ঢাকা সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ক্ষমতা হাতে, প্রত্যাশার চাপ সামনে: সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত করবে?


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ১৫-২-২০২৬ দুপুর ১১:৩৫

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না, যখন একটি নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সেই বিরল মুহূর্তগুলোর একটি। এটি কেবল একজন নেতার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়; বরং এমন এক নেতৃত্বের উত্থান, যাকে এখন জাতীয় পর্যায়ের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে।

 

বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরেই দলের কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে তার নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল তাকে দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু ক্ষমতা গ্রহণের নয়; বরং সেই ক্ষমতাকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক আস্থা পুনর্গঠন এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থায় রূপ দেওয়া যায়। এই মুহূর্তে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি, নেতৃত্বের ধরন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে গেছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই হবে সময়ের কাছে পরীক্ষিত।

 

তারেক রহমান এখন এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাকে আর শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান বা দলীয় রাজনীতির পরিসরে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না; বরং জাতীয় নেতৃত্বের মানদণ্ডেই বিচার শুরু হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে অল্প সময়ের মধ্যে নিরঙ্কুশ নির্বাচনী বিজয় তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, তবে সেই ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে কঠিন বাস্তবতার চাপও। জনমত দ্রুত দৃশ্যমান ফলাফল প্রত্যাশা করছে, আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদি বৈধতা নির্ভর করে কার্যকর নেতৃত্ব, নীতি বাস্তবায়ন এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।

 

প্রথম বড় পরীক্ষা হবে সংসদ পরিচালনায় তারেক রহমানের নেতৃত্বের ধরন। শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা একদিকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে বিতর্ক ও ভিন্নমতের পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ায়, ফলে সংসদ নীতিগত আলোচনার সক্রিয় মঞ্চের বদলে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য সংসদ গড়ে তুলতে হলে বিরোধী মতকে অন্তর্ভুক্ত করা, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে প্রকৃত রাজনৈতিক সংলাপের কেন্দ্রে নিয়ে আসা জরুরি। তা না হলে সংখ্যার শক্তি থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

 

মন্ত্রিসভা গঠন হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের আরেকটি বড় পরীক্ষা এবং প্রথম স্পষ্ট বার্তা। এখানে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতার ভারসাম্য কতটা রাখা হয়, সেটিই তার সরকারের স্থিতিশীলতা এবং কার্যকারিতার মূল সূচক। দক্ষতা নির্ভর মন্ত্রিসভা শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা ও বিনিয়োগের পরিবেশও সুদৃঢ় করতে সাহায্য করবে- বিশেষ করে যখন অর্থনৈতিক চাপ বেশি এবং মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।

 

অর্থনৈতিক বাস্তবতা নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে জনপ্রিয় সামাজিক কর্মসূচি এবং কঠিন অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। শুধু স্বল্পমেয়াদি সহায়তা নয়, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে।

 

এদিকে সামাজিক প্রেক্ষাপটও দ্রুত বদলে গেছে। তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও স্পষ্ট, সচেতন এবং দাবি-নির্ভর। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে তারা বিশেষভাবে নজর রাখবে। তাদের কাছে রাজনৈতিক প্রতীক বা স্লোগানের চেয়ে দৃশ্যমান ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতা নতুন নেতৃত্বের জন্য যেমন বড় সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে দ্রুত আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিবে।

 

সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন রয়ে গেছে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানো সম্ভব হবে কি না। দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতির ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনআস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, যা পুনর্গঠন করা নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা। প্রতিশোধমূলক রাজনীতির পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংলাপভিত্তিক পথ বেছে নেওয়া গেলে তা শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক সংস্কারের ভিত্তিও তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিএনপির বিশাল সংগঠন কাঠামোর নেতাকর্মীদের নৈতিক মানদণ্ডে পরিচালনা করা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দলীয় শক্তিকে জনগণের সেবামুখী উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম কঠিন ও নির্ধারক চ্যালেঞ্জ।

 

এরপর আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে নতুন সরকার, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতির সংস্কার প্রশ্নে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রশাসনিক মারপ্যাঁচ ও দুর্নীতিপ্রবণতার অভিযোগ মোকাবিলা করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে জনসেবামুখী করে তোলা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি শুধু তারেক রহমানই নয়, তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানও বিভিন্ন সময় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

 

এই মুহূর্তে তারেক রহমানের সামনে দুটি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো প্রচলিত ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতির পথ, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেবল নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং চাটুকারিতা ও তোষামোদী সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সরকারকে জনমুখী অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। অন্যটি হলো কাঠামোগত সংস্কারের পথ, যেখানে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, নীতি-ভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুনভাবে বিকশিত হয়। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী নেতৃত্ব সাধারণত দ্বিতীয় পথ অনুসরণকারী নেতাদের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায়- যা তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত করার সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করতে পারে। 

 

তাই জনাব তারেক রহমানকে সামনে থাকা এসব বাস্তবতা ও জটিল চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখে এগোতে হবে। নির্বাচন কেবল সূচনা মাত্র; ক্ষমতা হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাশার চাপও বহুগুণে বেড়েছে। এখন জাতীয় নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা শুরু হয়েছে, যেখানে আবেগ নয়, বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থানই তাকে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করবে। তার জন্য মূল প্রশ্ন হলো, তিনি কতটা বুদ্ধিবৃত্তিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বাস্তবসম্মত কৌশলের মাধ্যমে নেতৃত্বের গভীরতা প্রমাণ করতে পারেন, এবং জাতীয় স্বার্থকে দলীয় সীমারেখার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারেন।

 

জনগণের বাস্তব চাহিদা স্পষ্ট: কার্যকর আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসেবামুখী প্রশাসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, কিন্তু সত্যিকারের জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত হওয়া নির্ভর করবে তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা, বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদীয় সংলাপ প্রতিষ্ঠা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।

 

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়

মহাশিবরাত্রি: পরম চেতনার জাগরণ ও শিবত্বে উত্তরণ

ক্ষমতা হাতে, প্রত্যাশার চাপ সামনে: সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত করবে?

হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?

জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়

নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক

তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন

ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর

আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি

এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ

চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচাতে হবে, বাড়াতে হবে কাজের গতি