গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে দেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল একটি দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। ওই দলিলের নাম জুলাই সনদ। এটি ছিল দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সঙ্ঘাতের পর সমঝোতার প্রতীক। সেখানে সংবিধান সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, দুই কামরার সংসদ ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক কাঠামোর সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। এই অঙ্গীকারকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয় ১৩ নভেম্বর।ওই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এরপর ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ জারি হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়। এর মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন পায় জুলাই সনদ। এতে বাংলাদেশকে ঘিরে জনমতে থাকে আশা; কিন্তু বাস্তব রাজনীতি জটিল। এখানে অঙ্গীকারের পাশাপাশি চলে অস্বীকারও। সংসদ নির্বাচন হলো। নতুন সরকার গঠন হলো; কিন্তু জুলাই সনদ ঢেকে গেল কুয়াশায়। সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেল ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। শুরু হলো বিতর্ক। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন না সরকারি দলের এমপিরা। তারা এই শপথের সাংবিধানিক ভিত্তি খুঁজে পেলেন না! জুলাই সনদকে জটিল এক মারপ্যাঁচের মধ্যে ফেলে দিলেন বিএনপির নেতারা। কিন্তু তারা যেই নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই নির্বাচনের বৈধতা সংবিধানে আছে কি না, সেই রসায়নের জের কী হতে পারে, সেটি তারা ভেবে দেখলেন না। তর্কের খাতিরে না হয় ধরে নিলাম, সত্যিই জুলাই সনদ নিয়ে সাংবিধানিক কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। তাহলে সেই প্রশ্নটা কি আগে তোলা যেত না?
যখন জুলাই সনদ তৈরি হচ্ছিল,যখন গণভোটের সিদ্ধান্ত হচ্ছিল, তখন কেন এ কথা বলা হয়নি! কিন্ত নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর কেন এই দ্বিচারিতা? এই প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল জারির পর এটিই আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে যাচ্ছে কি না সেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে জনগণের মধ্যে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথেই হওয়া সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি। এরপর আবার বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটে থাকা এনসিপি। সংসদ নির্বাচনে দল দুটি থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের সময় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি ওই শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন আদৌ আর হবে কি না, সেই আলোচনাও আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিএনপির নেতারা বলছেন, ‘রাজনৈতিকভাবে অনেক ধরনের বক্তব্য আসতে পারে। কিন্তু যেসব বিষয়ে আদালতে রিট হয়েছে, সেসব বিষয়ে আদালত থেকে কী নির্দেশনা আসে সেটিও সংসদকে আইন প্রণয়নের সময় বিবেচনায় নিতে হবে।’ ফলে জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতার প্রশ্নে আদালত থেকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে এবং এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক লড়াই কতদূর এগোয়, তার ওপর রাজনীতির গতি প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সব মিলিয়ে জুলাই সনদ প্রসঙ্গটিই সামনে রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।রিটে কী বলা হয়েছে, আদালত কী বলছে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। পরে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। তার ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। কিন্তু এরপর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের দুজন আইনজীবী। রিটে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারির আবেদন করেছিলেন তারা। একই সঙ্গে এই অধ্যাদেশ ও সনদের কোনো কার্যক্রম যাতে কার্যকর না হয়, সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া হয় রিটে। রিট আবেদনে বলা হয়, সংবিধানে গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদের কোনো বিধান নেই। আদালতের এ রুলের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়েই এ ধরনের রিট হওয়ার নজির বাংলাদেশে আছে। সে কারণেই বিরোধী দলগুলোর দিক থেকে এই রিটের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিএনপির অবস্থানও সে প্রশ্নকে জোরালো করেছে অনেকের মধ্যে।তাছাড়া রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতের বারান্দায় টেনে নেওয়া সমীচীন নয়।
অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির যে চেষ্টা হয়েছে, তার পরিণতি ইতিবাচক হয়নি বরং তা জাতীয় জীবনে বিভ্রান্তি ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে এমন প্রমাণও রয়েছে। সরকারের আচরণে প্রতীয়মান হচ্ছে যে রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চলছে। পরিকল্পিতভাবে রিট পিটিশন দায়ের করিয়ে পর্দার আড়াল থেকে ইন্ধন দেওয়া হলে তা হবে দ্বিচারিতা ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অঙ্গীকার ভাঙার উদাহরণ কম নেই। বহু আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস আছে। পাঁচ আগস্ট ঢাকার সড়কে মানুষের উপস্থিতি ইতিহাসেরই একটি অংশ। মানুষের আশা যখন ভেঙে যায়, তখন রাজনীতির ওপর আস্থা কমে যায়। আর আস্থা হারানো রাজনীতি স্থায়ী হয় না। কোনো অঙ্গীকার যদি গণভোটে অনুমোদন পায়, তাহলে সেই অঙ্গীকার রাখা রাজনৈতিক দলের অনিবার্য দায়িত্ব। গণভোটের ধারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জনগণের মতামত নিতে এই পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানও তার সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোটের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখেন নানা জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নে।এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি মৌলিক রাজনৈতিক নীতিও সামনে আসে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা ক্ষমতাসীনদের কেবল রাজনৈতিক দায় নয়, নৈতিক দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব পালন না করলে জনগণের বিশ্বাসে বড় ধরনের ফাটল ধরার ঝুঁকি থাকে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
এমএসএম / এমএসএম
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব
নতুন সংসদ, নতুন সাংসদ: প্রস্তুতির রাজনীতিতে বিএনপির নতুন অধ্যায়
দক্ষ জাতি গঠনের নতুন দিগন্ত: ১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে?
‘ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে আমরা পক্ষভুক্ত নই’- ইরানের হামলা নিয়ে ইউএইর অবস্থান: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে
ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পতন অনিবার্য
৬ মাসের সময়সীমা বনাম ৬০ দিনের ধৈর্য: শাসন, সংকট ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে
দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না—কারণ রাষ্ট্র নয়, রাজনীতিই তার আশ্রয়
পতাকাহীন গাড়ি, সাইরেনহীন পথ: বাংলার ধূলোমাখা পথে এক নিঃসঙ্গ কর্মবীর তারেক রহমানের পদধ্বনি
তারেক রহমানের বিজয় ইতিহাসে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত