ইসরায়েলের নির্বাচন পরবর্তী অচলাবস্থা : নেতানিয়াহুর জন্য আশীর্বাদ?
২০২৬ সালের ইসরায়েল নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু রাজনীতির জটিল সমীকরণের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও বিশ্বের একমাত্র এই ইহুদি রাষ্ট্র সম্ভবত দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসের এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এর কারণ হলো, কোনো পক্ষই—প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ‘লিকুদ’ দল কিংবা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ‘ইয়াশার’ দল—ইসরায়েলের ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহু-পন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, নেতানিয়াহু-বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন এবং আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। নেতানিয়াহুর জন্য এই ফলাফল তাঁকে এগিয়ে রাখলেও, সংখ্যাটি হতাশাজনক; কারণ বিদায়ী নেসেটে (পার্লামেন্টে) তাঁর দলের হাতে ৬৮টি আসন ছিল।
এখন সব দলের সামনে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ১২ সপ্তাহ সময় রয়েছে; অন্যথায় আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে সাধারণ ইসরায়েলিদের।
তবে ধারণা করা হচ্ছে নির্বাচনের বিভক্ত এই ফলাফলটি নেতানিয়াহুর পক্ষেই যেতে পারে। আমরা খতিয়ে দেখব কীভাবে পরবর্তী সরকার গঠিত হতে পারে এবং কেন বর্তমান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জন্য পরিস্থিতি অনুকূল।
নেতানিয়াহু একটি ‘ঐক্য সরকার’ গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন
ইসরায়েলে পরবর্তী সরকার গঠনের একটি উপায় হতে পারে—নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি যদি তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের ‘ইয়াশার’ (দ্বিতীয় বৃহত্তম দল), আভিগদোর লিবারম্যানের ‘ইসরায়েল আওয়ার হোম’ এবং নাফতালি বেনেটের ‘টুগেদার’ দলের সঙ্গে জোট বাঁধার উদ্যোগ নেয়। এতে লিকুদ নেতৃত্বাধীন জোটের এতে মোট আসন সংখ্যা পৌঁছাবে ৬৭-তে, যা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট।
কিন্তু বিভিন্ন কারণে এটি ঘটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। প্রথমত, সেক্ষেত্রে আইজেনকোটকে তার মূল রাজনৈতিক অবস্থান ত্যাগ করতে হবে; কারণ পুরো নির্বাচনী প্রচারণাজুড়ে তিনি নিজেকে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তাছাড়া, দ্বিতীয়ত আইজেনকোট যদি এই জোটে সম্মত হতে চান, তবে নেতানিয়াহুকে তার বর্তমান জোটসঙ্গী কট্টর ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। তবে ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর লিকুদ পার্টির প্রধান কার্যালয়ে বক্তব্য রাখার সময় নেতানিয়াহু তার ‘বিশ্বস্ত মিত্রদের’ ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি একটি ‘শক্তিশালী ডানপন্থী সরকার’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন—এই মন্তব্যের অর্থ অনেকে এমনভাবে নিয়েছেন যে, তিনি সম্ভবত তাদের সঙ্গে নিজের জোট বজায় রাখতে চান।
দলত্যাগীদের নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর জন্য দ্বিতীয় একটি সম্ভাবনা বা সুযোগ হলো হলো, বিরোধী জোট থেকে দলত্যাগকারীদের নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেন তিনি।।
বিরোধী শিবির থেকে নাফতালি বেনেট এবং আভিগদর লিবারম্যানের নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে তারা দুজনেই কট্টর ডানপন্থী এবং নিরাপত্তার বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মিল রয়েছে।
তবে এখানে বড় বাধা হলো—নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তারা দুজনেই ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন, যা পরিস্থিতিটিকে বেশ জটিল করে তুলেছে।
আরব দলগুলোকে নিয়ে বিরোধীদের উভয়সংকট
আইজেনকোট-নেতৃত্বাধীন জোট যদি আরব দলগুলোর—যেমন ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ পার্টির সঙ্গে হাত মেলায়, তবে ইসরায়েলে নেতানিয়াহু-বিহীন একটি সরকার গঠিত হতে পারে। সামরিক বাহিনীর সাবেক এই প্রধান যদি আরব দলগুলোর সমর্থন আদায় করতে পারেন, তবে তিনি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।
তবে এই বিষয়টিও যথেষ্ট কঠিন। কারণ এই জোটের চারটি দলের মধ্যে তিনটি—‘ইয়াশার’, ‘টুগেদার’ এবং ‘ইসরায়েল ইজ আওয়ার হোম’—আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় আইজেনকোট তার জোটে যোগ দেওয়ার জন্য চারটি শর্ত দিয়েছিলেন —(ক)ইসরায়েলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া; (খ) স্বাধীনতার ঘোষণার মূল্যবোধগুলোর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা; (গ) বাধ্যতামূলক সামরিক বা জাতীয় সেবা চালু রাখা; (ঘ) হামাসকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া।
সেপ্টেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইজেনকোট বলেছিলেন যে, আরব দলগুলো তাঁর শর্তগুলো পূরণ করতে পারেনি, তাই তারা সরকারের অংশ হতে পারবে না।
অবশ্য আইজেনকোট চাইলে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন, যেখানে জোটের বাইরে থেকে ‘রা’আম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে এমন সরকার অত্যন্ত দুর্বল ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।
সুতরাং, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পরিস্থিতিটিও শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর পক্ষেই যাচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার ফলে নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন, তবে এখন তার পরিচয়- তত্ত্বাবধায়ক মন্ত্রী। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায়, নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ী সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে কাজ চালিয়ে যায়। এর অর্থ হলো, পরবর্তী জোট সরকার গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার সময় নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বহাল থাকেন।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করবেন এবং এরপর এমন একজনকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন, যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন প্রশাসন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন; যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে।
আইন অনুযায়ী, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনত বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে—যেমন যুদ্ধ ঘোষণা করা বা কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে, কারণ নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে চান।
নতুন নির্বাচন
যদি ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী পরিণতি হবে নতুন নির্বাচন।
অনেকের মতে, এটি নেতানিয়াহুর জন্য এক ধরনের পরোক্ষ জয়; কারণ নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাছাড়া, নতুন নির্বাচনে তার জয়লাভের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যদি ফের নির্বাচন হয় তাহলে আরব ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতি হয়তো আর দেখা যাবে না—বিশেষ করে যদি সংসদে তাদের রেকর্ড সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব কোনো পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া, দ্বিতীয়বার ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি ডানপন্থী ভোটারদের আরও বেশি সংগঠিত করে তুলতে পারে।
পাশাপাশি, যে প্রায় ৭০ হাজার ইসরায়েলি ভোট দেওয়ার জন্য আকাশপথে দেশে ফিরে এসেছিলেন, তাদের আবারও ফিরে আসার সম্ভাবনা কম; আর এটি নেতানিয়াহুকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
পরিশেষে বলা যায়, যদিও নেতানিয়াহু হয়তো সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হননি, তবুও শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়তো বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
সূত্র : এএফপি, ফার্স্টপোস্ট
aliul / aliul
ভারতে নিখোঁজ হওয়া সেই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত
ইসরায়েলের নির্বাচন পরবর্তী অচলাবস্থা : নেতানিয়াহুর জন্য আশীর্বাদ?
ভারতে ছয় আরোহীসহ হেলিকপ্টার নিখোঁজ
শনিবারের বিক্ষোভ সামাল দিতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করছে ফ্রান্স
ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধে প্রস্তুত রাশিয়া: পুতিন
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১১৫ ডলার
নেতানিয়াহুকে সরাতে সহায়তায় প্রস্তুত আরব দলগুলো
ইসরায়েলি আরব দল : বিদেশি ইহুদিদের গর্ব, দেশীদের জন্য হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে নিজেকে ব্রাজিলের ‘বৈধ নেতা’ দাবি বোলসোনারোর
ইসরায়েলের নির্বাচনে কে জিতল, তা নিয়ে ‘মাথাব্যাথা’ নেই হিজবুল্লাহর
ইসরায়েলে নির্বাচন : গণনা প্রায় শেষ, কে বিজয়ী এখনও অস্পষ্ট
স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জনের মৃত্যু, তিন দিনের শোক ঘোষণা