নাগরিক সমাজ ও মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার
ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিকাশে শিক্ষা এমন এক অনন্য শক্তি, যা আমাদের মানবিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলিকে জাগ্রত করে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। একুশ শতকের বাংলাদেশে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের প্রয়োজন মেটাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, তা পূরণ করতে শিক্ষাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। আর সেটি করতে গেলে তার মূল ভিত্তি হিসেবে শিক্ষার তিনটি ধারার অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার তিনটি উপধারা তথা জনশিক্ষা, গণশিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এই তিনটি শিক্ষা উপধারার সমান্তরাল ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে সাংস্কৃতিক রূপান্তর সম্ভব, যা কেবল রাষ্ট্র সংস্কারের জন্যই নয়, বরং সমাজ জীবনের মানবিক ও সাংগঠনিক কল্যাণে সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তাই জনশিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় মৌলিক ধারণাগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে জনসমক্ষে তুলে ধরা। যেমন-রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত মৌলিক ধারণাগুলো, নাগরিকের দায়দায়িত্ব ও অধিকারগুলো, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশসচেতনতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে জনশিক্ষা মানুষের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে তুলতে পারে।কিন্তু সেটিকে অনানুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বিত প্রয়াস হিসেবে দেখাটা পদ্ধতিগতভাবে বিশেষ ফলদায়ক। তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান যুগে জনশিক্ষার কার্যকর প্রয়োগে প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নৈতিক অবক্ষয় কবলিত সমাজে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিনির্মাণে পারিবারকে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করে তাকে সুসংহত ও কার্যকর করা অত্যাবশ্যক। আমাদের মনে রাখতে হবে যে রাষ্ট্রের সংস্কার ও উন্নতির জন্য শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়, পারিবারিক শিক্ষার উন্নয়নেও বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। মা-বাবাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা জরুরি, যেখানে তাঁরা সন্তানদের মধ্যে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি, সহযোগিতা এবং ঐক্যের মানসিকতা তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁদের সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। সমাজে প্রচলিত পরিবারতন্ত্রের ধারণা বদলাতে পরিবার থেকেই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। পরিবারের ভেতরে সদস্যদের মাঝে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তথা সমতা, ন্যায়বিচার, মুক্তচিন্তা এবং সহমর্মিতার চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে এসব গুণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এভাবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবিক আচরণের চর্চা বিস্তৃত করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ের বেশ আলোচিত বিষয়: জুলাই সনদ,সংস্কার ও নির্বাচন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত এগুলোর কতটুকু বাস্তবায়ন হবে কিংবা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটা নিশ্চিত নয়, তবে এটা নিশ্চিত-সংস্কার, জুলাই সনদ, গণপরিষদ, গণভোট এই শব্দগুলো রাজনীতিসচেতন মানুষের কাছে আটপৌরে শব্দে পরিণত হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশন এবং বিশেষ করে ঐকমত্য কমিশনকে কেন্দ্র করে মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথেষ্ট পরিমাণ আলোচনা, বিতর্ক এই প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনার পতন এবং পলায়ন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার প্রশ্নে তাদের মতো করে আন্তরিক, এটা স্পষ্ট। কিন্তু এটাও আমরা খেয়াল করছি, সংস্কারের পরিমাণ, ব্যাপ্তি এবং সেটার বাস্তবায়নের সময় ও পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র বিতর্কে জড়িয়েছে। এই বিতর্ক যে শুধু ঐকমত্য কমিশনে হয়েছে তা নয়, এই বিতর্ক ছড়িয়েছে মাঠে-ময়দানেও। এমনকি চলছে রাজনৈতিক কর্মসূচিও। এবারই সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট অনুষ্ঠান করার দাবিতে জামায়াতে ইসলামী এবং কিছু ইসলামি দল মাঠে জনসমাবেশ, মিছিল, মানব বন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করছে। এক কথায় বলা যায় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে অপরাপর দলগুলোর তুলনায় বেশি দ্বিমত প্রকাশ করেছে বিএনপি। এই দ্বিমত প্রকাশকে কেন্দ্র করে নানাভাবে বিএনপিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো। আকার-ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করা হয়েছে কম সংস্কার চাওয়ার মাধ্যমে বিএনপি নতুন করে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছে। অর্থাৎ এটাকে রাজনীতির লাভ-লোকসানের বিষয় বানিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশন প্রাথমিক প্রস্তাবে বলেছিল প্রস্তাবগুলো পরবর্তী সংসদ প্রথম দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। এই প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপি একমত হলেও জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ আরও বেশ কিছু দল প্রস্তাবটি মেনে নেয়নি। তারা চেয়েছে নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে অন্য দলগুলো বিএনপির ওপরে অনাস্থা জনগণের সামনে প্রকাশ করেছে। এখানেও আছে রাজনৈতিক লাভ লোকসানের প্রশ্ন।
ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি যেভাবে আলোচনা করেছে, তাতে যৌক্তিকভাবেই মনে হয় যতটুকু সংস্কারের সঙ্গে বিএনপি একমত হয়েছে, সেটুকু তারা নিশ্চয়ই বাস্তবায়ন করবে। বাস্তবায়নের সদিচ্ছা না থাকলে দলটি একমত হয়নি, এমন অনেক ব্যাপারে আপাত-মতৈক্য দেখিয়ে সমালোচনা এড়াতে পারত। কিন্তু সেটা না করে বিএনপি তার অবস্থানে শক্ত থেকেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন নাগরিক সমাজে আলোচিত কিছু মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে দ্বিমত হওয়ায় বিএনপি সমালোচিত হয়েছে।
সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলাপে জামায়াতে ইসলামী বেশ আগে থেকেই ছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর তারা এটার কথা বললেও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রাথমিক প্রস্তাবের পর আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী এই দাবি তোলেনি। কিন্তু তিন মাস আগে ঢাকায় মহাসমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে বেশ কঠোর অবস্থান নেয়। শুধু তাই না, পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী বিভাগ, জেলা এমনকি উপজেলা পর্যায়েও এই দাবিতে মিছিল, সমাবেশ করেছে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে জামায়াতকে বেশ প্রাসঙ্গিক রেখেছে লম্বা সময়। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের খবরে, টক শোতে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে এমন একটি ইস্যুতে, যেটা আলোচনায় আসার কথাই ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলো যা যা বলে সব সময় সেটা যে আন্তরিকভাবে ধারণ করে, সেটা না-ও হতে পারে। দলগুলোর মুখে অনেক সময় অনেক বক্তব্য থাকে, যেটা কারও প্রতি কোনো বার্তা বা চাপ প্রয়োগের জন্য হয়। একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র এবং জনগণের কল্যাণে সব বিষয়ে একমত হবে, এটা আশা করতে দোষ নেই।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর পথপরিক্রমার ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ব্যবস্থাটা এভাবে কাজ করে না। রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে করা হবে, সেটা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন দর্শনগত পার্থক্য আছে, তেমনি আছে যেকোনো পদক্ষেপ নেবার ক্ষেত্রে নিজ দলের লাভ-ক্ষতির হিসাব। জনগণ, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জনগণ এবং রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনগণের কল্যাণে কাজ করা এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ অনুসরণ করা। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, তবে রাষ্ট্র সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হিসেবে জনশিক্ষা, গণশিক্ষা এবং পারিবারিক শিক্ষা। শিক্ষার এই তিনটি বিশেষ উপধারাকে আমাদের গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।একটি টেকসই এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্রকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা গঠনের জন্য শিক্ষার এই তিনটি উপধারার সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সমাজে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি ধাপকে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যকে ধারণ করার প্রেরণার উৎস হিসেবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম আত্মনির্ভরশীল, নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে জনগণের কাছে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্র ও জাতীয় স্বার্থ অনেক বড় হয়ে উঠবে এবং সমাজে দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধে সে মূল্যবোধ বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের গণ-আকাঙ্ক্ষাকে মূল্য দিতে গবেষণানির্ভর সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত শিক্ষার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটানো গেলেই কেবল আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব। আর তখন এই সাংস্কৃতিক রূপান্তরই আমাদের দেশকে একটি পুনর্গঠিত রাষ্ট্রকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা উপহার দিয়ে সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে, যা দেশের নাগরিকদের মানবিকতা এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
Aminur / Aminur
জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা কমাতে করণীয়
ইউরোপ আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন
জুলাই সনদ, গণভোট ও নির্বাচন
বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের বিশ্রামাগার জরুরি
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সচেতনতার বিকল্প নেই
ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক তারেক রহমান
তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা
গণতন্ত্র, সুশাসন এবং জনগণ
বৈষম্য ও দারিদ্র্য কমাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়
গ্রামীণ ঐতিহ্য ও শীত কালীন রসদ সুমিষ্ঠ খেজুর রস
প্রতিশোধের রাজনীতি জাতির জন্য এক অভিশাপ
জলবায়ু সম্মেলন ও বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী