১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন একটি সাধারণ নির্বাচন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রিক দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাই জাতীয় রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। তবে এবারের নির্বাচন সেই পরিচিত বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানা ১৬-১৭ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, এবার নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাইরে। এর ফলে পুরনো ভোটের সমীকরণ ভেঙে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। একসময় মিত্র থাকা বিএনপি ও জামায়াত এখন সরাসরি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক ভোটার কোন নতুন রাজনৈতিক কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকবে, সেটিই এখন নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নীরব ভোটই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ভ্যারিয়েবল হিসেবে সামনে এসেছে। জয়-পরাজয়ের সমীকরণ নির্ধারণে এই ভোট বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক বিশ্লেষক ধারণা করছেন, এই নীরব ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। একই সঙ্গে কিছু ভোট জাতীয় পার্টি বা সুন্নী ঐক্যজোটের দিকে সরে যেতে পারে, আর জামায়াত স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত কিছু সুবিধা পেতে পারে। ফলে প্রতিটি আসনে এই ভোটের আচরণই ফলাফলের ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বড় একটি ভোটব্যাংকের অনুপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। একটি প্রভাবশালী দল নির্বাচনের বাইরে থাকায় রাজনৈতিক কেন্দ্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা ইতিহাসে খুব বেশি দেখা যায় না। এই শূন্যতা মধ্যপন্থী ও তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে নির্বাচন এখন এক ধরনের “ওপেন ফিল্ড” বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রচলিত মেরুকরণ ভেঙে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
তবে এই খোলা মাঠ পুরোপুরি সমান নয়। নিষিদ্ধ দলটির তৃণমূল পর্যায়ের পরিচিত নেতা-কর্মী এবং তাদের দৃঢ় সমর্থকগোষ্ঠীর কারণে ভোটের একটি অংশ নীরব ও অনিশ্চিত থেকে যেতে পারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা-কর্মীরা সরাসরি অংশ না নিলেও তাদের সমর্থকেরা বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সুইং ভোট যে রাজনৈতিক শক্তি বেশি দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের পক্ষে নিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি নির্বাচনের সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে আসতে পারে। তাদের সামনে অন্তত তিনটি কৌশলগত সুবিধা স্পষ্ট। প্রথমত, মধ্যপন্থী জাতীয়তাবাদের অবস্থান, যা চরমপন্থার বাইরে থাকা ভোটারদের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি বিকল্প তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা, যা বিভক্ত ভোটারদের আকর্ষণ করার সম্ভাবনা রাখে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ক্ষমতার বিকল্প হিসেবে পরিচিতি, যার ফলে অনিশ্চয়তার সময়ে অনেক ভোটার বিএনপিকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের জোট কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাব রাখতে পারে। তবে জাতীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংকের আকার ছোট হওয়া, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে সংকুচিত করে রাখে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সুবিধা পেলেও সামগ্রিক নির্বাচনী ফল নির্ধারণে তাদের ভূমিকা সীমিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থকদের ভোট। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান না নেওয়ায় মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশ তাদের প্রতি তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াত ও এনসিপি-সহ সংশ্লিষ্ট জোটের অবস্থান এই ভোটকে ঘিরে কিছু সংশয় তৈরি করেছে। ফলে এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব প্রতিটি আসনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ভূরাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনিশ্চিত সময়ে ভোটাররা সাধারণত এমন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকে, যারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও আন্তর্জাতিক ভারসাম্য বজায় রাখার সক্ষমতা দেখাতে পারে।
এই নির্বাচন কেবল জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়; এটি রাজনৈতিক কেন্দ্র পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে রাজনৈতিক কেন্দ্রের জায়গা এখন প্রতিযোগিতামূলক। নীরব ভোটারদের আচরণই নির্ধারণ করতে পারে কে সেই কেন্দ্রে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভোটের গতিপথ পুরো নির্বাচনের ফলাফল বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
মধ্যপন্থী ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকতে পারে। একদিকে তারা ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক কেন্দ্র দখলের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। তবে গণতন্ত্রের মূল শক্তি ভোটারদের হাতেই থাকে। তারা স্থিতিশীলতার পথ বেছে নেবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার দিকে ঝুঁকবে, সেটিই আগামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।
সর্বশেষে, ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু পৃথক আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রতিটি নীরব ভোট, প্রতিটি ভোটার এবং প্রতিটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা মিলেই নির্ধারণ করবে নতুন রাজনৈতিক কেন্দ্র কার হাতে যাবে। জয়-পরাজয় শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের প্রশ্ন।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরনো সমীকরণগুলো আর আগের মতো কার্যকর নয়। নির্বাচন তাই শুধু ভোটের লড়াই নয়; এটি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কাকে রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করবে, সেটিই সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠবে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক।
এমএসএম / এমএসএম
হ্যাঁ জয় মানেই কি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সচুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারের অধিকার আইনগত হবে?
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে আর কোন ধর্মঘট নয়
নির্বাচন সফল হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক
তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় জাতীয় নির্বাচন
ঐক্য সরকার নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল!
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
পে স্কেল আন্দোলন: সংখ্যার সত্য, রাষ্ট্রের সাহস, আর ‘দুনিয়ার মজদুর
আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি
এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে কবরস্থ করার নির্বাচন—যশোরে হাসনাত আব্দুল্লাহ
চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচাতে হবে, বাড়াতে হবে কাজের গতি
বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়, স্পিকার শূন্যতার পরও ১৩তম সংসদের শপথে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত!
সাংবাদিকদের গ্রুপিং জাতির জন্য দুঃসংবাদ