নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত এক মাসে অন্তত তিনটি বৈঠকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। আর মাত্র দুই দিন পর শুরু হবে সারা দেশে বহু কাঙ্ক্ষিত ভোট। ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করার কথা ছিল তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু নানা কর্মকাণ্ডে জনমনে একধরনের দ্বিধার সৃষ্টি হচ্ছে। আদৌ কি নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক কিংবা ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে সে প্রশ্নগুলো এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সর্বগ্রহণযোগ্য তিনটি এবং মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের কথা বলা হয়ে থাকে। এর বাইরেও আরও আটটি নির্বাচন হয়েছে। সে নির্বাচন ঘিরে কোনো না কোনোভাবে বিতর্ক রয়েই গেছে। ১২-ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।এবারের নির্বাচন আনন্দ-উৎসব, শান্তিশৃঙ্খলা, ভোটার উপস্থিতি এবং সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার দিক থেকে দেশের ইতিহাসে যেন স্মরণীয় হয়ে থাকে, ইতোমধ্যে সবাই সেজন্য মানসিক প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শুরু করেছে। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনকালে দেশের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। সবকিছু অতিক্রম করে দেশ এখন নির্বাচনমুখী নানা আয়োজনে ব্যস্ত। অর্থাৎ দল-মতনির্বিশেষে সবাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন।
বিগত সরকারের সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যেভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গিয়েছিল, সেখানে বর্তমানে অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলতে হবে। অগ্রগতি না হওয়ার অন্যতম কারণ, দেশের অর্থনীতিকে যেভাবে গোষ্ঠীতন্ত্রের কবলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে এখনো সম্পূর্ণ উত্তরণ হয়নি। অর্থাৎ আগের সরকার বিদায় নিয়েছে, আর গোষ্ঠীতন্ত্র চলে গেছে বিষয়টি এমন নয়। বিভিন্ন জায়গায় তাদের লোকজন পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অর্থনীতির দুটি সূচক এখনো উদ্বেগজনক। এর মধ্যে একটি হলো মূল্যস্ফীতি, অপরটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ। দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষকের সমস্যা মেটানো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিয়ে আসা অন্যতম। দেশে সম্পদের স্বল্পতা। রাজস্ব আহরণ কম এবং বিগত সময়ে নানাভাবে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা। বিশাল পট-পরিবর্তন হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি চাপ আছে। আবার এই দুই বাস্তবতার মধ্যে আমলাতান্ত্রিক গতানুগতিকতা পরিহার করে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব দেখানোর সুযোগ আছে। সুযোগের মানে এই নয় যে, হঠাৎ করে বিশাল কোনো প্রকল্প নিতে হবে। বরং প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো-অর্থ বরাদ্দের আকার। এ আকার অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে। পাশাপাশি বাড়াতে হবে ব্যয়ের দক্ষতা। মেগা প্রকল্প বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ের দক্ষতা ছিল না।মূল্যস্ফীতি কমানো তো একটা যৌক্তিক চাওয়া।এবং সেটা কীভাবে কমাতে পারি,সেটার সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার।
ওদিকে সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বোঝাপড়াটা কীভাবে করতে হবে, এ জায়গায় পরিষ্কার নজর দেওয়া দরকার।দেশের অনুন্নয়ন ব্যয়, যাকে পরিচালন ব্যয় বলে, এখানে আসলে কৃচ্ছ্রসাধন কীভাবে করা যায় সেটা দেখতে হবে। তাছাড়াও কর্মসংস্থান বাড়াতে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি খাতের বিকাশে সরকারকে নীতিসহায়তা দিতে হবে। কৌশলের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু প্রত্যাশা আছে। মূল কথা হলো, সম্পদের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও আকাঙ্ক্ষা বিশাল। এটি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এটি বাস্তবায়নে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন নেই। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। অগ্রাধিকার খাত বা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। অর্থাৎ সব খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না হলেও পলিসি সাপোর্ট (নীতিসহায়তা) দেওয়া জরুরি। এ ছাড়া আয় বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতে নীতি সহায়তা দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় গত তিন-চার দশক ধরে দুটি চালকই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। একটি হলো তৈরি পোশাক এবং অন্যটি রেমিট্যান্স। এই দুটি থাকবে। এর সঙ্গে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি, ওষুধ খাত, আইটি সেবা এবং চামড়াশিল্প অন্যতম। অবশ্যই আয়ের খাতগুলো দুর্বল। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি।
আমাদের ফ্রেমিং হতে হবে পাওনার হিসাব এবং উত্তরণের পথরেখা। পাওনার হিসাবটা খুবই জরুরি। অন্যদিকে বিচার, সংস্কার, নির্বাচন-এ বিষয়গুলোতে কী কী হলো, সেই পাওনার হিসাবটা আজকে মূল কথা হতে হবে। আমাদের যা করণীয়, তা হচ্ছে-মানুষকে গণনার বাইরে ফেলে দিয়েছে, মানুষ যে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে; এখন দর্শক, এত বিশাল একটা পরিবর্তনে অংশগ্রহণকারী নয়-মূল কাজ হতে হবে এই মানুষকে কীভাবে দর্শক থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর পর্যায়ে আবার নিয়ে আসা যায়। সেটার একটা মাধ্যম অবশ্যই নির্বাচন।এ ছাড়া সক্ষমতায় যে ধস নেমেছে, এ ব্যাপারে আমাদের একটা সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজন হলে এটাকে বিদায় জানাতে হবে। যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের এটা শুনতে হবে। সক্ষমতার এ ধস পাল্টাতে হবে।মানুষকে গণনার বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটা ভয়াবহ বাস্তবতা আছে। সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ মনোযোগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অধিকতর তৎপর থাকতে হবে।একই সঙ্গে বেকারত্ব বা কর্মসংস্থানের একটা ভয়াবহ অবস্থা আমরা দেখেছি। আমাদের লক্ষ্যমাত্রায় যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, ইনসাফ থাকার কথা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে আমরা প্রতিশোধকেই মাধ্যম হিসেবে নিতে চাই।মানুষের মধ্যে অস্থিরতা প্রচণ্ড।নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে,নির্যাতনকারীর অধিকাংশ হচ্ছে তরুণ। এগুলো আমাদের আমলে নিয়ে কাজ করতে হবে। লক্ষ্য ও উপায়ের মধ্যে এই যে অমিল, প্রতিশোধস্পৃহাকে সমাজের মধ্যে বড় করে জাগিয়ে তুলে আমরা কোথায় সেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারব? এমন নয় যে, আমাদের অবকাঠামো নেই।
আমাদের যেটি দরকার তা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সুশাসন ও জবাবদিহি। চলতি মাসের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এই নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মোট ১,৭৩২ জন প্রার্থীসহ সর্বমোট ১,৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন; নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,২৩২ জন। জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। সংস্কারের ইস্যুতে এবার সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।নির্বাচনের আগে সহিংসতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি, নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রসহ নানা কারণে এবারের নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি,নারীর অংশগ্রহণ,সংখ্যালঘুদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির ওপর নির্ভর করবে নির্বাচন ইতিহাসের সেরা হবে কি না। এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে? তবে আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সুশাসন ও জবাবদিহি। এই নির্বাচন সুন্দর ও সফল হোক-একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনায় আসুক। দেশে গণতন্ত্রের শাসন ফিরে আসুক। দেশের মানুষের জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য
এমএসএম / এমএসএম
হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়
নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক
তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন
ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর
আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি
এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ
চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচাতে হবে, বাড়াতে হবে কাজের গতি
বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়, স্পিকার শূন্যতার পরও ১৩তম সংসদের শপথে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত!
সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য দুঃসংবাদ