বন্যায় ধানহানি, ঋণের চাপ ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে জেলের মৃত্যুর অভিযোগ
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে বন্যায় ফসলহানি, ঋণের কিস্তির চাপ, মাছ ধরতে না পারা এবং পুলিশের মামলার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যে বিকাশ মিয়া (৪৭) নামে এক জেলের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকালে পাশ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলায় আত্মীয়র বাড়িতে পলাতক থাকা অবস্থায় স্ট্রোকে মৃত্যু হয় বিকাশ মিয়ার।
পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও হতাশা থেকে তিনি স্ট্রোকে মারা গেছেন। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হলেও হাওরে মাছ ধরতে না দেওয়ায় তারা চরম সংকটে পড়েছেন।
মৃত বিকাশ মিয়া মোহনগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর মাঘান-সিয়াধার ইউনিয়নের কুড়েরপাড় গ্রামের বাসিন্দা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে হাওরে পাঁচ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন বিকাশ মিয়া। তবে আকস্মিক বন্যায় চার একর জমির ধান তলিয়ে যায়। মাত্র এক একর জমির ধান ঘরে তুলতে সক্ষম হন। চাষাবাদ ও পরে মাছ ধরার জন্য জাল কিনতে এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হতো প্রায় ৩৫ হাজার টাকা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বর্ষা মৌসুমে বড় ছেলে, কলেজপড়ুয়া দিদারকে সঙ্গে নিয়ে হাওরে মাছ ধরে ঋণ শোধ ও সংসারের খরচ চালানোর পরিকল্পনা ছিল বিকাশের। কিন্তু স্থানীয়ভাবে হাওরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি মাছ ধরতে পারেননি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ২৮ জুন পর্যন্ত থাকলেও ডিঙাপোতা হাওরে মাছের পোনা অবমুক্ত করার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে উপজেলার কয়েক হাজার জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পেটের তাগিদে কেউ কেউ গোপনে মাছ ধরতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে পড়ছেন।
গত ১১ জুলাই হাওরে মাছ ধরতে গেলে বিকাশ মিয়াসহ কয়েকজন জেলের খনা জাল জব্দ করে পুলিশ। পরে স্থানীয় জেলেরা থানা থেকে জব্দ করা জাল নিয়ে আসেন। এ ঘটনায় ১৩ জুলাই ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হয়। ওই মামলায় বিকাশের ভাতিজাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরিবারের দাবি, মামলার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে গত ১৪ জুলাই বিকাশ মিয়া পাশের সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে শুক্রবার বিকালে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ নিজ গ্রামে আনা হলে স্থানীয় জেলেরা জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিকাশের স্ত্রী সনজিতা বলেন, “ধান চাষ করতে গিয়ে অনেক ঋণ করেছি। পরে আবার ঋণ করে জাল কিনেছিল আমার স্বামী। কিন্তু মাছ ধরতে না পারায় ঋণ শোধ করতে পারেনি। মামলার পর পুলিশের ভয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। সংসার চালানো, ঋণের চাপ আর গ্রেপ্তারের ভয়-সব মিলিয়ে মানসিক চাপে সে স্ট্রোক করেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব জানি না।”
স্থানীয় জেলে মো. ওসমান গনি বলেন, “মামলার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে এলাকায় অনেক পুরুষ বাড়িতে নেই। সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় আমরা মাছ ধরিনি। এখন স্থানীয়ভাবে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।”
আরেক জেলে মো. মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের দুর্দশার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা উচিত। আরও কিছুদিন পর পানি কমে গেলে মাছ জলমহালে চলে যাবে। তখন লাভ হবে ইজারাদারের, কিন্তু জেলেরা না খেয়ে থাকবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন টুকু এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরের উদ্যোগে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর হাওরে ৭৫ হাজার মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। পোনাগুলো বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে স্থানীয়ভাবে আহ্বান জানানো হয়।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ গত ২৮ জুন শেষ হয়েছে। ফলে তারা বৈধভাবে মাছ ধরার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। এ কারণে স্থানীয়ভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মানতে তারা অনীহা প্রকাশ করছেন। বিষয়টি নিয়ে জেলে ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েক দফা উত্তেজনা ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, “বিকাশ মিয়ার মৃত্যুর খবর আমার জানা নেই। মামলার পর মামুন ও জাকির নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর ওই এলাকায় পুলিশ আর কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এবং দেশীয় মাছের বিস্তার বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য, স্থানীয় জেলেরা হাওরে মাছ ধরার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাছের পোনা সংরক্ষণ ও জলজ সম্পদ রক্ষার স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিকাশ মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারের দাবি ও জেলেদের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এমএসএম / এমএসএম
বাগেরহাট শহরের গাজী সাহেবের দরগাহ’র বেদখল হওয়া সরকারী খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি উদ্ধারের দাবীতে মানববন্ধন
বন্যায় ধানহানি, ঋণের চাপ ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে জেলের মৃত্যুর অভিযোগ
ধর্ষণ মামলায় ময়মনসিংহের অলক মৌলভীবাজারে গ্রেফতার
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই সন্তানের মৃত্যু, বাবাও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
ট্রাকের ধাক্কায় উল্টে গেল সিএনজি, বিএনপি নেত্রী আহত
বরগুনায় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা
রংপুর-কাকিনা সড়কে ধস, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল
মেঘনায় গোসলে নেমে নিখোঁজ কিশোর
লেভেল ক্রসিংয়ে আটকে যাওয়া প্রাইভেটকারে ট্রেনের ধাক্কা, নিহত ১
সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সেমিনার
দৌলতখানে মাদকের ছড়াছড়ি, অভিযানে আটক ৬
‘ঘরের সব ভেঙে শেষ করে দিছে, এখন আমাদের আর কিছুই রইল না’