ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

শিল্পী জয়িতা রশীদের এগিয়ে চলার গল্প


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২-৮-২০২৬ বিকাল ৬:৩৩

‎অসম্ভব রকম এক শিল্প প্রতিভার নাম জয়িতা রশীদ। ছোটবেলা থেকেই নাচের সঙ্গে পথচলা তার। শিল্প চর্চায় তার বিশেষত্ব হলো নৃত্য চর্চার পাশাপাশি কণ্ঠ অনুকরণের সহজাত দক্ষতা। ব্যতিক্রমী এ অভিজ্ঞাতা থেকে ধীরে ধীরে ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচয় তৈরি হয়েছে। শিল্পের এই দুই ভিন্ন মাধ্যমে নিজের প্রতিভার প্রকাশ করে চলেছেন জয়িতা রশীদ।

‎গ্রামের বাড়ি খুলনায় হলেও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। সম্প্রতি নাচের জন্য ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’-এ সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হয়ে পাওয়া এই স্বীকৃতি তার কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ এক অর্জন বলে মনে করেন তিনি

‎পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে জয়িতা বলেন, অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ। আসলে আমি আগে থেকে জানতামই না যে কোনো প্রতিযোগিতা হতে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার আগের দিন রাতে জানতে পারি এবং কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই অংশগ্রহণ করেছিলাম। তাই কোনো প্রত্যাশা না রেখেই যখন প্রথম হয়েছি এবং এই সম্মাননাটি পেয়েছি, তখন আনন্দটা সত্যিই অন্যরকম ছিল। আমার দীর্ঘদিনের নাচের চর্চার জন্য এমন একটি স্বীকৃতি পাওয়াটা আমার জন্য অনেক আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত।

‎জয়িতার নাচের শুরু আরও অনেক আগে। মাত্র তিন বছর দুই মাস বয়সে তার নাচ শেখার যাত্রা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তার মায়ের। তিনিই ছিলেন জয়িতার নাচের প্রথম শিক্ষক এবং তাকে নাচ শেখানোর ব্যাপারে শুরু থেকেই আগ্রহী ছিলেন।

‎তবে শৈশবে নাচের প্রতি জয়িতার আগ্রহ খুব একটা ছিল না। বরং নৃত্যগুরুকে ভয় পেতেন, ক্লাসে যেতে চাইতেন না, এমনকি অনেক সময় কান্নাও করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই অবস্থান। ধীরে ধীরে নাচের সঙ্গে তৈরি হয় গভীর সম্পর্ক। একটা সময় বুঝতে পারেন, নৃত্য শুধু তার জন্য একটি শিল্প নয়, এটি নিজেকে প্রকাশ করারও একটি মাধ্যম। নাচের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি, আনন্দ ও ভালো লাগা প্রকাশ করতে পারেন তিনি। মঞ্চে নাচার সময় যে আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন, সেটি অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করাও কঠিন।

‎নাচের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কণ্ঠ অনুকরণের প্রতিও ছিল তার আলাদা আগ্রহ। বিশেষ করে কার্টুন চরিত্রগুলো তাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। ঘুম থেকে উঠে কার্টুন দেখা, খেতে বসে কার্টুন দেখা, আর প্রিয় চরিত্রগুলোর কণ্ঠ অনুকরণ করে তা মা, বাবা, ভাই-বোনদের শুনিয়ে আনন্দ পাওয়া ছিল তার শৈশবের অন্যতম অভ্যাস। মা তখনই তাকে উৎসাহ দিতেন এবং আরও ভালোভাবে অনুকরণ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। তবে তখন জয়িতা বুঝতে পারেননি, এই শখ একদিন তার পেশাগত পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে।

‎২০২০ সালে করোনাকালে সেই শখই নতুন মোড় নেয়। অনলাইনে একটি প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর কণ্ঠ অনুকরণ করে অনেককে অংশ নিতে দেখেন জয়িতা। তার চোখে পড়ে, কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ নিয়ে তেমন কেউ অংশ নিচ্ছেন না। তখন নিজের ছোটবেলার অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে তিনিও অংশ নেওয়ার কথা ভাবেন।

‎তবে সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ প্রতিযোগিতায় অনেকেই ছিলেন পেশাদার, আর জয়িতা ছিলেন নিজের আগ্রহ থেকে শেখা একজন। তার ওপর কোনো কিছু করলে প্রথম হওয়ার একটা মানসিকতাও ছিল। শেষ পর্যন্ত মায়ের উৎসাহেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। মা ক্যামেরা ধরে দেন, আর জয়িতা তৈরি করেন তার প্রথম ভিডিও। অবাক করার মতোভাবে প্রথম ভিডিওতেই ভালো সাড়া পান। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ভিডিও করতে করতে মানুষের ভালোবাসা ও উৎসাহ বাড়তে থাকে। এভাবেই শখ থেকে ধীরে ধীরে তার ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে পেশাগত পথচলা শুরু হয়।

‎ভয়েসওভারকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে মায়ের অনুপ্রেরণা। ছোটবেলার একটি স্বপ্নের কথাও জানান জয়িতা। কোনো একটি কার্টুন চরিত্রের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠ দেওয়ার ইচ্ছা তার দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য শিল্পীরাও যেন তার কণ্ঠ বা তার তৈরি কোনো চরিত্রের কণ্ঠ অনুকরণ করেন, এমন স্বপ্নও দেখেন তিনি। ছোটবেলায় যেমন অন্যদের কণ্ঠ অনুকরণ করে আনন্দ পেতেন, তেমনি একদিন তার কণ্ঠও যেন অন্য কারও অনুপ্রেরণার কারণ হয়, সেটিই তার প্রত্যাশা।

‎জয়িতার মতে, একজন ভয়েসওভার শিল্পীর জন্য শুধু সুন্দর কণ্ঠস্বর থাকাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন অভিনয় ও আবেগ প্রকাশের দক্ষতা। কারণ ভয়েসওভারে শুধু কথা বললেই হয় না, কণ্ঠের মাধ্যমে সেই অনুভূতিটাও শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে হয়। কোনো দুঃখের বিষয় স্বাভাবিকভাবে কিংবা হাসতে হাসতে বললে সেখানে সেই দুঃখের অনুভূতি ফুটে উঠবে না। আবার আনন্দময় কোনো কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ দেওয়ার সময় কণ্ঠে আনন্দ, উচ্ছ্বাস বা সঠিক এক্সপ্রেশন না থাকলে চরিত্রটিও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে না। তাই তার কাছে ভয়েসওভার মানে শুধু কণ্ঠ দিয়ে কথা বলা নয়, বরং কণ্ঠের মাধ্যমে অভিনয় করা।

‎ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র বা পরিস্থিতিতে কণ্ঠের পরিবর্তনেও তার ছোটবেলার সংগীতচর্চা ভূমিকা রেখেছে। নাচের পাশাপাশি তিনি গানও শিখেছেন সুজিত মোস্তফার কাছে। নিয়মিত রেওয়াজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ভোকাল রেঞ্জে কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের চর্চা করতেন। কখনো উচ্চস্বর, কখনো নিচু স্বরে কণ্ঠ নিয়ে যাওয়ার সেই অনুশীলন পরবর্তীতে ভয়েসওভারে কাজে দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠের টোন, পিচ ও ভঙ্গি পরিবর্তন করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়েছে।

‎তবে ভয়েসওভারের জগতে পথচলাটাও পুরোপুরি সহজ ছিল না। জয়িতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ, উপযুক্ত আবেগ, এক্সপ্রেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো স্ক্রিপ্ট ঠিকভাবে উপস্থাপন করা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় ছোটবেলা থেকে বাংলা চর্চা তুলনামূলক কম ছিল। ফলে বাংলা শব্দের সঠিক উচ্চারণ, বিশেষ করে কিছু কঠিন শব্দ আয়ত্ত করতে তাকে বাড়তি অনুশীলন করতে হয়েছে। এখন কোনো নতুন বা কঠিন স্ক্রিপ্ট হাতে এলে আগে উচ্চারণগুলো ঠিক করে নেন। এরপর কোথায় বিরতি দিতে হবে, কোন শব্দে কতটা জোর দিতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কী ধরনের আবেগ প্রয়োজন, সেগুলো ঠিক করে স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন করেন।

এমএসএম / এমএসএম