ব দরবারে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা সফল হয়েছেন তারা পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পাননি, বরং কম সুযোগ পেয়েছেন বা প্রতিকূল পরিবেশ পেয়েছেন এমন ব্যক্তিরাই নিজ নিজ কর্মগুনে সফলতা অর্জন করেছেন। যেমন, ’আব্রাহাম লিংকন’ একজন সফল রাজনীতিবিদ। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া লিংকন স্বশিক্ষিত ছিলেন। জীবনে বহুবার নির্বাচনে হেরে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন এবং দাসপ্রথা বিলোপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিখ্যাত লেখক ও নাট্যকার ’উইলিয়াম শেকসপিয়ার’ একসময় থিয়েটার গ্রুপের সাথে নাটকে অভিনয়ের কাজ করতেন, পরে নাটক লেখার কাজ করেছেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, বিখ্যাত নাট্যকার ও ইংল্যান্ডের রাজা হয়েছিলেন, যাকে ইংল্যান্ডের রাজাদের রাজা বলা হতো। ’নেলসন ম্যান্ডেলা’ একজন রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার নেতা। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য ২৭ বছর কারাবন্দি ছিলেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে বিশ্বে শান্তি ও মানবতার প্রতীক হন।
’টমাস এডিসন’ বা ’টমাস আলভা এডিসন’ একজন বিজ্ঞানী ও মার্কিন উদ্ভাবক। ছোটবেলায় স্কুল থেকে বাদ পড়েছিলেন। হাজারবার ব্যর্থ হয়ে তিনি গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক বাতি সহ বহু যন্ত্র তৈরি করেছিলেন যা বিংশ শতাব্দীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
বিজ্ঞানী ’আলবার্ট আইনস্টাইন’ শৈশবে কথা বলতে দেরি হওয়ায় অনেকে তাকে দুর্বল ছাত্র ভাবত। পরে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়ে বিশ্ববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটান।
টিভি উপস্থাপক ও ব্যবসায়ী ’অপরাহ উইনফ্রে’ দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
একজন সফল উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি ব্যবসায়ী ’জ্যাক মা’ বহুবার চাকরিতে প্রত্যাখ্যাত হন। পরে আলীবাবা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও সফল উদ্যোক্তা হন।
বিখ্যাত লেখক ’জে কে রাউলিং’ বেকারত্ব ও হতাশার সময় সন্তান লালন-পালন করতে করতে লেখালেখি শুরু করেন। পরে ’হ্যারি পটার’ চলচিত্র সিরিজের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত লেখক হন। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা ’ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো’ কঠোর অনুশীলন ও আত্মবিশ্বাসে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়েছেন। মানবাধিকার কর্মী ’মালালা ইউসুফজাই’ নারী শিক্ষার দাবিতে জীবনসংকটের মুখোমুখি হন। পরে সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞনী ’স্টিফেন হকিং’ মারাত্মক শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও মহাবিশ্ব নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করে বিশ্বখ্যাত হন।
শুধু বিদেশের মাটিতেই নয়, প্রতিকূল পরিবেশ, দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা বা সংগ্রাম সত্ত্বেও শ্রম, অধ্যবসায় ও মেধার মাধ্যমে অসংখ্য ব্যক্তি সফল হয়েছেন। যেমন, বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও সংগীতজ্ঞ ’কাজী নজরুল ইসলাম’ দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও কঠোর সংগ্রাম করে বিদ্রোহী কবি হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। জীবিকার তাগিদে তিনি মসজিদে মুয়াজ্জিন ও রুটির দোকানে কাজ করেছেন। তবু তাঁর মেধা ও শ্রম তাকে বিখ্যাত কবির উপাধি এনে দিয়েছে।
কবি ও লেখক জসীমউদ্দীন গ্রামীণ দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্য থেকে উঠে এসে “পল্লীকবি” হিসেবে পরিচিত হন। বাংলার গ্রামীণ জীবনকে বিশ্বসাহিত্যে তুলে ধরেন।
সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে  ওঠা ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ অধ্যবসায় ও সৃজনশীলতায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখকে পরিণত হন।
সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোছাইন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন। নারীর অধিকার ও সমাজবাস্তবতা নিয়ে শক্তিশালী লেখনীর জন্য খ্যাতি পান।
 দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভিসংবদিত নেতা হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। পরে তাঁর কণ্যা শেখ হাসিনাও দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
দেশের অজপাড়া গাঁয়ে জন্ম নিয়েও বাংলাদেশের সেনা প্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সততা ও দায়িত্বশীলতা তাকে দুর্নীতি ও অর্থের মোহ থেকে দূরে রেখেছে। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন ফলে তাঁর পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য একেবারেই না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীতে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে তাঁর সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী।
দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ ধারণা চালু করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তা অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস। এই কাজের জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন
ছোট গড়ন ও নানা সমালোচনা সত্ত্বেও কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে সফলতার জায়গা করে নিয়েছে আর্জেটিনার ফুটবলার লিওনেল মেসি ও বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম।
চাইলে এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। আর এসব উদাহরণ এটাই প্রমাণ করে যে, প্রতিকূলতা মানুষকে থামাতে পারে না’ শ্রম, ধৈর্য, লক্ষ্য ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সাফল্য অর্জন সম্ভব। তবে এরজন্য হিংসা ত্যাগ করা জরুরী। কারণ সত্য একটাই, হিংসা মানুষকে অমানুষ বানায়, আর অমানুষে ভরা সমাজ ধ্বংসের দিকেই ধাবিত হয়। যে সমাজ মানবিকতা বাঁচাতে চায়, তাকে আগে হিংসার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে আর নিজের সফলতার জন্য নিজেকেই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। নিজের সফলতা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে ভালো কাজে প্রতিযোগীতা করতে হবে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

এমএসএম / এমএসএম

”আলোর খোঁজে” আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে

হিংসা নয়, মেধা, শ্রম ও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা-ই সফলতা এনে দেয়

ডা. জুবাইদা রহমানের সফট পাওয়ার কূটনীতির উত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত!

ঈদ জামাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন-মিসাইল সতর্কতা; মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিস্ময়!

প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ: দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টান্ত, সুশাসনে জোর!

নীরব কৌশলের রাজনীতি: রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা

ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

লাইলাতুল কদরের ইবাদত: বান্দার গুনাহ মাফের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ অপরিহার্য!

আল-কুরআন বিজ্ঞান ও রমজান

ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক

ঈদের প্রহর গুনছে দেশ, পে-স্কেলহীন বাস্তবতায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের আনন্দ কতটুকু?

গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ

হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা: ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকিতে, বাংলাদেশের সামনে নতুন সতর্কবার্তা