ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা


রায়হান আহমেদ তপাদার  photo রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশিত: ১-৩-২০২৬ দুপুর ৪:১৩

বিশ্বনিরাপত্তার ইতিহাসে আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। ইরান ইসরায়েলের বিরোধ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উত্তেজনায় ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্ব জোড়ে। অধিকাংশ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকা। কোথাও অর্থ-অস্ত্র সাহায্য, কোথাও সরাসরি অথবা কোথাও নীতিগতগতভাবে সমর্থন জানাচ্ছে তারা। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটি তাদের নিশ্চিত করেছে তা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র ইসরায়েলের হাতে থাকবে। আবার ইসরায়েলের মাথার ওপরে বসে আছে যুক্তরাষ্ট্র। পরোক্ষভাবে আমেরিকার একচেটিয়া আগ্রাসন চলবে মধ্যপ্রচ্যে যেখানে একমাত্র বাধা ইরান। সুতরাং তাকে ধ্বংস করতে হবে। এই যখন অবস্থা, তখন যুদ্ধ পরিস্থিতি হঠাৎ করে ভিন্নমাত্রা ধারণ করতে পারে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইরান এবং ইসরায়েলের বাইরে দুদেশের সমর্থনে থাকা রাষ্ট্রগুলো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে তখন তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। মূলত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ইরানের তেল শক্তি। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর যে নীতি, অনুমান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আপেক্ষিক বৈশ্বিক স্থিতি নিশ্চিত করেছিল, তা এখন মোচড় খাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে।এই দশকে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যতে কি আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিরোধে গড়ে উঠবে, নাকি স্বৈরতান্ত্রিক আগ্রাসন আরও বিস্তার লাভ করবে-তা এই দশকেই নির্ধারিত হবে। বিশ্বব্যবস্থায় এই মহারূপান্তর ঘটার পেছনে যে বড় পরিবর্তন কাজ করছে। তা হচ্ছে- বিশ্ব এখন নিছক নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতে চলে এসেছে। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপ মহাদেশে আবার যুদ্ধ ফিরিয়ে এনেছে।
একই সঙ্গে অন্য স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা পুরোনো নিরাপত্তা ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। চীন সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রভাব ও সাইবার অভিযানের মাধ্যমে ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলের কৌশলগত চিত্র পাল্টাতে চাইছে।এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার কিছু ঐতিহ্যগত মিত্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক মিত্রদেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত ধারণা পুনর্বিবেচনা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতি, সমাজ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে দ্রুত বদলে দিতে শুরু করেছে। যে দেশ এই প্রযুক্তিকে সবচেয়ে দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারবে, সে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত-উভয় ক্ষেত্রেই নির্ণায়ক সুবিধা পাবে। যুদ্ধ এখন তথ্যকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।এখানে গতি,নির্ভুলতা ও নেটওয়ার্কভিত্তিক ব্যবস্থার নমনীয়তাই হচ্ছে মূল শক্তি। নিছক বলপ্রয়োগের চেয়ে অভিযোজনক্ষমতাই এখন বড় কৌশলগত সম্পদ। এই বাস্তবতার মুখে পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে থাকলে চলবে না। দেশগুলোকে পরিবর্তনগুলো স্বীকার করে প্রস্তুতি নিতে হবে। ইউরোপ ও এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আত্মতুষ্টি কাটিয়ে তারা নিরাপত্তাকৌশল হালনাগাদ করেছে এবং প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ সংকটের দিকে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন বিশ্বের রাজধানীগুলো, সংবাদকক্ষ এবং নীতিনির্ধারণী মহলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেটি হলো চীন কি ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে? যদি আসে, সেই সাহায্য কেমন হবে? এর উত্তরটি প্রচলিত সামরিক জোটে দুই পক্ষের একটিতে থাকা-এই দ্বিমাত্রিক ধারণাকে ভেঙে দেয়। চীন সরাসরি সেনা পাঠাবে বা কোনো যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়াবে-এ সম্ভাবনা কম। 
কিন্তু এটাকে নিষ্ক্রিয়তা বলে ধরে নেওয়া হলে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রকৃতি ভুলভাবে বোঝা। ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন বাস্তব, বহুস্তরীয় এবং সামরিক হস্তক্ষেপের তুলনায় বেশ টেকসই। এটি কেবল ভিন্ন একটি কৌশলগত পরিসরে পরিচালিত হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন নিয়মিতভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। নীতির ওপর দাঁড়িয়ে চীন তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে। গত মাসে জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘে চীনের দূত সান লেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কঠোরভাবে বলেন, ‘বলপ্রয়োগ কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি সমস্যাকে আরও জটিল ও দুরূহ করে তুলবে। যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি অননুমেয় অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।’এটা নিছক কথার কথা নয়। চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা সংরক্ষণে সমর্থন করে।জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে চীন তেহরানকে একটি অমূল্য সুবিধা দিচ্ছে। সেটি হলে বিশ্বমঞ্চে ইরানকে বৈধতা প্রদান এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পাল্টা বয়ান তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই নয়। কয়েক দশকের পারমাণবিক বিরোধ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, এমন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনা শুরু করেছিল। কিন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আরও বাস্তব বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার খবর এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মিডল ইস্ট আই গত বছর জানায়, ইরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য চীনে তৈরি ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পেয়েছে। 
এটি ছিল তেলের বিনিময়ে অস্ত্র চুক্তির অংশ। এর মাধ্যমে তেহরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে উগ্রবাদী নেতানিয়াহু সরকার বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যেকোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে। শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করলে হবে না। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্যও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ইরান বলেছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তারা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি হয়নি।তেহরান আরও বলেছিল, যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা নিজেদের রক্ষা করবে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল, যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখান থেকে হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দিয়েছিল, যা ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ। তেহরান তখন কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল-উদাইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছিল। পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবি করে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। যদিও তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে। দুই হাজার পঁচিশ-চাব্বিশ সালের তথ্যানুযায়ী, ইরানের তেলের মজুদ প্রায় ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। যা বিশ্বের মোট তেল মজুদের প্রায় ১১.৮২ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ তেল মজুদের কারণে ইরান বিশ্বের শীর্ষ ৩ বা ৪টি তেলসমৃদ্ধ দেশের অন্যতম। দেশটির প্রধান খনিজ সম্পদগুলো খুজস্তান এবং পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে রয়েছে। 
ফলে ইরানকে পরাস্ত করতে পারলে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যে একক আধিপত্য নয়, দেশটির তেল এবং খনিজ সম্পদ খুবলে নেওয়া যাবে। তখন ইসরায়েল যেমন তেমন, যুক্তরাষ্ট্রই হবে সর্বেসর্বা। কিন্তু সমস্যা হবে অন্য জায়গায়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরান চীনের কাছে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। এটি তাদের মোট রপ্তানির ৮০%-এরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্পর্ক আদা-কাঁচকলায়। যদি ইরানের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়, তখন চীন কী করবে? এই যুদ্ধে চীন এবং রাশিয়া পরোক্ষভাবে ইরানের পাশে থাকলেই যত ভয়! সব পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হলে, পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় তা সময়ই বলে দেবে। 
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য 

এমএসএম / এমএসএম

শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র: মানবপ্রেম, আত্মজাগরণ ও সুন্দর সমাজের স্বপ্ন

সরকারি হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজ

মিরকাদিমের ধবল গরু: ভবিষ্যতের জিনগত সম্পদ

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা

কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

৪১ দিন থেকে ৩০ বছর—নতুন সমঝোতার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ

মহাসাধক ​বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী: অলৌকিক সাধনা ও বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয়

​শুভ জন্মাষ্টমী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: সম্প্রীতির আলোয় ঘুচুক অন্ধত্ব

জাতীয় সংকটে আস্থার ঠিকানা জিয়া পরিবার

বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা: শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া

ইস্টার্ন রিফাইনারি: ৮ হাজার কোটি থেকে ৩৫ হাজার কোটি—দেড় যুগের অপেক্ষার মূল্য আর কত?