ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

নিম্নমানের জ্বালানিতে বিলিয়ন ডলার ক্ষতি: আমরা কি তা উপেক্ষা করছি?


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ৬-৪-২০২৬ দুপুর ১২:৩৭

বাংলাদেশ আজ এমন এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মুখোমুখি, যা সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও প্রতিদিন ধীরে ধীরে অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে ক্ষয় করছে। এটি জ্বালানির ঘাটতির সমস্যা নয়; বরং জ্বালানির মান নিয়ে একটি কাঠামোগত সংকট। নিম্নমানের জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার শুধু ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং বায়ুদূষণ তীব্র করছে এবং সামগ্রিক জীবনমানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্ব যখন Euro-V ও Euro-VI মানের আল্ট্রা-লো সালফার জ্বালানির দিকে অগ্রসর হয়েছে, তখন বাংলাদেশ এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ সালফারযুক্ত জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। উন্নত দেশগুলোতে জ্বালানিতে সালফারের মাত্রা সাধারণত ১০ পিপিএম-এর মধ্যে সীমিত রাখা হয়, অথচ বাংলাদেশে এই মাত্রা প্রায় ২০০০–৩০০০ পিপিএম পর্যন্ত হতে দেখা যায়। এই ব্যবধান কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এর প্রভাব পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী।

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বায়ুদূষণ ও অদক্ষ জ্বালানি ব্যবহারের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশে বছরে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, যানবাহনের অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি ব্যবহারের অদক্ষতা মিলিয়ে এই ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১০-১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

বায়ুদূষণ এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, বায়ুদূষণের কারণে দেশে বছরে প্রায় ৮০,০০০ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে PM2.5 মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমার তুলনায় বহুগুণ বেশি। এর ফলে শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ, হৃদরোগসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

একই সঙ্গে দূষণ উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দূষিত পরিবেশে শ্রমক্ষমতা কমে যায়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যকারিতা হ্রাস পায়, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পরিষ্কার জ্বালানির ব্যবহারকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে উন্নত মানের জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বায়ুর মান উন্নত করেছে, ইঞ্জিন দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে এবং স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়েছে।

বাংলাদেশে এই রূপান্তর এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, যার একটি বড় কারণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। বিদ্যমান রিফাইনারিগুলোর সীমিত সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক মানের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) Unit-2 প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জ্বালানির মান উন্নয়ন এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।

তবে সময়ক্ষেপণ এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি বিলম্ব কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে না, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতিও বাড়াচ্ছে। ধারাবাহিক বিলম্বের ফলে ভবিষ্যতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের জন্য বিষয়টি এখন আর বিকল্প নয়, বরং একটি জরুরি অগ্রাধিকার। Euro-V ও Euro-VI মানের জ্বালানি দ্রুত চালু করা, রিফাইনারি আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং জ্বালানির মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ উন্নয়নের যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে জ্বালানির মান উন্নয়ন একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ পরিষ্কার জ্বালানি কেবল পরিবেশ রক্ষা করে না, এটি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটায়।

বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমিত নেই; এটি ধীরে ধীরে একটি অর্থনৈতিক চাপ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং মানবিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি সরল—প্রতি বছর কি আমরা এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেব, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে এগোব?

বিলম্বের প্রতিটি বছর শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনমানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব সময়ের সঙ্গে জমা হয়ে জাতীয় সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দেয়।

এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও তেল-গ্যাস বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান

বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ