তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়
দীর্ঘ সতের বছর প্রবাস জীবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারেক রহমান তার আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হিসেবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।প্রবাসে থেকেও তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম-খুন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে অবহিত করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশ ইস্যু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে। তারেক রহমান ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দল, থিংক ট্যাংক ও সিভিল সোসাইটির সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। এসব সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি বিএনপিকে একটি দায়িত্বশীল, গণতান্ত্রিক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন গঠন তার বৈদেশিক প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরি করা। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, নির্বাচন সহায়তা সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা তার কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তারেক রহমান সবসময়ই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছেন এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের তিনি কেবল ভোটব্যাংক নয়, বরং একটি কূটনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেছেন। বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের সংগঠিত করে তিনি লবিং, জনমত গঠন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, যা বিএনপির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করেছে। তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নীতি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট রূপরেখা দেয়-যেখানে বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক, মানবাধিকার-সম্মানিত, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র। সার্বিকভাবে বলা যায়, দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তারেক রহমান কেবল দলীয় নেতৃত্বই দেননি, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।তার ভূমিকা ও বৈদেশিক নীতিকে সুপরিকল্পিত, নীতিনিষ্ঠ এবং জাতির ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক করে তুলেছেন। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয়ের রেকর্ড হয়ে দাঁড়ালো। মাত্র দেড় মাস আগে লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর তারপরই এমন বিজয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অর্জন বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এককভাবে নির্বাচনে বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যা সরকারের নেতৃত্ব ও নীতি প্রণয়নে একটি শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তারা বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পরে লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা ও নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য কতটা আকাঙ্ক্ষা পুষিয়ে রেখেছিল। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তারেক রহমানের বিজয়কে ভূমিধস জয় উল্লেখ করেছে। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, বিএনপির এই সাফল্য আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন সরকারের কার্যক্রম অঞ্চলীয় শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রতিবেদনে বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যথেষ্ট স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারা মনে করছে, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও জনগণ নির্দলীয়ভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে, যা দেশে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এবার পুরোপুরি পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। বিএনপির জয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভারসাম্য ও সরকারের নীতিতে নতুন দিকনির্দেশ প্রদান করবে। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, নির্বাচনে এই ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দেশ। তারা বিশ্লেষণ করেছে, নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণে আঞ্চলিক শক্তি সমীকরণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির এই জয় শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থানকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে পাকিস্তান, ভারত ও চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো নতুন সরকারের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হবে। চব্বিশের জুলাই নতুন এক তাগিদ তৈরি করেছে বাংলাদেশের এই জমিনে। ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগে নতুন প্রেক্ষাপট রচিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নানা সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে সিরিজ প্রস্তাবনা শেষে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়েও শেষতক ছিল দ্বিধা। কী হবে না হবে? তবে বাস্তবতা হচ্ছে কোনোরকম রক্তপাত, হানাহানি ছাড়াই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অনন্য নজির। নিঃসন্দেহে এই ভোট উৎসবের জন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন ইউনূস প্রশাসন এবং নাসির কমিশন। এবারের নির্বাচনে লক্ষণীয় ছিল একইসঙ্গে দু’টি ব্যালট। একটি গণভোট, অন্যটি জাতীয় নির্বাচন। ভোটের ব্যালটে লক্ষণীয় ছিল তারুণ্যের জোয়ার। দলমতনির্বিশেষে প্রত্যাশিত জনরায় দিয়েছে বিএনপি জোটকে। আর সেই জয়ের নায়ক একজনই- তারেক রহমান। ডানপিটে, অবাধ্যতার খোলস ছাড়িয়ে যিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। নিয়ে গেছেন সাধারণের কাতারে। অগুনতি মানুষের হৃদস্পন্দন আর অনুভূতিকে ধারণ করে জয় পেয়েছেন লাইনচ্যুত ট্রেনকে ট্র্যাকে তোলার। হুইসেল বাজাবার। এগিয়ে যাবার। এই জয় এসেছে একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পক্ষে।অথচ মাত্র দেড় মাস আগেও যিনি দেশে ফিরতে পারবেন কিনা- তা নিয়ে ছিল সংশয় আর দ্বিধা। ছিল এক গুচ্ছ শঙ্কা। নিরাপত্তার ছিল তীব্র ঝুঁকি।
সতের বছরের নির্বাসনের ক্লান্তি ছিল আপাদমস্তক। ফেরার পরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী মা বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ। শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনতার প্রতি অবিচল আস্থা নিয়ে এগিয়ে গেছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া দিনের প্রখর তাপ মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করে রাতের হিমেল কুয়াশাতেও অদম্য ছিলেন পথে প্রান্তরে, নির্বাচনের ময়দানে। প্রচারের ময়দানে প্রায় দু’ডজনের বেশি বড় জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। প্রচারণায় তিনি মানুষকে যুক্ত করেছেন,কাছে টেনেছেন দরদ দিয়ে।নির্বাচনের বৈতরণী সাফল্যের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছেন তারেক রহমান। কথার পৃষ্ঠে কথা আর যুক্তহীনতার বিপক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে মানুষের রায় নিজের পক্ষে নিয়েছেন। হাসিনার তিন টার্মের শাসন, জুলাই আন্দোলনের পরে তৈরি হওয়া নতুন প্রেক্ষাপটে এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে তারেক রহমানকে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলেও জুলাই আন্দোলনের রাজপথের সারথীরাই বসছে বিরোধী দলে। এরপর আলোচনায় আছে একগুচ্ছ সংস্কার কর্মসূচি। উচ্চকক্ষ আর নিম্নকক্ষ। এর বাইরে দেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, দুর্নীতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠার বাইরে নানান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। ইতিমধ্যেই সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছোট আকারের একটি মন্ত্রিসভা দিয়েই তারেক রহমান শুরু করতে চান নতুন বাংলাদেশের সূচনা। এর মধ্যদিয়ে তিনি বেশ কিছু রেকর্ডও গড়েছেন। পিতা ছিলেন প্রয়াত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মা বেগম খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার হলেও রাজনীতির পিচ্ছিল ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে একজন পরিণত তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশের।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য
এমএসএম / এমএসএম
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ঐতিহাসিক বিজয়
মহাশিবরাত্রি: পরম চেতনার জাগরণ ও শিবত্বে উত্তরণ
ক্ষমতা হাতে, প্রত্যাশার চাপ সামনে: সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের আইকনে পরিণত করবে?
হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়
নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক
তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন
ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর
আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি
এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ