ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মজদুর এক নয় বলেই আজ টিয়ারশেল

পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর


মনিরুজ্জামান মনির photo মনিরুজ্জামান মনির
প্রকাশিত: ৮-২-২০২৬ দুপুর ১১:২৬

দেশের কোটি কোটি মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের আগুনে পুড়ছে, তখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন-ভাতার দাবিও রাষ্ট্রের কাছে আজ যেন “অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা” হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন জমা হয়েছে—এ কথা সবাই জানে। আলোচনা হয়েছে, আশ্বাসও এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এই “আশ্বাসের রাজনীতি”ই আজ সরকারি কর্মচারীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েছে রাস্তায় নামতে—ঢাকায় এসে যমুনার সামনে দাঁড়াতে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।
কিন্তু এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সত্যটা কেউ জোরে বলতে চায় না। সত্যটা হলো—ঢাকায় এসেছে সর্বোচ্চ এক লাখ। সংখ্যাটা বড়, কিন্তু রাষ্ট্রকে থামিয়ে দেওয়ার মতো বড় নয়। আর এ কারণেই টিয়ারগ্যাস, টিয়ারশেল, লাঠিপেটা, গুলি—সবই সম্ভব হয়েছে। এক লাখ মানুষকে রাষ্ট্র “নিয়ন্ত্রণ” করতে পারে; কিন্তু সাত-আট লাখ মানুষকে রাষ্ট্র “দমন” করতে গেলে রাষ্ট্রই কাঁপবে। এইখানেই প্রশ্ন উঠে—দুনিয়ার মজদুর এক হবে কবে?
রাষ্ট্র সাহস পায় যখন জনগণ বিচ্ছিন্ন থাকেঃ রাষ্ট্রযন্ত্র কখন সাহস পায়? যখন সে দেখে—মানুষ ক্ষুব্ধ, কিন্তু এক নয়।
মানুষ দাবিদার, কিন্তু বিচ্ছিন্ন।
মানুষ সঠিক, কিন্তু ভয়গ্রস্ত আজ সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলনের চিত্রও তেমনই। কর্মচারীরা বিক্ষুব্ধ, কিন্তু সবাই ঢাকায় নেই। অনেকেই দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, কেউ কেউ মনে মনে সমর্থন করে, কিন্তু সামনে আসে না। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে বার্তাটা যায়—“এটা চাপ, কিন্তু বিপদ নয়।” রাষ্ট্র বিপদ বুঝলে টিয়ারশেল ছোঁড়ে না—রাষ্ট্র তখন আলোচনায় বসে। টিয়ারশেল ছোঁড়ে তখনই, যখন সে নিশ্চিত হয়—এটা ভেঙে দেওয়া যাবে।
“ক্যাডার বনাম নন-ক্যাডার, অফিসার বনাম কর্মচারী—এই বিভাজনই আন্দোলনের শক্তি খেয়ে ফেলে।”
এক লাখ কম নয়—কিন্তু এটা এখনো ‘ভয় দেখানোর’ পর্যায়ঃ এক লাখ মানুষ ঢাকায় আসা কম ঘটনা নয়। বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের ইতিহাসে এটাকে বড় জমায়েতই বলতে হবে। কিন্তু আন্দোলন সফল করতে কেবল “জমায়েত” যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংখ্যা + ধারাবাহিকতা + সর্বস্তরের অংশগ্রহণ।
রাষ্ট্রকে কাঁপাতে হলে সাধারণত দরকার হয়— একসঙ্গে ৩–৫ লাখ মানুষ, টানা ৩–৭ দিনের অবস্থান, মাঠপর্যায়ের অফিস, দপ্তর, সেবা—আংশিক নয়, কার্যত শাটডাউন এবং সবচেয়ে বড় কথা—মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত একসঙ্গে দাঁড়ানো। এই শক্তি তৈরি না হলে আন্দোলন “প্রতিবাদ” থাকে, কিন্তু “বদল” আনে না।দুনিয়ার মজদুর এক না হওয়ার ৫টি বাস্তব কারণঃ ১) ভয়—চাকরি যাবে, বদলি হবে, মামলা হবে, সরকারি চাকরিজীবীর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—চাকরির নিরাপত্তা। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে, “আমি গেলে যদি বদলি হই? ইনক্রিমেন্ট আটকে যায়? বিভাগীয় মামলা হয়?”
এই ভয়কে রাষ্ট্রই অস্ত্র বানায় আন্দোলন তখনই বড় হয়, যখন মানুষ বুঝে—ভয় পেলেই অধিকার হারাতে হবে। ২) বিভাজন—ক্যাডার বনাম নন-ক্যাডার, অফিসার বনাম কর্মচারী, সরকারি চাকরিজীবীরা একটি পরিবার নয়—এটা আমাদের নির্মম সত্য। এখানে পদমর্যাদা আছে, শ্রেণি আছে, অহং আছে।
একজন আরেকজনকে “একই কাতারের” মনে করে না। ফলে আন্দোলনও এক হয় না।
একই দাবিতে একই মানুষ দাঁড়ায় না। ৩) “আমি না গেলেও চলবে”—এই আত্মঘাতী মানসিকতা, অনেকেই ভাবে—
“অন্যরা যাবে, আমার যাওয়ার দরকার কী?” এটাই আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগ। কারণ সবাই যদি এভাবে ভাবে, তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউই যায় না— আর রাষ্ট্র তখন সহজে দমন করে। ৪) নেতৃত্ব সংকট—অনেক নেতা চাপ দিতে নয়, সমঝোতা করতে ব্যস্ত, সরকারি কর্মচারী সংগঠনের বড় অংশের নেতৃত্ব আজ “মাঠের নেতা” নয়।
অনেক নেতা আসলে আন্দোলনের নেতা না—তারা দরকষাকষির নেতা। কিছু নেতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করার বদলে আন্দোলনকে “নিয়ন্ত্রিত” রাখতে চান। কারণ নিয়ন্ত্রিত আন্দোলনে সুবিধা থাকে—
বড় আন্দোলনে ঝুঁকি থাকে। ৫) ঢাকায় আসার বাস্তব বাধা ঢাকায় আসা মানে টাকা, যাতায়াত, অনুমতি, বাস-ট্রেন বন্ধ, চেকপোস্ট, বাধা—সব মিলিয়ে একেকটা যুদ্ধ।
মাঠপর্যায়ের মানুষ তাই ঢাকায় আসতে পারে না। এখানেও রাষ্ট্রের কৌশল থাকে- যাতায়াত কঠিন করে দেওয়া।
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সামনে প্রশ্ন: আপনি সংস্কার করবেন, না চাপিয়ে দেবেন অধ্যাপক ইউনূস আন্তর্জাতিক ভাবে একজন সম্মানিত মানুষ।
তার কথায় “দুর্নীতি থাকবে না”, “সংস্কার হবে”, “স্বচ্ছতা আসবে”—এগুলো জনগণ শুনতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন-ভাতা কি দুর্নীতি?
পে স্কেল বাস্তবায়ন কি রাষ্ট্রবিরোধিতা? যদি না হয়, তাহলে কেন পুলিশ টিয়ারশেল ছোঁড়ে? কেন লাঠিপেটা হয়?
কেন “রাষ্ট্রীয় শক্তি” ব্যবহার করে কর্মচারীদের মুখ বন্ধ করা হয়?
“পে স্কেল বাস্তবায়ন কোনো অপরাধ নয়—অপরাধ হলো ন্যায্য দাবিকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করা।”
পে স্কেল বাস্তবায়ন না হলে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবেঃ যারা মনে করেন—“পে স্কেল দিলে বাজেট চাপবে”—তারা একটি মৌলিক সত্য ভুলে যান। সরকারি কর্মচারী দুর্বল হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। রাষ্ট্রের প্রশাসন দুর্বল হলে দুর্নীতি বাড়ে। দুর্নীতি বাড়লে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ে। অর্থাৎ—
বেতন না বাড়ালে দুর্নীতির খরচ বাড়ে। এটাই বাস্তব অর্থনীতি।
‘দুনিয়ার মজদুর’ এক হবে যেদিন মানুষ বুঝবে—চুপ থাকলে সর্বনাশঃ দুনিয়ার মজদুর এক হয় কবে? যেদিন একজন কর্মচারী বুঝবে—
“আজ আমি না গেলে কাল আমার বেতনও থাকবে না, মর্যাদাও থাকবে না।” যেদিন একজন অফিসার বুঝবে—
“আমি আলাদা নই—আমার ভবিষ্যৎও একই রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে বন্দি।” যেদিন ক্যাডার-ননক্যাডার বিভাজন ভেঙে যাবে। যেদিন পদমর্যাদার অহংকার ভেঙে যাবে। যেদিন একেকটা দপ্তর একেকটা দ্বীপ হবে না—একটা দেশ হবে।
“এক লাখের আন্দোলনে রাষ্ট্র টিয়ারশেল ছোঁড়ে; সাত লাখের আন্দোলনে রাষ্ট্র আলোচনা করে; দশ লাখের আন্দোলনে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত দেয়।”
এক লাখ এসেছে—এটা শুরুর বার্তা, শেষের নয়ঃ আজ ঢাকায় এক লাখ এসেছে। এটা ব্যর্থতা নয়—এটা শুরু। কিন্তু এক লাখের আন্দোলনে রাষ্ট্র টিয়ারশেল ছোঁড়ে। সাত লাখের আন্দোলনে রাষ্ট্র আলোচনা করে। দশ লাখের আন্দোলনে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত দেয়। অতএব প্রশ্ন একটাই— আমরা কি সত্যিই এক হব, নাকি বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে টিয়ারশেল খাব?
দুনিয়ার মজদুর এক হলে,রাষ্ট্রের সাহস কমে যাবে।
আর অধিকার তখন আর “দয়া” থাকবে না— অধিকার হবে বাধ্যবাধকতা।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি

Aminur / Aminur

হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?

জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়

নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক

তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন

ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর

আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি

এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ

চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচাতে হবে, বাড়াতে হবে কাজের গতি

বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়, স্পিকার শূন্যতার পরও ১৩তম সংসদের শপথে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত!

সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য দুঃসংবাদ

"রাজনীতির মারপ্যাঁচে স্মৃতির কারাগারে আজীবন বন্দী সাদ্দামের করুন আর্তনাদ"