ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

মেহেরপুরে স্বাস্থ্যখাতে ‘হযবরল’ পরিস্থিতি

অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার সংকটে উদ্বেগ বাড়ছে


মেহেরপুর প্রতিনিধি photo মেহেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২৩-৪-২০২৬ দুপুর ৪:১৫

মেহেরপুরের স্বাস্থ্যখাত দিন দিন যেন এক অগোছালো ‘হযবরল’ চিত্রে পরিণত হচ্ছে। চিকিৎসাজনিত মৃত্যু, তদন্তের অনিশ্চয়তা, লাইসেন্স জটিলতা, জনবল সংকট এবং নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি সেবার বিস্তার সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনা এ সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে।

২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শহরের মেহেরপুর ক্লিনিকে জরায়ুর টিউমার অপারেশনের সময় নাসিমা খাতুন (৬০) মারা যান। অভিযোগ রয়েছে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমান ও তার ছেলে এনেস্থেসিস্ট ডা. অভি অপারেশনের সময় ইনজেকশন প্রয়োগের পরপরই রোগীর মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনার জেরে ক্ষুব্ধ স্বজনরা ক্লিনিকে হামলা, ভাঙচুর ও চিকিৎসকদের মারধর করেন।

এর আগেও একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল গাংনীর তাহের ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের পর সাইফুন্নেসা (২৫) মারা যান। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক ছাড়াই চিকিৎসা চলছিল। ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর শহরের ডা. রমেশ ক্লিনিকে এপেন্ডিকস অপারেশনের সময় একই ক্লিনিকের সিনিয়র নার্স স্বর্ণালী খাতুন মারা যান। ওই ঘটনায় এনেস্থেসিয়া প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এনেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেদি হাসান দাবি করেন, তিনি নন, ‘হাবিব’ নামে এক ব্যক্তি ইনজেকশন দেন। এ সংক্রান্ত ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

একই বছরের জুলাইয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলায় দারুস সালাম ক্লিনিকের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুস সালাম কারাগারে যান। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিলও চিকিৎসাজনিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

এত ঘটনার পরও তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত প্রভাবিত হয়, আবার কোথাও অর্থের বিনিময়ে স্বজনদের সাথে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে মৃত্যুর দায় নির্ধারণ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।

জেলার স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে কার্যত একজন এনেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করছে সমগ্র জেলার অপারেশন কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি কর্মস্থলে হাজিরা দিয়ে পাশের জেলায় ব্যক্তিগত ক্লিনিকে বেশি সময় দিচ্ছেন। পাশাপাশি ডা. অভি ও ডা. জহুরুল ইসলাম পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে এসে এনেস্থেসিয়া সেবা দিচ্ছেন। এছাড়া বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে অস্ত্রোপচারের পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যেই চিকিৎসকরা চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা অপারেশন পূর্ব ও পরবর্তী চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

মেহেরপুর সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, জেলায় ৩৮টি বেসরকারি ক্লিনিকের মধ্যে ৩৭টির লাইসেন্স রয়েছে, একটি আবেদনাধীন। সদর উপজেলায় ১৯টি, গাংনীতে ১৪টি এবং মুজিবনগরে ৫টি ক্লিনিক রয়েছে। তবে অনেক লাইসেন্স হালনাগাদ নয়। আর জেলায় ৭১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ৬৯টির লাইসেন্স রয়েছে, দুটি লাইসেন্সবিহীন। এগুলোর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৬টি, গাংনীতে ২৫টি ও মুজিবনগরে ১০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। গাংনীতে দুটি লাইসেন্সবিহীন সেন্টারের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও তা নবায়ন হয়নি।

সরকারি হাসপাতাল নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে জরুরি রোগী এলেও অনেক সময় বাইরে রেফার না করে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সেকমোরা প্রেসক্রিপশনে ‘ডা.’ উপাধি ব্যবহার করে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জটিল রোগী ভর্তি না করে কুষ্টিয়া বা রাজশাহীতে রেফার করার অভিযোগ রয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও অনিয়মের চিত্র দৃশ্যমান। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে খোলা খোলা হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো। পাশাপাশি ওষুধের সংকট, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ না থাকা  এবং সেবার ঘাটতি নিয়মিত অভিযোগ। টিকাদান কর্মসূচির বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে অস্বচ্ছতা; কোন টিকা কত এসেছে এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার স্পষ্ট তথ্য নেই।

দন্ত চিকিৎসা খাতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। জেলায় মাত্র চারজন বিএমডিসি নিবন্ধিত দন্ত চিকিৎসক থাকলেও শতাধিক অনিবন্ধিত ব্যক্তি দাঁতের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। তারা দাঁত তোলা থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ রুট ক্যানেল ও মাইক্রো সার্জারিও করছেন। অথচ তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো নজির নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সংক্রমণ, স্থায়ী ক্ষতি এমনকি হেপাটাইটিস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

সরজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে মেহেরপুর সদর উপজেলায় ২১ টি ডেন্টাল কেয়ারের সাইনবোর্ডে মোট ২৫ জন দন্ত চিকিৎসা করে থাকেন। এদের মধ্যে বিএনডিসির সনদ রয়েছে মাত্র তিন জনের। গাংনী উপজেলায় মোট ১২ টি এবং মুজিবনগর উপজেলায় ৫ টি ডেন্টাল কেয়ার সাইনবোর্ডের ব্যানারে যারা দন্ত চিকিৎসা দেয় তাদের কারোরই বিএমডিসি সনদ নেই। এর বাইরে কিছু ব্যক্তি সাইনবোর্ড ছাড়াও গ্রামাঞ্চলে দাঁতের চিকিৎসা দিচ্ছেন। 

সরজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) নির্দেশনা বাস্তবায়নেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোর লাইসেন্স প্রদর্শন, তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ, বিএমডিসি নিবন্ধন সংরক্ষণ, লাইসেন্স অনুযায়ী সেবা প্রদান, অপারেশনে নিবন্ধিত চিকিৎসকের উপস্থিতি এবং লাইসেন্সবিহীন স্থানে এনেস্থেসিয়া নিষিদ্ধ এসব শর্ত মানা হচ্ছে না। লেবার রুম ও অপারেশন থিয়েটারের নীতিমালাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। এছাড়াও প্রতিটি বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন মেডিকেল অফিসার থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও জেলায় মাত্র চারটি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে সার্বক্ষণিক মেডিকেল অফিসার কর্তব্যরত অবস্থায় পাওয়া গেছে। অন্যগুলোতে সার্বক্ষণিক মেডিকেল অফিসার নাই। 

চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর পর সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে। গত দুই বছরে অন্তত তিন থেকে চারটি ঘটনায় ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটনায় চিকিৎসকরা আহত হন এবং সাময়িকভাবে সেবা বন্ধ হয়ে যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, হামলাকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সব মৃত্যু চিকিৎসা অবহেলার কারণে নয়; অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জটিলতা বা দেরিতে চিকিৎসা নেওয়াও দায়ী হতে পারে। কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব এবং গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না আসাটা জনমনে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

সব মিলিয়ে জেলায় প্রকৃতপক্ষে কতজন এনেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ আছেন, বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে অপারেশনের আগে-পরে প্রোটোকল মানা হয় কি না এবং চিকিৎসা অবহেলার ঘটনায় কতজনের অথবা কয়টি ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই।

এ বিষয়ে মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, 'আমরা বেসরকারি ক্লিনিকগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছি। জেলায় একটি ছাড়া সব ক্লিনিকের লাইসেন্স রয়েছে। কিছু নবায়ন জটিলতা ছিল, তবে এখন পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় স্থাপনের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।'

বিএমডিসি সনদ ছাড়া দন্ত চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'প্রাইভেট চেম্বারে সরাসরি পদক্ষেপ সাধারণত নেওয়া হয় না। কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভবিষ্যতে এ খাত নজরদারিতে আনা হবে।'

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ তদন্ত, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এমএসএম / এমএসএম

গোদাগাড়ীতে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উদ্বোধন: পুষ্টি বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

হাম ও হাম সন্দেহে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

নোয়াখালীতে দারোয়ানের কক্ষে বিদেশি মদের আস্তানা, আটক ১

বারহাট্টায় জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উদ্বোধন

স্ত্রীর পরকীয়ার জের ধরে চাচাতো ভাইকে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ফেরি থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়া বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার

ঠাকুরগাঁওয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেফতার-১

অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই সন্ত্রাসীদের হাতে জীবন দিতে হলো শাহাদাত হোসেনকে

পুলিশের মাদক নির্মূল অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ অধরাই শীর্ষ তালিকাভুক্ত কারবারিরা

কুতুবদিয়ায় জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

হোমনায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপাকে ব্যবসায়ী ও পরীক্ষার্থীরা

এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে শরবত বিতরণ করে প্রশংসা পেয়েছে মধুখালী ছাত্রদল

অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার সংকটে উদ্বেগ বাড়ছে