”আলোর খোঁজে” আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে
মানবজীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান হলো আলো, আর সেই আলো শুধু দৃশ্যমান আলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জ্ঞান, ন্যায়, সত্য, মানবতা ও মুক্তির প্রতীক। অন্যদিকে অন্ধকার মানে অজ্ঞানতা, অন্যায়, হতাশা, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বই মানবজীবনের মূল সুর, যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে আলোর সন্ধান করে।
মানুষ জন্মগতভাবে আলোপিয়াসী। একটি শিশুর জন্মের পর প্রথম যে কাজটি সে করে তা হলো চোখ মেলে চারপাশ দেখার চেষ্টা, এ যেন অজানা পৃথিবীর আলোকে ছুঁয়ে দেখার এক প্রাথমিক প্রচেষ্টা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আলোর খোঁজ শুধু চোখের দেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জ্ঞানের আলো, বিবেকের আলো, ন্যায়ের আলো হয়ে ওঠে। মানুষ তখন বুঝতে শেখে, প্রকৃত আলো বাইরের আলো নয়, বরং ভেতরের আলোকিত হওয়া।
তবুও বাস্তবতা হলো, এই আলোর পথে যাত্রা কখনোই সহজ নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপে মানুষ অন্ধকারের সম্মুখীন হয়। দারিদ্র্য, বৈষম্য, অবিচার, দুর্নীতি, প্রতারণা’ এসবই একেকটি ঘন অন্ধকার, যা মানুষের পথকে জটিল করে তোলে। একজন শিক্ষার্থী যখন অর্থাভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না, একজন কৃষক যখন ন্যায্য দাম পায় না, একজন শ্রমিক যখন তার ঘামের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়’ এসবই অন্ধকারের বাস্তব রূপ। কিন্তু তবুও মানুষ থেমে থাকে না; সে খুঁজে ফেরে আলোর পথ।
এই অনুসন্ধানের পেছনে রয়েছে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই মানুষ তার সেরা অর্জনগুলো করেছে। অন্ধকার যত গভীর হয়েছে, আলোর তৃষ্ণা তত বেড়েছে। এই তৃষ্ণাই মানুষকে নতুন পথ দেখিয়েছে, নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তাই বলা যায়, অন্ধকারই অনেক সময় আলোর জন্ম দেয়।
সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আজকের পৃথিবীও যেন এক অদ্ভুত দ্বৈততায় আবদ্ধ। একদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি, উন্নয়ন, বৈশ্বিক যোগাযোগ, সবকিছুই আমাদের সামনে আলোর সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্যদিকে যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদেরকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষ যেন এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, এক অনিশ্চিত যাত্রার পথিক।
এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। কারণ অনেক সময় মানুষ অন্ধকারে ঘুরতে ঘুরতে সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে হয়, যখন দুর্নীতি সমাজের অংশ হয়ে যায়, যখন মিথ্যাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন সেই অন্ধকার আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তখন আলোর খোঁজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে আশার কথা হলো, মানবসভ্যতার ইতিহাসে কখনোই আলো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কিছু মানুষ সবসময়ই আলোর পথ দেখিয়েছে। তারা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, মানবতার পক্ষে কথা বলেছে। এই মানুষগুলোই সমাজের আলোকবর্তিকা, যারা অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখায়।
ব্যক্তিগত জীবনেও এই সত্য প্রযোজ্য। প্রত্যেক মানুষই তার জীবনের কোনো না কোনো সময়ে হতাশা, ব্যর্থতা ও দুঃখের অন্ধকারে ডুবে যায়। কিন্তু এই সময়গুলোই মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে। এই অন্ধকারই তাকে শেখায় কীভাবে আলোকে মূল্য দিতে হয়। যে মানুষ কখনো অন্ধকার দেখেনি, সে কখনো আলোর প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে পারে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে, আলো খুঁজতে হলে কী করতে হবে? এর উত্তর সহজ নয়, কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে। প্রথমত, নিজেকে জানার চেষ্টা করতে হবে। নিজের ভেতরের শক্তি, দুর্বলতা, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্ঞান অর্জনের প্রতি আগ্রহী হতে হবে। কারণ জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে বড় আলো। তৃতীয়ত, নৈতিকতা ও মানবিকতা বজায় রাখতে হবে। কারণ এগুলো ছাড়া কোনো আলোই স্থায়ী হয় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধৈর্য। আলোর পথ কখনোই সরল নয়; এটি দীর্ঘ ও কঠিন। অনেক সময় মনে হতে পারে, সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে, সামনে কোনো পথ নেই। কিন্তু ঠিক এই সময়েই ধৈর্য ধরে থাকতে হয়। কারণ অন্ধকারের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তেই আলো জন্ম নিতে শুরু করে।
বর্তমান সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, মানুষ দ্রুত সাফল্য পেতে চায়। তারা শর্টকাট খোঁজে, সহজ পথ খোঁজে। কিন্তু এই সহজ পথ অনেক সময় অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃত আলো পেতে হলে পরিশ্রম, সততা ও সময়ের প্রয়োজন হয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
“আলোর খোঁজে আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে”এই লাইনটি তাই শুধু একটি প্রবন্ধ বা কবিতার ভাবনা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই এই যাত্রার অংশ। কেউ হয়তো একটু এগিয়ে, কেউ হয়তো একটু পিছিয়ে, কিন্তু সবাই একই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছি।
এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আশা। আশা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। যখন সবকিছু অন্ধকার মনে হয়, তখনও আশা আমাদের বলে’ একদিন আলো আসবেই। এই আশাই মানুষকে নতুন করে শুরু করতে শেখায়।
শেষ পর্যন্ত বলতে পারি, অন্ধকার কোনো স্থায়ী অবস্থা নয়। এটি একটি পর্যায়, যা পেরিয়ে যেতে হয়। আর আলো কোনো দূরবর্তী স্বপ্ন নয়; এটি আমাদের ভেতরেই আছে। শুধু সেটিকে খুঁজে বের করতে হবে, জাগিয়ে তুলতে হবে। যখন মানুষ তার ভেতরের আলোকে জাগিয়ে তোলে, তখন বাইরের অন্ধকার আর তাকে আটকাতে পারে না।
তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো, শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও আলোর পথ খুঁজে বের করা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সত্যের পক্ষে কথা বলা, মানবতার পক্ষে কাজ করা, এসবই আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ। আমরা যদি প্রত্যেকে আমাদের জায়গা থেকে একটু করে আলো ছড়াতে পারি, তাহলে এই পৃথিবীর অন্ধকার অনেকটাই কমে যাবে।
অতএব, এই জীবনযাত্রা থামার নয়। অন্ধকার থাকবে, বাধা থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, তবুও আমাদের চলতে হবে। কারণ এই চলার মধ্যেই রয়েছে জীবনের অর্থ। আর একদিন, এই নিরন্তর খোঁজের পথেই আমরা খুঁজে পাবো সেই কাক্সিক্ষত আলো, যা আমাদের জীবনের সব অন্ধকার দূর করে দেবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কবি, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
”আলোর খোঁজে” আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে
হিংসা নয়, মেধা, শ্রম ও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা-ই সফলতা এনে দেয়
ডা. জুবাইদা রহমানের সফট পাওয়ার কূটনীতির উত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত!
ঈদ জামাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন-মিসাইল সতর্কতা; মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিস্ময়!
প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ: দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টান্ত, সুশাসনে জোর!
নীরব কৌশলের রাজনীতি: রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
লাইলাতুল কদরের ইবাদত: বান্দার গুনাহ মাফের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ অপরিহার্য!
আল-কুরআন বিজ্ঞান ও রমজান
ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক
ঈদের প্রহর গুনছে দেশ, পে-স্কেলহীন বাস্তবতায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের আনন্দ কতটুকু?
গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ