তেলের যুদ্ধ: জিসিসির ক্ষয়, আমেরিকা-রাশিয়া-ইরানের জয়!
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ আর শুধু সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি শক্তির পুনর্বিন্যাসের এক তীব্র লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে তেল, গ্যাস, সরবরাহপথ এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বে তেল আর কেবল একটি পণ্য নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটিতে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে। এর ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, আর এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী আরও গভীর ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রভাবের মুখে পড়েছে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) এর সদস্য দেশগুলো-সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান এবং বাহরাইন। সম্মিলিতভাবে এই দেশগুলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদিত হয় এবং তার একটি বড় অংশই রপ্তানিনির্ভর। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতা, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ও সামুদ্রিক রুট ঘিরে অনিশ্চয়তা, এই জ্বালানি প্রবাহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ফলে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ তৈরি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ নিরাপত্তা এবং মূল্য স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এর অর্থ দাঁড়ায়, যদি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে প্রতিদিন আনুমানিক ১ থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে জিসিসি দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি করবে, যা প্রায় ১.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
শুধু তেল খাত নয়, জিসিসি অর্থনীতির অন্যান্য খাতও মারাত্মক চাপে রয়েছে। খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিমান চলাচল, পর্যটন এবং লজিস্টিক খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। শেয়ারবাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব না পড়ে বরং পতন দেখা গেছে, যা একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিতে একটি বড় কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ তেল ও এলএনজি রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলেও তাদের ওপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়াতে শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করছে।
রাশিয়াও এই পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের তেল রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, সরবরাহ সংকটের সময়ে ক্রেতারা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে প্রাপ্যতা ও সরবরাহ নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে রাশিয়া তুলনামূলকভাবে কম ছাড়ে বিক্রি না করেও বড় অঙ্কের রাজস্ব অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে।
ইরানের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরাসরি বড় রপ্তানিকারক না হলেও হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হওয়ায় এর স্থিতিশীলতা বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে আরও সচল ও কার্যকর রাখতে অবদান রাখে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় ইরান এখন তাদের তেল ও গ্যাস বৈশ্বিক বাজারে তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতেও সহায়তা করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতা। যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া ও ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করা হয়েছে, যাতে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা যায় এবং অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
এর ফলে রাশিয়া ও ইরান উভয়ই তাদের বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সুবিধা পাচ্ছে। রাশিয়া তুলনামূলক উচ্চ দামে রপ্তানি করে রাজস্ব বৃদ্ধি করছে, আর ইরান সরবরাহ প্রবাহে তাদের কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব বজায় রাখছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন সময়ে তা ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দামে আরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পরিবহন ব্যয়, খাদ্যপণ্য এবং শিল্প উৎপাদন খরচে প্রতিফলিত হচ্ছে। জ্বালানিনির্ভর খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আর এই সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জিসিসি দেশগুলো উৎপাদনকারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে সরবরাহ ও বাজারের অস্থিরতায় চাপের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। রাশিয়া উচ্চ দামের বাজার থেকে বাড়তি রাজস্ব অর্জন করছে, আর ইরান তাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় রাখছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও স্পষ্ট। বাংলাদেশসহ এসব দেশের ক্ষেত্রে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ বেড়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, পণ্যদাম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তবে লক্ষণীয় বিষয় ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জ্বালানিকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতায় কেবল উৎপাদন ক্ষমতা নয়, বরং সরবরাহ অবকাঠামো, বাণিজ্য পথ এবং কৌশলগত অবস্থানই এখন নির্ধারক ভূমিকা পালন করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো স্থাপনাগুলো, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় উৎপাদনকারী দেশগুলো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে বাজার ও সরবরাহে ওঠানামার চাপ অনুভব করছে, অন্যদিকে বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ব্যবহার করে পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নিচ্ছে। রাশিয়া উচ্চমূল্যের পরিবেশে রপ্তানি আয় বাড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে, আর ইরান সরবরাহ প্রবাহ ও আঞ্চলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ভারসাম্য গড়ে উঠছে, যেখানে ক্ষমতার ভিত্তি আর কেবল সম্পদের মালিকানায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং সেই সম্পদ কীভাবে, কোথা দিয়ে এবং কতটা নিয়ন্ত্রিতভাবে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়, সেটিই এখন মূল নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও তেল-গ্যাস বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
তেলের যুদ্ধ: জিসিসির ক্ষয়, আমেরিকা-রাশিয়া-ইরানের জয়!
সড়ক দখলমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন
”আলোর খোঁজে” আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে
হিংসা নয়, মেধা, শ্রম ও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা-ই সফলতা এনে দেয়
ডা. জুবাইদা রহমানের সফট পাওয়ার কূটনীতির উত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত!
ঈদ জামাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন-মিসাইল সতর্কতা; মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিস্ময়!
প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ: দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টান্ত, সুশাসনে জোর!
নীরব কৌশলের রাজনীতি: রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
লাইলাতুল কদরের ইবাদত: বান্দার গুনাহ মাফের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ অপরিহার্য!
আল-কুরআন বিজ্ঞান ও রমজান
ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক