ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেডিকেল বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, দায় কার?
চিকিৎসা সেবা আমাদের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম থেকে উৎপন্ন বর্জ্য মানুষ এবং তার আশেপাশের পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মেডিকেল বর্জ্যের দূর্বল ব্যবস্থাপনা বা অব্যবস্থাপনা মানুষ এবং পরিবেশের উপর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে সম্ভাব্য সংক্রামক এবং বিপজ্জনক বর্জ্য সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলাতে উৎপন্ন হয়।
মেডিকেল বর্জ্য পরিবেশগত স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এজন্য মেডিকেলের বর্জ্যের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। বর্জ্য উৎপাদনকারী, ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত এবং যে এলাকায় এসব ব্যবস্থাপনা করা হয় এর আশপাশে বসবাসকারীদের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসা বর্জ্য হেপাটাইটিস বি/সি এবং আলডিএস (এইচআইভি) স্বাস্থ্যের সংক্রমণের মতো রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া করোনা মহামারীতে এমন দূর্বল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে করোনায় সেটি আরো ভয়ানক অবস্থা ধারণ করেছে সন্দেহ নেই। প্রায় ১৬০ মিলিয়ন মানুষের শহর রাজধানী ঢাকা। এতো বিপুল মানুষের শহরে মেডিকেল বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা নগরের পরিবেশ এবং শহরবাসীর স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক পরিণতি ঘটাচ্ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে ২০১৭ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে আমার তত্বাবধায়নে মাস্টার্স শিক্ষার্থী সানজিয়া মহিউদ্দিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি গবেষণা কাজ করে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন করা এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিভাবে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানুষের উপর প্রভাব ফেলে এর কারণগুলো চিহ্নিত করা। এই গবেষণায় গুণগত এবং পরিমাণগত উভয় তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছিল। গবেষণায় দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের চারটি সরকারি হাসপাতাল, চৌদ্দটি বেসরকারি হাসপাতাল, চারটি ক্লিনিক এবং আটটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জরিপ চালানো হয়। গবেষণার ফলাফলে এটি স্পষ্ট যে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অসন্তোষজনক। গবেষণায় আরও জানা গেছে যে, দক্ষ জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত সংগ্রহ ও সঞ্চয় সুবিধা, অপর্যাপ্ত পরিবহন ও নিষ্পত্তি সুবিধার কারণে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সীমাবদ্ধ। জনসাধারণ এবং ছোট ছোট স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিভাবে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হয় সেটিই জানেন না সংশ্লিষ্ঠরা।
ঢাকা শহরে ১২০০’রও বেশি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান আছে। এরমধ্যে প্রায় ৩৭৭ স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। আরেকটি বিষয় লক্ষনীয় যে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) চেয়ে দক্ষিণ সিটিতে স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব অত্যধিক বেশি। মাঠ জরিপের সময় ডিএসসিসি এলাকার পাঁচটি অঞ্চল নির্বাচন করা হয়েছিল। এছাড়া এই অঞ্চলেই ঢাকা শহরের বড় বড় ৩ টি হাসপাতাল অবস্থিত। সেগুলো হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডিএমসিএইচ), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (এসএসএমসিএইচ), এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল (বিএসএমএমইউ)। এই তিনটি বৃহত্তম পাবলিক হাসপাতাল প্রচুর পরিমাণে মেডিকেল বর্জ্য উৎপন্ন করে।
মাঠ জরিপ থেকে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি বর্জ্য তৈরি হয় রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে এর পরিমাণ প্রায় ৪৬.৪ শতাংশ। এর পাশাপাশি রয়েছে সাধারণ বর্জ্য ৩১.৯ শতাংশ, ওষুধ জাতীয় বর্জ্য ১৩ শতাংশ, ধারাল বর্জ্য প্রায় ৫.৮ শতাংশ এবং রাসায়নিক বর্জ্য প্রায় ২.৯ শতাংশ। এসব বর্জ্যের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপারেশন রুম, ওয়ার্ড রুম এবং ল্যাবরেটরি।
গবেষণায় স্পষ্ট যে, সরকারি এবং প্রাইভেট ক্লিনিকে মেডিকেল বর্জ্য রাখার যে ৩ বা ৪ রঙ্গের কনটেইনার থাকার নিয়ম থাকলেও তা সঠিক ভাবে মেনে চলে না। প্রতিদিন খুব সকালে ডিএসসিসি সাধারণ ও বিপজ্জনক মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে থাকে আর ‘প্রিজম বাংলাদেশ’ (একটি এনজিও) শুধু মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে থাকে। তবে সব স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে মেডিকেল বর্জ্য রাখার জন্য খোলা ও অনুপযুক্ত জায়গা ব্যবহার করে।
দেখা গেছে, প্রায় ৮৩.৪ শতাংশ স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে বিপজ্জনক বর্জ্যের জন্য কোন আলাদা ব্যবস্থা কিংবা নষ্ট করার মতো সুবিধা নেই। চিকিৎসা বর্জ্য পরিশোধন, ধ্বংস এবং বর্জ্য পরিবহনের জন্য তাদের ডিএসসিসি এবং প্রিজম বাংলাদেশ এর উপর নির্ভর করতে হয়। এসব বর্জ্য পরিবহনে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ৩১.৯ শতাংশ ম্যানুয়্যাল পদ্ধতি, ট্রলিতে ৬৩.৮ শতাংশ, হুইলারে ৪.৩ শতাংশ বর্জ্য পরিবহন করে। এছাড়া ডিএসসিসি ২১.৭ শতাংশ এবং প্রিজম বাংলাদেশ ৭৩.৯ শতাংশ মেডিকেল বর্জ্য তাদের নিজস্ব মেডিকেল বর্জ্য ভ্যানে পরিবহন করে।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায় যে, স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান কতৃক বাহিত মেডিক্যাল বর্জ্যের ৪৬.৪ শতাংশ সিটি কর্পোরেশনের জমিতে ফেলা হয়, উন্মুক্ত স্থানে পোড়ানো হয় ১০.১ শতাংশ, ডাস্টবিনে পোড়ানো হয় ৮.৭ শতাংশ এবং হাসপাতাল মাটিতে পুঁতে রাখে ৫.৮% শতাংশ। এছাড়া ডিএসসিসি সাধারণ বর্জ্য হিসেবে ডাস্টবিনে ফেলে ১৫.৯% শতাংশ এবং বর্জ্য শোধনাগারে ১১.৬ শতাংশ ব্যবহার করে। তবে প্রিজম বাংলাদেশ ঢাকার অদূরেই মাতুয়াইলে অবস্থিত ডাম্পে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগারে ৭২.৫ শতাংশ মেডিকেল বর্জ্য চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে থাকে।
তবে সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, যেখানে প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা থাকা দরকার সেখানে ৮৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই কোন পরিকল্পনাই নেই। যথাযথ মনিটরিং সুবিধা এবং দ্বায়িত্বশীলতার অভাবে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দূর্বল হয়ে গেছে। জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি (৫১%), বিশেষ করে ছোট স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র গুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি তত্ত্বাবধান বা পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো ব্যবস্থাপনা টিম নেই।
বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তত্ত্বাবধান কমিটি এবং দল থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। এছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয় আছে যে কারণে ঢাকা শহরের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ভাবে সম্পাদন হচ্ছে না। এজন্য সেই গবেষণাপত্রে আমরা বেশকিছু সুপারিশ করেছি। যেগুলো প্রয়োগ করলে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে সেগুলো হলো- মেডিকেল এবং নন-মেডিকেল কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচির ব্যবস্থা করা, মেডিকেল বর্জ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, জাতীয় পরিকল্পনা বা নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত কাঠামো তৈরি করা, সকল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মীদের জন্য যথাযথ নির্দেশনাসহ লিখিত নিয়ম এবং নির্দেশিকা প্রস্তুত করা, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ভাল ব্যবস্থাপনা টিম থাকা এবং যথেষ্ট দক্ষ জনশক্তি থাকতে, যাতে মেডিকেল বর্জ্যে সঠিক ব্যবস্থাপনা করার মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থাপনা সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে একটি শক্তিশালী সমন্বয়ের মাধ্যমে মেডিকেল বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব।
লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
সাবেক শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকাঅনুলিখন : জাহিদুল ইসলাম সাদেক
এমএসএম / জামান
ডা. জুবাইদা রহমানের সফট পাওয়ার কূটনীতির উত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত!
ঈদ জামাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন-মিসাইল সতর্কতা; মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিস্ময়!
প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ: দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টান্ত, সুশাসনে জোর!
নীরব কৌশলের রাজনীতি: রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
ঈদ-উল-ফিতর সৌহার্দ্য ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
লাইলাতুল কদরের ইবাদত: বান্দার গুনাহ মাফের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ অপরিহার্য!
আল-কুরআন বিজ্ঞান ও রমজান
ঈদযাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক
ঈদের প্রহর গুনছে দেশ, পে-স্কেলহীন বাস্তবতায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের আনন্দ কতটুকু?
গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ
হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা: ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকিতে, বাংলাদেশের সামনে নতুন সতর্কবার্তা
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব