রক্তমাখা স্মৃতিতে বেঁচে আছেন জিহাদের মা
একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, সব আশা আর সব আনন্দের নাম ছিল মো.জিহাদ হোসেন। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, মেধাবী এই সন্তান উচ্চশিক্ষা শেষ করে একদিন বিসিএস ক্যাডার হবে, দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। এরপর ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দেবেন, নাতি-নাতনিদের হাসিতে ভরে উঠবে তাদের বৃদ্ধ বয়সের নিঃসঙ্গ উঠান। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো বাস্তব হওয়ার আগেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঘাতকের গুলিতে নিভে যায় ২৫ বছর বয়সী এই মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন। এক নিমিষেই একটি পরিবারের আলো নিভে যায়, বুকভরা স্বপ্ন পরিণত হয় সীমাহীন শোক আর রক্তমাখা স্মৃতিতে।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ জিহাদ হত্যার বিচার আজও হয়নি। আর সেই বিচারহীনতার ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা। ঘরের এক কোণে আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন ছেলের রক্তমাখা পোশাক, বই, ছবি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র। প্রতিদিন সেই ছবি আর রক্তমাখা পোশাক বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শাহিনুর বেগম। ছেলের স্মৃতিই এখন তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দর্শমিনা গ্রামের বাসিন্দা জিহাদ হোসেন ছিলেন কবি নজরুল সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। মৃত্যুর সময় তিনি একই কলেজে এমএ প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। তিনি শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থীই ছিলেন না, ছিলেন একজন মানবিক, প্রতিবাদী এবং সাহসী তরুণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা ছিল তাঁর স্বভাব। মানুষের জীবন বাঁচাতে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই ২১ বার রক্তদান করেছিলেন তিনি। পরিচিত-অপরিচিত যে কারও প্রয়োজনে সবার আগে ছুটে যেতেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেল প্রায় ৪টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেষে বাসায় ফেরার পথে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন জিহাদ। সহপাঠীরা তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পরদিন ২০ জুলাই রাত প্রায় ১০টার দিকে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরিবারের অভিযোগ, সে সময় পুলিশি চাপে তড়িঘড়ি করে ২১ জুলাই ভোরে সদর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জীবনের মতো মৃত্যুর পরও শান্তিতে বিদায় জানাতে পারেনি পরিবার।
ছেলের শেষ স্মৃতি মনে করে বাবা নুরুল আমিন মোল্লার চোখ আজও অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন,শহীদ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে ছেলে আমাকে ফোনে বলেছিল,'বাবা, ভাত খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। কে জানত, সেটাই হবে আমার সন্তানের শেষ কথা! কিছুক্ষণ পর শুনলাম, আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে। এরপরই খবর এল,আমার জিহাদ আর নেই। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আমার বুকের ভেতর থেকে কেউ হৃদয়টা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আমার সব স্বপ্ন, সব আশা, সবকিছু এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।
তিনি আরও বলেন,মরদেহ বাড়িতে আনার পরও আমরা শান্তি পাইনি। নানা বাধা, ভয়ভীতি আর আতঙ্কের মধ্যে ছেলেকে দাফন করতে হয়েছে। আজ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার এখনো হয়নি। একজন অসহায় বাবার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? আমি শুধু চাই, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। সেই বিচার দেখে আমি যেন চোখ বন্ধ করতে পারি।
মা শাহিনুর বেগমের কণ্ঠে আজও একই হাহাকার। তিনি বলেন, আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল? ও তো শুধু লেখাপড়া করত। ওর স্বপ্ন ছিল মানুষের মতো মানুষ হবে। কেন আমার বুক খালি করে দিল? আজও আমি ওর রক্তমাখা জামা ধুতে পারিনি। সেই রক্তের দাগ দেখলেই মনে হয় আমার ছেলেটা এখনো আমাকে ডাকছে। প্রতিদিন ওর ছবি আর রক্তমাখা জামা বুকে জড়িয়ে কাঁদি। কবরের পাশে গিয়ে দোয়া আর কান্না করি।তবুও একজন মায়ের মন মানতে চায় না। আমার শেষ ইচ্ছা, আমি যেন আমার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার দেখে মরতে পারি। বিচার না দেখে আমি চোখ বন্ধ করতে চাই না।
জিহাদের শিক্ষাজীবন ছিল উজ্জ্বল। তিনি ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি, ২০১৮ সালে স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন। মৃত্যুর সময় তিনি একই কলেজে এমএ প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনার জন্য ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
এদিকে আজ শহীদ জিহাদ হোসেনের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শুকায়নি মায়ের চোখের জল, থামেনি বাবার বুকফাটা আর্তনাদ। প্রতিদিন সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা একই প্রশ্ন করেন,আমাদের সন্তানের হত্যার বিচার কি কোনোদিন হবে?
শহীদ জিহাদের বন্ধু মেহেদী হাসান শাওন বেলেন, জিহাদ শুধু আমাদের বন্ধু ছিল না, সে ছিল পুরো এলাকার গর্ব। বন্ধুবান্ধবসহ যে কোনো মানুষের বিপদে সবার আগে পাশে দাঁড়াত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করাই ছিল তার জীবনের আদর্শ। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি। আমি আজও আমার বন্ধুর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারিনি। এখনও স্কুলজীবনের সেই হাসি-ঠাট্টা, খেলাধুলা আর একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমি সরকারের কাছে জিহাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে জড়িতদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
জিহাদের পরিবার, স্বজন এবং এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির বিবেককে রক্তাক্ত করে। শহীদ জিহাদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান হবে তখনই, যখন তাঁর হত্যাকারীরা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হবে।
এমএসএম / এমএসএম
বারহাট্টায় মাদক নিয়ন্ত্রণে করনীয় শীর্ষক আলোচনা সভায় অনুষ্ঠিত
লাকসামে রথযাত্রা উৎসব উদযাপন
চট্টগ্রামে ভবন নির্মাণে বাড়ছে আইন ভাঙার প্রবণতা
ট্রেনের দরজা থেকে ছিটকে পড়ে যুবকের মৃত্যু
তিস্তার পানি নামতেই রাজারহাটে তীব্র নদীভাঙ্গন বিলীন ২৫ ঘরবাড়ি
বিলাইছড়িতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু
পাঁচবিবি সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১৫শ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার
চন্দনাইশে অধ্যাপক মরহুম ইসহাক উদ্দিন চৌধুরীর স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
আড়ানী পৌর বিএনপি কার্যালয়ে পেট্রোল বোমা হামলা
বারহাট্টায় সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে প্রাণ নাশের হুমকি
খুলে দেওয়া হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট
সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কচি তালুকদারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ