ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে
সরকার পরিচালনায় অর্থ দরকার আর সেই অর্থের যোগান আসে ট্যাক্স, ভ্যাটসহ নানারকমের করের মাধ্যমে। সরকারের যদি অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হয় তবে ট্যাক্স না বাড়িয়েও আদায় করা সম্ভব। সরকার যদি ঘুষ, দুর্নীতি কমাতে পারে তবে এমনিতেই রাজস্ব বাড়বে। রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হিসেবে অনেক সময় করের হার বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কর কাঠামোর ভেতরেই ফাঁকফোকর, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি থেকে যায়, তবে শুধু কর বাড়িয়ে কি সত্যিই রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব? নাকি এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পণ্যের দাম বাড়ে, জনজীবন সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়?
ধরা যাক অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমন একটি অবস্থান নিলেন যে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে করের হার বৃদ্ধি অপরিহার্য। বাস্তবতায় দেখা যায়, এ ধরনের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। কারণ ব্যবসায়ী যখন বাড়তি কর দেন, তখন সেই করের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপানো হয়। ফলে চাল-ডাল, তেল-চিনি, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, সবকিছুর দাম বাড়ে। জনজীবনে মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু কর না বাড়িয়েও কি রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব? উত্তর, হ্যাঁ, সম্ভব। তার প্রধান শর্ত হলো দুর্নীতি ও ঘুষ কমানো। আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা হলো কর ফাঁকি ও প্রশাসনিক অনিয়ম। অনেক সময় দেখা যায়, নির্ধারিত করের তুলনায় কম দেখিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর আদায়কারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা হয়। এতে রাষ্ট্র তার প্রাপ্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ সমস্যা করের হারে নয়; সমস্যা কর আদায়ের প্রক্রিয়ায়।
ঘুষ একটি অদৃশ্য করের মতো কাজ করে। এটি সরকারি কোষাগারে জমা হয় না, বরং ব্যক্তিগত পকেটে যায়। যখন একজন ব্যবসায়ী ঘুষ দিয়ে কম কর পরিশোধের সুযোগ পান, তখন রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার সৎ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তিনি নিয়ম মেনে কর দেন, কিন্তু অসৎ ব্যবসায়ী কম খরচে ব্যবসা চালিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যান। এতে বাজারব্যবস্থায় অসমতা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে কর বাড়ানো মানে হলো দুর্নীতির পরিমাণও বাড়ানো। কারণ করের হার যত বাড়বে, কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতাও তত বাড়বে। মানুষ তখন বৈধ পথে নয়, অবৈধ পথ খুঁজবে। ফলে কর প্রশাসনের ভেতরে ঘুষের পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। এভাবে কর বাড়ানো একধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করে, কর বাড়ে, পণ্যের দাম বাড়ে, মানুষ অসন্তুষ্ট হয়, কর ফাঁকি বাড়ে, ঘুষ বাড়ে, রাজস্ব প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না।
বাংলাদেশের এনবিআর এর অীধন রাজস্ব আহরণের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে কর কম আদায় করা হয়। দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনৈতিক ফায়দার মাধ্যমে সরকারকে ফাঁকি দিয়ে নিজেরা কোটি টাকা আয় করছেন। কিন্তু এই ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হলে যথাযথ রাজস্ব আদায় হলে এমনিতেই সরকারের আয় বাড়বে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব ফাইলে ২৬ কোটি টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ কোটি টাকা। ঘুষের কারণে ২০ কোটি টাকা ঘায়েব, বর্তমান মেয়র শাহাদাতের বিচক্ষণতায় বিষয়টি ধরা পড়লেও অধরা রয়েছে এমন হাজারো ফাইল। শুধু এসব দপ্তরই নয়, সরকারী যেকোন দপ্তরেই কমবেশি ঘুষ বাণিজ্যের ফলে সরকারি অর্থ তছরুপ করার ঘটনা ঘটছে। ফলে দেশের অর্থনীতি আরো সচল করতে ট্যাক্স বৃদ্ধি নয় প্রয়োজন সচেতনতা ও সততা। সংশ্লিষ্টরা সৎ হলে অর্জিত রাজস্ব খরচ করে শেষ করাটাই কষ্টসাধ্য হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে করের পরিধি এখনো তুলনামূলক সীমিত। অনেক সম্ভাবনাময় খাত এখনো করের আওতার বাইরে। কিন্তু এই খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে যদি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হয়, তবে তা ন্যায্যতা হারায়। বরং কর নেট সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, অনলাইন রিটার্ন, স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্নীতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ মানবিক হস্তক্ষেপ কমলে ঘুষের সুযোগও কমে।
একটি উদাহরণ ধরা যাক, কাস্টমস বা আমদানি-রপ্তানি খাত। এখানে পণ্যের ঘোষিত মূল্য কম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়, এমন অভিযোগ বহুদিনের। যদি কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হয়, আন্তর্জাতিক ডাটাবেসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তবে ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারমূল্যের তুলনা করা সহজ হবে। এতে রাজস্ব ফাঁকি কমবে। একইভাবে ভ্যাট ব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) কার্যকরভাবে চালু করা গেলে বিক্রির প্রকৃত হিসাব পাওয়া সম্ভব। এতে কর আদায় বাড়বে, কিন্তু করের হার বাড়াতে হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। যদি প্রভাবশালী কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষও অনুপ্রাণিত হবে না। আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়াতে হবে; একই সঙ্গে তাদের ন্যায্য বেতন ও প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে ঘুষ নেওয়ার প্রলোভন কমে।
কর বাড়ালে স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব বাড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে। উচ্চ কর ব্যবসায় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও উচ্চ কর ও দুর্নীতিপ্রবণ পরিবেশে আগ্রহ হারায়। ফলে কর্মসংস্থান কমে যায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়। অথচ যদি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব বাড়বে।
মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কর বাড়ালে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে। উৎপাদক সেই বাড়তি খরচ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। নিম্নআয়ের মানুষ তাদের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খায়। সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে। সরকারের জনপ্রিয়তা কমে। রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ কর বৃদ্ধির প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, ঘুষ কমানো গেলে কী হয়? প্রথমত, রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রাপ্য রাজস্ব আদায় হয়। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক পরিবেশে সমতা আসে। তৃতীয়ত, সৎ করদাতারা উৎসাহিত হন। চতুর্থত, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে। পঞ্চমত, পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ে না। অর্থাৎ ঘুষ কমানো মানে কেবল নৈতিক উন্নয়ন নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি।
তবে ঘুষ কমানো সহজ নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা। এর জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণআন্দোলনও প্রয়োজন। মিডিয়ার স্বাধীন ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের কর দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, তারা যেন বুঝতে পারে, কর দেওয়া মানে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা। কিন্তু সেই মানসিকতা তখনই তৈরি হবে, যখন তারা দেখবে তাদের করের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে।
রাষ্ট্র যদি প্রথমে নিজের ঘর গোছায়, অর্থাৎ অপচয় কমায়, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ করে, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা আনে, তবে জনগণও কর দিতে উৎসাহিত হবে। সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোও রাজস্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ জনগণ যখন বিশ্বাস করবে যে তাদের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমবে।
সর্বোপরি বলা যায়, রাজস্ব বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি করের হার নয়; কর প্রশাসনের সততা ও দক্ষতা। কর বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো একটি সহজ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এর ফলে দুর্নীতি কমবে না; বরং বাড়তে পারে। পণ্যের দাম বাড়বে, জনজীবন বিপর্যস্ত হবে, সরকারের বদনাম হবে। কিন্তু ঘুষ কমাতে পারলে, কর ফাঁকি রোধ করতে পারলে, কর নেট সম্প্রসারণ করতে পারলে, রাজস্ব স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
অতএব, নীতিনির্ধারকদের উচিত রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল পুনর্বিবেচনা করা। কর বাড়ানো নয়, বরং ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে রাষ্ট্র যেমন আর্থিকভাবে শক্তিশালী হবে, তেমনি জনজীবনও স্বস্তি পাবে। আর তখনই সত্যিকার অর্থে বলা যাবে, ট্যাক্স না বাড়িয়েও রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব, যদি ঘুষ কমানো যায়।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে
ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পতন অনিবার্য
৬ মাসের সময়সীমা বনাম ৬০ দিনের ধৈর্য: শাসন, সংকট ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে
দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না—কারণ রাষ্ট্র নয়, রাজনীতিই তার আশ্রয়
পতাকাহীন গাড়ি, সাইরেনহীন পথ: বাংলার ধূলোমাখা পথে এক নিঃসঙ্গ কর্মবীর তারেক রহমানের পদধ্বনি
তারেক রহমানের বিজয় ইতিহাসে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমানের সামনে বাস্তবতা ও প্রত্যাশা
রেলকে বাঁচাতে ইঞ্জিন সংকটের সমাধান খুব জরুরী
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়
মহাশিবরাত্রি: পরম চেতনার জাগরণ ও শিবত্বে উত্তরণ