"বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে সেতু হলে কমবে দূরত্ব, গতি পাবে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও বাণিজ্য"
ভোরের আলো ফোটার আগেই কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন এক অসুস্থ রোগীর স্বজনেরা। অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে থাকা রোগীকে দ্রুত রাজধানীর হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ পথ, যানজট আর অনিশ্চয়তার এক ক্লান্তিকর যাত্রা।
একই সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ের এক শিক্ষার্থী ঢাকায় চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে রাতভর বাসযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর গাইবান্ধার এক কৃষক হিসাব মেলাতে ব্যস্ত—কেন তার উৎপাদিত ধান, ভুট্টা কিংবা সবজি রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতে এত বেশি পরিবহন খরচ গুনতে হয়?
উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে এসব দৃশ্য নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষ একই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের কাছে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবি কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি সময়, সুযোগ, অর্থনীতি ও জীবনমানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতীক।
গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত যমুনা নদীর ওপর কোনো সেতু না থাকায় নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মানুষকে রাজধানীসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে যেতে এখনও দীর্ঘ ঘুরপথের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বর্তমানে অধিকাংশ যানবাহনকে সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতু ব্যবহার করতে হয়। এতে যাত্রাপথ যেমন দীর্ঘ হয়, তেমনি বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয় ও সময়। জরুরি রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী কিংবা কৃষক—সবাইকে এই অতিরিক্ত দূরত্বের বোঝা বহন করতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষায়, “মানচিত্রে ঢাকা যতটা কাছে, বাস্তবে যেন ততটা নয়।”
উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় কিংবা ঠাকুরগাঁও থেকে গুরুতর রোগীদের প্রায়ই ঢাকা, ময়মনসিংহ বা দেশের অন্যান্য বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে হয়।
কিন্তু সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সকে অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবান কয়েক ঘণ্টা রাস্তাতেই হারিয়ে যায়।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, বালাসী-বাহাদুরাবাদে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে চিকিৎসাসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হবে, কমবে ভোগান্তি, বাঁচবে অসংখ্য প্রাণ।
প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যাতায়াত করেন।
দীর্ঘ যাত্রা, অতিরিক্ত খরচ ও সময়ের অপচয় তাদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। অনেক শিক্ষার্থী জানান, বাড়ি থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে পুরো একটি দিন লেগে যায়।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে শুধু দূরত্বই কমবে না, কমবে স্বপ্ন পূরণের পথে থাকা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতাগুলোও।
রংপুর বিভাগ দেশের অন্যতম কৃষিনির্ভর অঞ্চল। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, আলু, গম, শাকসবজি ও দুগ্ধজাত পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু দীর্ঘ পরিবহন পথের কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। ফলে অনেক সময় উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাকসুদুর রহমান শাহান বলেন, পরিবহন ব্যয় কমলে কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুজ্জামান বিশ্বাস তোহা বলেন, একসময় বালাসী-বাহাদুরাবাদ ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌযোগাযোগ কেন্দ্র। এই রুট দিয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হতো ব্যাপকভাবে।
কিন্তু যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা সংকট এবং চর জেগে ওঠার কারণে সেই নৌপথ আজ অনেকটাই ইতিহাসের অংশ। বিভিন্ন সময়ে ফেরি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়নি।
তাই স্থায়ী সমাধান হিসেবে সেতু নির্মাণকেই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বালাসী-বাহাদুরাবাদে সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে আসতে পারে। রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রেও ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
রংপুর চেম্বার অব কমার্সের নেতারা মনে করেন, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবিটি নতুন নয়। দীর্ঘদিনের এই দাবির প্রতিফলন ঘটেছে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও। নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে সেতু বিভাগের উদ্যোগে সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুর পর্যন্ত সম্ভাব্য দুটি রুট নিয়ে সমীক্ষা চলছে।
তবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ভৌগোলিক সুবিধা এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আপনার বক্তব্যটি সংবাদ উপযোগী ও প্রাঞ্জল ভাষায় এভাবে লেখা যেতে পারে—
ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার সঙ্গে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাকে সংযুক্ত করে একটি সেতু নির্মাণ করা হলে রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ ও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষের রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এর ফলে পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষিপণ্য বিপণন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকার সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে তিনি আশাবাদী।
বালাসী ঘাটের লিপন বাবু, কুড়িগ্রামের কৃষক কবির উদ্দিন, পঞ্চগড়ের শিক্ষার্থী হুমায়ুন কিংবা রংপুরের ব্যবসায়ী বিউল ইসলাম—সবার কণ্ঠে একই প্রত্যাশা। তারা চান বহু বছরের যোগাযোগ-বঞ্চনার অবসান হোক।
তাদের কাছে দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেবল ইস্পাত-সিমেন্টের একটি অবকাঠামো নয়; এটি উন্নয়নের সেতুবন্ধন, সম্ভাবনার নতুন দুয়ার এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির প্রতীক।
যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে এখনও অনেক মানুষ স্বপ্ন দেখেন—একদিন আর নৌকা, ঘুরপথ কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষা থাকবে না। বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদের বুক চিরে উঠে দাঁড়াবে একটি আধুনিক সেতু। সেই সেতু শুধু নদীর দুই তীরকে নয়, উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেও যুক্ত করবে দেশের মূল উন্নয়ন প্রবাহের সঙ্গে।
এমএসএম / এমএসএম
গাজীপুরের কাশিমপুরে অপহরণ মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আটক
কুমিল্লা নগর ভবন: বর্তমান স্থানেই স্থাপনের পক্ষে নগরবাসীর ঐক্যবদ্ধ মত তদন্ত কমিটিকে
খুলনায় ইয়ুথ শেয়ার-নেট প্রকল্পের দ্বিতীয় স্টেকহোল্ডার মিটিং অনুষ্ঠিত
গোপালগঞ্জে গ্রাম আদালত বিষয়ক রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
চকরিয়ার ৫০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ
যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনে তরুণীর মৃত্যু: স্বামীর বিচারের দাবিতে মোহনগঞ্জে মানববন্ধন
বড়লেখায় ভূয়া সিআইডি প্রতারক ও চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের আসামী গ্রেফতার
পটিয়া প্রেস ক্লাবে ঢুকে প্রকাশ্যে সাংবাদিকের ওপর হামলা
চিতলমারীতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ: মামলা দায়ের, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার
রাস্তা নির্মাণের নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় কেটে দখলের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন
পাবনায় কিশোরীকে ধষর্ণ-হত্যার জেরে আসামিদের বাড়িতে আগুন, দগ্ধ হয়ে নিহত ৩
রায়গঞ্জে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক প্রশিক্ষণ শুরু