খানসামায় তিন মাসে একাধিক ধর্ষণ, হত্যা ও সংঘর্ষ—প্রশাসন ব্যর্থ, জনগণ শঙ্কিত

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় গত তিন মাসে অপরাধের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে পুরো উপজেলা যেন ধীরে ধীরে অপরাধের করাল গ্রাসে ডুবে যাচ্ছে। ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, কিশোর হত্যা, সংঘর্ষ, মাদক ব্যবসা এবং সশস্ত্র হামলার মতো নানা ঘটনায় এলাকাবাসীর জীবন আতঙ্কিত ও অনিশ্চয়তায় ভরা। প্রশাসনের প্রচেষ্টা থাকলেও, একের পর এক ঘটনায় সেই উদ্যোগ পর্যাপ্ত হচ্ছে না বলেই তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ৮ জুন উপজেলার টংগুয়া কছিরপাড়ায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মাত্র ৯ বছর বয়সী এক শিশু বিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে তার নিজ চাচার ধর্ষণের শিকার হয়। শিশুটি পানি খেতে গিয়ে চাচার ঘরে ঢোকার পর এই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয় এবং মা বাদী হয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযুক্তসহ তার পরিবারের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দাখিল করা হলেও, এক মাস পেরিয়ে গেলেও মূল আসামি এখনো পলাতক এবং বাকিদের গ্রেপ্তারে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে "তদন্ত চলছে" বলা হলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ এই আশ্বাস বহু পুরনো এবং বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ১১ জুন গভীর রাতে একই ইউনিয়নের ঝগরুপাড়া গ্রামে ১৫ বছরের এক কিশোরী ঘুমন্ত অবস্থায় লালসার শিকার হয়। অভিযুক্ত বাঁধন (১৯) পলাতক এবং পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। থানায় এফআইআর দায়ের হলেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের চাপ, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং সামাজিক উদাসীনতার কারণেই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।
এরই মধ্যে ১৫ জুন আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর (উকিল পাড়া) গ্রামে এক চাঞ্চল্যকর কিশোর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৩ বছর বয়সী আরাফাত হোসেনকে স্থানীয় একটি পুকুরে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন নিহতের বাবা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং পুলিশের তৎপরতায় অভিযুক্ত মো. রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও এই ঘটনায় গ্রেপ্তার দ্রুত হলেও, স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে—কেন অধিকাংশ ঘটনায় এমন সাড়া পাওয়া যায় না?
মাদক নিয়ে খানসামার চিত্র আরও ভয়াবহ। চোলাই মদ, ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবার সহজলভ্যতা ও বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাকেরহাট, ভাবকী ও ভেড়ভেড়ীর মতো এলাকা কার্যত অঘোষিত মাদক হাটে রূপ নিয়েছে। ৮ ও ৯ এপ্রিল তেবাড়িয়া চৌরঙ্গী এলাকায় গাঁজা ও চোলাই মদসহ গোলাপ হাওলাদার ও আব্দুর রহিমকে গ্রেপ্তার করে মোবাইল কোর্ট ৩ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করে। একই সময়ে নূর আলম ও মো. সেলিমকে বাংলামদসহ আটক করে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২২ মে মোবাইল কোর্টে মাদক সেবনের দায়ে তিন যুবক—হাবিবুর রহমান, সারোয়ার ইসলাম ও ওয়াসকুরুনি—দণ্ডিত হয়। জুন মাসে পাকেরহাট ও ভেড়ভেড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা আটক হলেও, মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত সিন্ডিকেটের জন্যই মূল হোতারা নিরাপদে রয়েছেন।
মারামারি, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এপ্রিলের শেষদিকে জুগীরঘোপা গ্রামে সশস্ত্র হামলায় এক নারীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। ধারালো অস্ত্র, লাঠি ও রড ব্যবহারে রক্তাক্ত সংঘর্ষের সেই দৃশ্য এখনো এলাকাবাসী ভুলতে পারেনি। এ ছাড়াও গত ২০ জুন টাটারু শাহপাড়ায় জমি সংক্রান্ত বিরোধে হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার লুটসহ নারী সদস্যদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্তদের মধ্যে মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার সাক্ষী রফিকুলকে জামিনপ্রাপ্ত আসামিরা গতকাল পাকেরহাটে মারধর করে হাসপাতালে পাঠালে এলাকাবাসীর ক্ষোভ আরও চরমে ওঠে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনা গতকাল ৩ জুলাই ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নে সংঘটিত সংঘর্ষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়—দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে নিতে দেখা গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার অন্যতম ভুক্তভোগী শোয়েব আহমেদ শাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুর আশঙ্কা করে লিখেছেন, “আমাকে মাফ করে দিয়েন। আমার অবস্থা খুব খারাপ, আমি মনে হয় বাঁচবো না।” অন্য এক পোস্টে তিনি আরও বলেন, “আমাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী সিরাজুল, এমদাদুল মুসা, এজাবুল, এমদাদুল, আবু সাঈদ। থানায় আমরা বিচার পাই নাই।” তার এই আর্তনাদ যেন পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতার এক নিঃশব্দ স্বীকৃতি।
একদিনে এক উপজেলার চারটি স্থানে সংঘর্ষ ও রক্তপাত—এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। জমি নিয়ে বিরোধ, পাওনা টাকা আদায়, পারিবারিক রেষারেষি—তুচ্ছ বিষয়গুলো এখন যেন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—আমাদের বিচারব্যবস্থা, সালিশি প্রথা আর সামাজিক নেতৃত্ব কি আজ ব্যর্থ হয়ে পড়েছে? নাকি মানুষ এখন আর আলোচনার পথে হাঁটতে চায় না—বরং হাতেই তুলে নিচ্ছে অস্ত্র? এই বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দিনাজপুর জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক রাহিদুল ইসলাম রাফি। তিনি লিখেছেন, “একদিনে এক উপজেলার চার জায়গায় রক্তপাত—এটা কোনো সাধারণ সংকেত নয়। প্রশাসন ও সমাজের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এই রক্তাক্ত খানসামা উপজেলা আমরা চাই না। আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হোক, সংঘর্ষের মাধ্যমে নয়।” এই বক্তব্য শুধু একজন ছাত্রনেতার প্রতিবাদ নয়—এটা খানসামার সাধারণ মানুষের মনের কথা। আমরা চাই এমন একটি উপজেলা, যেখানে মতবিরোধ থাকলেও তার সমাধান হবে আলোচনায়, রক্তপাত দিয়ে নয়। যেখানে থাকবে সহমর্মিতা, সহিংসতা নয়। শান্তি ও মানবিকতা হোক আমাদের সামাজিক জীবনের ভিত্তি।
খানসামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নজমুল হক বলেন, “সম্প্রতি কিছু অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে, আমরা সেগুলো গুরুত্ব সহকারে দেখছি। প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে মামলা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে, বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। যেকোনো অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের সবার সহযোগিতা দরকার।—কারণ পুলিশের একার পক্ষে সবকিছু সামলানো সম্ভব নয়।”
এমএসএম / এমএসএম

দেবিদ্বার রাজামেহার প্রতিবন্ধী কমপ্লেক্সে আদর্শ বিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর ও অভিভাবক সমাবেশ

পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করলে উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে, অর্থনীতি হবে সমৃদ্ধ: সিলেট-চট্টগ্রাম ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশন

বেনাপোলে মিজান কসাইকে জবাই করে হত্যা

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ; সীমান্তে আরও অপেক্ষামাণ ২০থেকে ২৫ হাজার

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে

গাজীপুরে অন্তহীন অভিযোগে অভিভাবকদের তোপের মুখে প্রধান শিক্ষক!

ভূঞাপুরে টাইফয়েড টিকাদান বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন সভা

রাণীশংকৈলে পুলিশের ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠিত

সবুজে ঢেকে যাক কালকিনি: পরিবেশ রক্ষায় আনসার-ভিডিপি’র অঙ্গীকার

অভয়নগরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা

শ্রীমঙ্গলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত -১

তানোরে ব্যাক ডেট ও জালিয়াতি নিয়োগের তদন্তে হাজির হননি ভারপ্রাপ্ত অধ্যাক্ষ
