ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রামে ভবন নির্মাণে বাড়ছে আইন ভাঙার প্রবণতা


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ১৮-৭-২০২৬ দুপুর ১:৩৯

*   নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণে বাড়ছে ভোগান্তি, পিছু ছাড়ছে না জলাবদ্ধতা ও যানজট
*    দেড় লাখ ভবনের মাঝে শতভাগ আইন মানার তালিকা শূন্য
*    প্ল্যান ছাড়াই গড়ে তুলছে ভবন ও শিল্প কারখানা

চট্টগ্রাম মহানগরে দিন দিন বাড়ছে ভবন নির্মাণে আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রবণতা। পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্যে বিভিন্ন শর্ত ও নিয়মকানুন থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নগরীতে প্রায় দেড় লাখের বেশি ভবন থাকলেও এর মধ্যে অধিকাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে অনুমোদিত নকশা, সেটব্যাক, পার্কিং, উন্মুক্ত স্থান কিংবা অন্যান্য শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। এমনকি শতভাগ নিয়ম মেনে নির্মিত ভবনের সংখ্যা কার্যত শূন্যের কোটায়। ফলে জলাবদ্ধতা, যানজটসহ নাগরিক ভোগান্তিই যেন নিত্যসঙ্গী। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগর গড়তে পরিকল্পিত নগরায়নের তাগিদ বিশেজ্ঞদের।
জানা যায়, সিডিএ ভবন থেকে চতুর্দিকে ৪৩২ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় কোন স্থাপনা করতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাদকতা রয়েছে।   আর ভবন নির্মাণ নীতিমালা অনুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে চলাচলের রাস্তা থাকা বাধ্যতামূলক। যত উচু ভবন হবে রাস্তার প্রশস্ত তত বেশি হতে হবে। আবার রাস্তা থাকার পরেও প্রতিটি ভবন নির্মাণে চতুর্দিক থেকে জায়গা ছেড়ে কাজ করার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় একটি ৪ কাঠার প্লটে ভবন নির্মাণ করতে হলে সামনের দিকে ১.৫ মিটার, পিছনে ২ মিটার এবং উভয় পাশে ১.২৫ মিটার করে জমি ছাড়ার বিধান রয়েছে। আর ১০ তলার উপরে ভবন হলে সামনের দিকে দেড় মিটার পিছনে ৩ মিটার এবং উভয় পাশে ৩ মিটার করে জায়গা ছাড়তে হবে। আবার বাণিজ্যিক বা কারখানার সম্মুখে কমপক্ষে ৬ মিটার রাস্তা রাখতে হবে এবং উভয় পার্শ্বে ২ মিটার জায়গা খালি রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় বেশিরভাগ ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি না ছেড়ে পুরো প্লটজুড়ে স্থাপনা নির্মাণ, খাল ও জলাধারের প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না রাখা এবং সড়ক সম্প্রসারণের জন্য নির্ধারিত জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ও যানজট পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়ার সময় এক ধরনের নকশা দেখানো হলেও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ভিন্নভাবে। কোথাও অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, কোথাও নির্ধারিত খালি জায়গা দখল, আবার কোথাও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ভবনকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এসব নিয়ম ভাঙা হচ্ছে প্রতিযোগীতা দিয়ে। কেউ এক মিটার ছাড়লে আরেকজন বলে আমি আধা মিটার ছাড়ব। আরেকজন বলে সে আধা মিটার ছেড়েছে আমি আর না ছাড়লেও চলবে। আর এসব প্রতিযোগীতা বেশি হয়ে থাকে প্রভাশালীদের মাঝে। কিছু ক্ষেত্রে অর্থ আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। কোন রকমে একবার ভবন ওঠে গেলেই যেন সবশেষ, পরে শুধু ২/১ টা নোটিশ ছাড়া কার্যকর তেমন কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। কিছু কিছু দুর্বল পার্টিদের স্থাপনা উচ্ছেদ হলেও মাফিয়ারা থেকে যায় বহাল তবিয়তে।
চট্টগ্রামে অবৈধ ভবনের উদাহরণ দিতে গেলে অহরহ মিলবে। যেমন, নগরের চেরাগি পাহার মোড়ে এস আলমের মালিকানাধিন একটি ২৩ তলা ভবন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। একইভাবে নূর আহাম্মদ চৌধুরী সড়কে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের প্রভাবে তাঁর শ্বশুড়ের জায়গায় ১২ তলার অনুমোদন নিয়ে একটি ২২ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের চতুর্দিকে জায়গা ছাড়ার কথা থাকলেও ছাড়া হয়নি। একইভাবে নগরের আশ্রাফ আলী রোডের পূরবী সিনেমার পাশে মো. লোকমানের কয়েকটি ভবনেও অতিরিক্ত উচ্চতা, প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়া হয়নি। এমনকি নগরের ফিরিঙ্গী বাজারে অন্যজনের জমিতে প্ল্যান পাস করিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে চন্দন সিন্ডিকেট।      
চট্টগ্রামের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্রে রিয়াজউদ্দীন বাজারে ২ শতাধিক বহুতল ভবন ও ১০ হাজারের অধিক দোকান রয়েছে। কিন্তু কোন ভবনেই পার্কিং স্পেস নাই, এমনকি ভবনের পাশে ও সামনে পিছনে যে জায়গা ছাড়ার কথা তা ছাড়া হয়নি, এমনভাবে দোকান বসানো হয়েছে মানুষ হাটাও দায়।   
একইভাবে চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জে প্রায় ৬ হাজার দোকান, গুদাম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বহুতল ভবন রয়েছে কয়েক হাজার। আসাদগঞ্জে কয়েকশ বহুতল ভবন এবং ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারের অধিক পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু এসব এলাকায় ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত আইন মানা হয়নি। ভবন নির্মাণে যে পরিমান জায়গা ছাড়ার কথা তা ছাড়া হয়নি। ফলে জনভোগান্তি নিত্যসঙ্গী। নগর ভনের আশেপাশে কোতোয়ালী, পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গি বাজার, আলকরণ, আন্দরকিল্লা, নন্দনকানন, এনায়েত বাজার, জুবিলি রোডেও একই অবস্থা। শুধু এগুলোই নয়, একইভাবে নগরের বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, চকবাজার, দেওয়ান বাজার, জামালখান, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, দেওয়ান হাট, চৌমুহনী, কদমতলী, পাঠানটুলী, আগ্রবাদ, ইপিজেড, পতেঙ্গা, পাহাড়তলীসহ নগরের প্রায় সব এলাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ভবন নির্মাণ নীতিমালা মানা হয়নি। নির্বিচারে পাহাড় ধ্বংস ও জলাধার ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে কিছু ব্যক্তি সাময়িক লাভবান হলেও ক্ষতিটা হয়েছে সামগ্রিক।  
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভবন নির্মাণে আইন না মানার প্রবণতা। নিয়ম ভঙ্গ করে গড়ে ওঠা এসব ভবনের কারণে আবাসিক এলাকাগুলোতে সূর্যের আলো-বাতাস প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সূত্রে জানা যায়, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সব ভবন নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত নির্মাণ ঠেকানো এবং আইন প্রয়োগে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সংস্থাটিকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিএ’র একাধিক কর্মকর্তা জানান, নকশা বহির্ভূত স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উচ্ছে থাকলেও অনেক সময় আইনগত জটিলতায় তা করা সম্ভব হয় না। অসৎ ব্যক্তিরা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবহার করেন। সিডিএ ব্যবস্থা নিতে চাইলে আদালতের মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতির কারণ দেখিয়ে ”স্টে অর্ডার” নিয়ে আসেন, ফলে আর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। মামলা জটিলতায় এমন বহু ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না সিডিএ।   
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি পরিকল্পিত শহরে ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খালি জায়গা রাখা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য জমি সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম উপেক্ষা করেই অধিকাংশ ভবন নির্মিত হচ্ছে।
নগরবাসী মনে করছেন, নতুন ভবনের অনুমোদন ও বিদ্যমান ভবনগুলোরও সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নকশা বহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিয়মিত মনিটরিং এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে চট্টগ্রামকে একটি বাসযোগ্য ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।
এবিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সদস্য (অর্থ ও প্রশাসন) মো. নুরুল্লাহ নূরী বলেন, ভবন নির্মানে আইন না মানার বিষয়টি দুঃখজনক। বর্তমান চেয়ারম্যান এসব বিষয় খুব গুরত্বের সাথে দেখছেন। কিছু ভবনে অভিযান চালানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ অভিযান আরো জোরদার করা হবে। 
এবিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, অনুমোদিত ডিজাইনের বাইরে ভবন নির্মাণ করা একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা জনগণকে সতর্ক করছি। পাশাপাশি অভিযান চলমান আছে, তবে আইন মানতে বাধ্য করার চেয়ে জনসচেতনতা বেশি জরুরি। 
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, সিডিএ’র অনুমোদিত ডিজাইনের বাইরে অতিরিক্ত তলা বা ফ্লোর না বাড়ানো, ভবনের চারপাশে সিডিএ নির্ধারিত বাধ্যতামূলক খালি জায়গা (সেটব্যাক) রাখা, রাস্তার দিকে বা পাশের সীমানার ওপর বাড়তি বারান্দা বা সানশেড বড় না করা, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ বেইজমেন্টকে বাণিজ্যিক দোকান বা গুদামে রূপান্তর না করা, ভবনের মূল কাঠামোগত পিলার এবং বিমের পজিশন অনুমতি ছাড়া না বদলানো, নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে দেয়াল না তোলার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

এমএসএম / এমএসএম

বারহাট্টায় মাদক নিয়ন্ত্রণে করনীয় শীর্ষক আলোচনা সভায় অনুষ্ঠিত

লাকসামে রথযাত্রা উৎসব উদযাপন

চট্টগ্রামে ভবন নির্মাণে বাড়ছে আইন ভাঙার প্রবণতা

ট্রেনের দরজা থেকে ছিটকে পড়ে যুবকের মৃত্যু

তিস্তার পানি নামতেই রাজারহাটে তীব্র নদীভাঙ্গন বিলীন ২৫ ঘরবাড়ি

বিলাইছড়িতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু

পাঁচবিবি সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১৫শ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার

চন্দনাইশে অধ্যাপক মরহুম ইসহাক উদ্দিন চৌধুরীর স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

আড়ানী পৌর বিএনপি কার্যালয়ে পেট্রোল বোমা হামলা

বারহাট্টায় সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে প্রাণ নাশের হুমকি

খুলে দেওয়া হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট

সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কচি তালুকদারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ

রক্তমাখা স্মৃতিতে বেঁচে আছেন জিহাদের মা