ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ১২-২-২০২৬ রাত ১২:১১

১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। হ্যাঁ‑না ভোটের আগে বাংলাদেশে ভোটারদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত প্রশ্ন রয়েছে। এটি কেবল প্রার্থীর জন্য নয়, বরং দেশের মানবাধিকার, সামাজিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তের পরীক্ষা। বিশেষত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে LGBTQ অধিকার। হ্যাঁ ভোট জয় মানেই কি এই অধিকার বাস্তব হবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে থেকে যাবে, এই প্রশ্ন এখন নাগরিকদের বিবেকের সামনে।

LGBTQ মূলত মানুষের যৌন অভিমুখ এবং লিঙ্গ পরিচয়ের ভিন্নতাকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার এবং কুইয়ার বা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিরা। এটি মানুষের পরিচয়ের একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস। কোনো জীবনধারা বাধ্যতামূলক করা হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি একটি নাগরিক ও মানবাধিকার বিষয়।

বিভিন্ন দেশে LGBTQ অধিকার বাস্তবায়নের ধরন ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, কানাডা ২০০৫ সালে সমকামী বিবাহ বৈধ করেছে এবং চাকরি ও সেবার ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণীত। স্পেনেও সমকামী বিবাহ ও লিঙ্গ পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া সহজ এবং স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট সমকামী বিবাহ বৈধ ঘোষণা করলেও, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আইন ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতায় পার্থক্য বিদ্যমান। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মরক্কোসহ বেশিরভাগ মুসলিম দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আইনগত বা সামাজিকভাবে LGBTQ অধিকার সীমিত। ধর্মীয় বিধি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক কাঠামো এখানে মূল বাধা।

বাংলাদেশে হ্যাঁ‑না ভোটের প্রেক্ষাপটও জটিল। হ্যাঁ ভোট কেবল রাজনৈতিক সংকেত দেয়; স্বয়ংক্রিয়ভাবে LGBTQ অধিকার বাস্তব হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। দেশে এখনো কোনো জাতীয় আইন বা সংবিধান সংশোধনী নেই যা এই অধিকার নিশ্চিত করবে। তাই ভোটারদের সামনে কেবল প্রার্থীর নির্বাচনের বিষয় নয়, দেশের সামাজিক ও মানবাধিকার নীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের মানসিক অবস্থানও যাচাই হয়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জুলাই সনদ এবং ৮৪ নম্বর ধারা গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মন্ত্রিপরিষদে Open Government Partnership (OGP)-এর সদস্য হবে। এই সিদ্ধান্তে ২৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হলেও কিছু দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। সনদের বেশিরভাগ ধারা দেশের স্বার্থে ইতিবাচক- স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রশাসন সংস্কার, দুর্নীতি কমানো এবং মানবাধিকার রক্ষা। তবে ৮৪ নম্বর ধারা বিতর্কিত। এটি ধর্মীয় অনুভূতি ও রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন করেন, এই ধারা রাখা কি প্রয়োজন ছিল, নাকি এটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

ভোটারদের বিবেচনা মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথম, হ্যাঁ ভোট কি সত্যিই মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি বাস্তবায়ন করবে। দ্বিতীয়, জুলাই সনদে OGP-এ সদস্য হওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং বিতর্কিত ৮৪ নম্বর ধারা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। তৃতীয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে ভারসাম্য রাখা কতটা সম্ভব। এই তিনটি প্রশ্ন ভোটারদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং প্রার্থীর সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করার সুযোগ দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলোতে মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি অনেকাংশে আইনি ও সামাজিকভাবে প্রণীত। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও বেশিরভাগ মুসলিম দেশে আইন, ধর্ম এবং সামাজিক কাঠামো যৌনতা ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে সীমিত করেছে। বাংলাদেশ যদি OGP-এ যোগ দেয়, তা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গীকার। তবে বাস্তবায়ন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে ইসলামিক নৈতিকতা গভীরভাবে প্রভাবিত। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমকামী সম্পর্ক সাধারণত নিষিদ্ধ এবং লিঙ্গ পরিবর্তন বা ট্রান্সজেন্ডার বিষয়গুলোও সমাজ ও ধর্মীয় নৈতিকতার আলোকে সীমাবদ্ধ।

আইনগতভাবে, বাংলাদেশে LGBTQ সম্পর্ক বা সমকামী বিবাহ বৈধ নয়। ফৌজদারি আইন এখনও সমকামী যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। কিছু সামাজিক নীতি ও ট্রান্সজেন্ডার স্বীকৃতি থাকলেও আইনগত অধিকার দেওয়া এখনো সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে, হ্যাঁ‑না ভোটে হ্যাঁ জয় মানেই LGBTQ অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তব হবে- এটি সঠিক নয়। ভোট কেবল রাজনৈতিক সংকেত। বাস্তবায়ন সরকারি নীতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভর করবে।

জুলাই সনদের ৮৪ নম্বর ধারা: যাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ OGP এর সদস্য হবে, যা বেশ বিতর্কিত। এটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সনদে এই ধারা রাখা না হয়েও জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সংস্কার সহজে নিশ্চিত করা যেত।

সংক্ষেপে, হ্যাঁ‑না ভোট কেবল রাজনৈতিক সংকেত। বাংলাদেশে LGBTQ অধিকার বাস্তবায়নের পথ এখনও সীমিত। ৮৪ নম্বর ধারা রাখার প্রয়োজন ছিল না এবং এটি ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

শেষ পর্যায়ে বলা যায়, হ্যাঁ‑না ভোটের ফলাফল কেবল সংকেত। বাংলাদেশে LGBTQ অধিকার বাস্তবায়নের পথ এখনো অনিশ্চিত। ভোটাররা সেই মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাদের ভোট শুধু নির্বাচন নয়, দেশের গণতান্ত্রিক নীতি, মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের পরীক্ষা।

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক

এমএসএম / এমএসএম

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান