ঢাকা শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

নতুন সংসদ, নতুন সাংসদ: প্রস্তুতির রাজনীতিতে বিএনপির নতুন অধ্যায়


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ৭-৩-২০২৬ দুপুর ৩:৪৬

‎বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে প্রতিটি নতুন সংসদ শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নয়, বরং নতুন প্রত্যাশা, নতুন বিতর্ক এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য যে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে, সেটি এই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।‎

‎রাজনীতিতে ‘প্রশিক্ষণ’ শব্দটি অনেক সময় অপ্রচলিত বা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি একটি স্বীকৃত ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যের UK Parliament নতুন এমপিদের জন্য ওরিয়েন্টেশন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে, যেখানে সংসদের কার্যপ্রণালী, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং কমিটি ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। একইভাবে ভারতের Lok Sabha Secretariat নবনির্বাচিত সাংসদদের জন্য বিশেষ ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি আয়োজন করে, যাতে তারা সংসদীয় বিধি, বিতর্কের নিয়ম এবং বাজেট প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পান।

‎এর মূল কারণ হলো সংসদে নির্বাচিত হওয়া মানেই কেবল রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, বাজেট বিশ্লেষণ এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এসব বিষয়ে দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অপরিহার্য। তাই অনেক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচিকে সংসদীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

‎এবারের নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ২০৯ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। অর্থাৎ তাদের জন্য সংসদের বিধি-বিধান, কার্যপ্রণালী এবং সংসদীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই দলটি তাদের সাংসদদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে।

‎গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালার উদ্বোধন করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব **মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর**সহ দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালায় সংসদের কার্যপ্রণালী, আচরণবিধি, বিল প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, বাজেট সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ এবং সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হবে।

‎গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদকে অনেক সময় “জাতির বিতর্কের কেন্দ্র” বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংসদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। অনেক সময় সংসদের বিতর্ক রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে, আইন প্রণয়ন বা নীতি বিশ্লেষণের গভীরতা সেখানে কম দেখা যায়। ফলে নতুন সাংসদদের সংসদীয় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখা যেতে পারে।

‎সংসদীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। প্রবীণ সংসদ সদস্যরা জানেন কখন কীভাবে বক্তব্য দিতে হয়, কোন বিধি ব্যবহার করে আলোচনায় অংশ নিতে হয়, কিংবা কীভাবে একটি বিলের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করতে হয়। নতুন সাংসদদের জন্য এসব বিষয় শেখা সময়সাপেক্ষ। তাই অভিজ্ঞ সাংসদদের কাছ থেকে সরাসরি অভিজ্ঞতা শোনার সুযোগ তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে।

‎তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও আছে। শুধু প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করলেই কি সংসদ কার্যকর হয়ে উঠবে? বাস্তবতা হলো, সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর। সংসদে ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকলে কিংবা বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হলে প্রশিক্ষণ দিয়ে খুব বেশি পরিবর্তন আনা কঠিন।

‎এছাড়া সংসদে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। নতুন সাংসদরা অনেক সময় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন ভাষা এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আসতে পারেন। যদি তারা সংসদের কার্যপ্রণালী ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারেন, তাহলে সংসদীয় বিতর্ক আরও প্রাণবন্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

‎রাজনীতির আরেকটি দিকও এখানে লক্ষণীয়। বিএনপির এই উদ্যোগ শুধু সাংসদদের প্রশিক্ষণ নয়, এটি দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শনেরও একটি অংশ। নির্বাচনের পর একটি বড় সংসদীয় দল হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত ও সুসংগঠিত দেখানোর রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।

‎আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে ১২ মার্চ। সেই অধিবেশনেই মূলত বোঝা যাবে নতুন সাংসদদের এই প্রস্তুতি সংসদের বিতর্ক ও আলোচনায় কতটা প্রতিফলিত হয়। সংসদ যদি সত্যিকার অর্থে নীতি নির্ধারণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, তাহলে এই ধরনের প্রশিক্ষণ উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

‎সবশেষে বলা যায়, গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচনে নয়, সংসদের কার্যকারিতায়ও নিহিত। নতুন সাংসদদের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন সেই কার্যকারিতার পথে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন সময়ই বলে দেবে, এই প্রস্তুতি কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।

‎লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

নতুন সংসদ, নতুন সাংসদ: প্রস্তুতির রাজনীতিতে বিএনপির নতুন অধ্যায়

দক্ষ জাতি গঠনের নতুন দিগন্ত: ১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে?

‘ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে আমরা পক্ষভুক্ত নই’- ইরানের হামলা নিয়ে ইউএইর অবস্থান: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে

ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পতন অনিবার্য

৬ মাসের সময়সীমা বনাম ৬০ দিনের ধৈর্য: শাসন, সংকট ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে

দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না—কারণ রাষ্ট্র নয়, রাজনীতিই তার আশ্রয়

পতাকাহীন গাড়ি, সাইরেনহীন পথ: বাংলার ধূলোমাখা পথে এক নিঃসঙ্গ কর্মবীর তারেক রহমানের পদধ্বনি

তারেক রহমানের বিজয় ইতিহাসে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমানের সামনে বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

রেলকে বাঁচাতে ইঞ্জিন সংকটের সমাধান খুব জরুরী