ঢাকা বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমানের সামনে বাস্তবতা ও প্রত্যাশা


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ১৭-২-২০২৬ রাত ৮:৩৯

‎বাংলাদেশ আবার একটি রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর এই নতুন সরকার শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সামনে এক নতুন পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

‎সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যা তাদের দ্রুত নীতি-সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি দায়িত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।

‎তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা নিজেই নাটকীয়। দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে নির্বাচনে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তাকে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তার বিজয় বক্তৃতায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান এবং প্রতিশোধমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

‎নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনও নজর কাড়ছে। ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা বিস্তৃত এবং বিভিন্ন খাতে দ্রুত নীতিনির্ধারণের সুযোগ দিতে পারে। তবে এত বড় মন্ত্রিসভা প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

‎নতুন মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন মুখ যুক্ত হওয়ায় এটিকে প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেকে। দীর্ঘদিন একই নেতৃত্বের আধিপত্য থাকা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা দলীয় পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভারসাম্য রক্ষা করা এখানে চ্যালেঞ্জ। নতুনরা কত দ্রুত প্রশাসনিক বাস্তবতা বুঝে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটিই সরকারের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

‎বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিসভার বিন্যাস শুধু রাজনৈতিক পুরস্কার বণ্টন নয়; বরং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, দলীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার একটি কৌশলও হতে পারে। সরকারের প্রথম কয়েক মাসই দেখাবে এই কাঠামো কতটা স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম।

‎বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় দুই নারী নেতা—দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার প্রাধান্য ছিল। সেই ধারাবাহিকতার পর একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের আগমনকে অনেকে প্রতীকী পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তবে এর গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক প্রজন্মের পরিবর্তন এবং ক্ষমতার বর্ণনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

‎একই সঙ্গে এই ক্ষমতা পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের মেরুকৃত রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব কীভাবে বিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করবে এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিবেশ তৈরি করবে, তা ভবিষ্যতের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি নতুন সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল গ্রহণ করে, তবে দ্বন্দ্বপূর্ণ রাজনীতিকে কিছুটা হলেও নরম করা সম্ভব; অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

‎নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গুর পরিস্থিতি কাটিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সংবিধান সংস্কার এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা নতুন সরকারের বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হবে।

‎সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতি করার পর ক্ষমতায় এসে নীতির বাস্তবায়ন সবসময় কঠিন হয়ে ওঠে। জনগণের আশা দ্রুত ফল দেখতে চায়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা সময়সাপেক্ষ। এই ব্যবধান যত দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করা যাবে, তত দ্রুত নতুন সরকার রাজনৈতিক বৈধতা দৃঢ় করতে পারবে।

‎বাংলাদেশের ইতিহাস দেখিয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তন সবসময় নতুন আশা নিয়ে আসে। কিন্তু সেই আশা বাস্তবে রূপ নিলে তা নির্ভর করে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই শুধু সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগও রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই সুযোগ কতটা বাস্তব পরিবর্তনে পরিণত হয়।

‎লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমানের সামনে বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

রেলকে বাঁচাতে ইঞ্জিন সংকটের সমাধান খুব জরুরী

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়

মহাশিবরাত্রি: পরম চেতনার জাগরণ ও শিবত্বে উত্তরণ

ক্ষমতা হাতে, প্রত্যাশার চাপ সামনে: সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত করবে?

হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?

জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়

নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক

তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন

ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর

আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি