আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতন্ত্র আর কেবল একটি সাংবিধানিক পরিভাষা নয়; এটি পরিণত হয়েছে জনআস্থার এক কঠিন পরীক্ষায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতার ধারাবাহিকতা এবং বিচারহীনতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে-রাষ্ট্র কেন এখনো নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না?
এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই আলোচনায় ফিরে আসে জুলাই–২৪ গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর নাম। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। স্বল্প সময়ের রাজনৈতিক সক্রিয়তার মধ্যেই হাদী যে রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিষ্ঠাননির্ভর গণতন্ত্র। সময়ের পরিবর্তিত ও সংকটময় বাস্তবতায় তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে তাৎপর্য অর্জন করেছে।
হাদীর মৃত্যু শুধু একটি জীবনের অবসান নয়; এটি রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন রেখে গেছে। ইতিমধ্যেই দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ হাদীর কফিনে হাত রেখে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এসেছে সেই প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হাদীর জানাজা শেষে বলেন, তাঁরা ওসমান হাদিকে বিদায় দিতে আসেননি; বরং তাঁর কাছে একটি দৃঢ় ওয়াদা করতে এসেছেন- যে হাদি তাঁদের বুকে, মনে ও দেশের ভবিষ্যতে চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ বাস্তবায়নের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
ড. ইউনূস বলেন, “প্রিয় ওসমান হাদি, আমরা তোমাকে বিদায় দিতে এখানে আসিনি; আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি যে তোমার স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়ন করব।” তাঁর ভাষায়, জানাজা কেবল বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি প্রতিশ্রুতি- হাদীর শিক্ষা, রাজনৈতিক আচরণ, মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পদ্ধতি এবং মতপ্রকাশের নৈতিকতা সামনে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার।
শহীদ হাদী তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের জন্য কতটা অপরিহার্য। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত- সবার বিবেককে তিনি নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাই এখন সময় এসেছে শোকের সীমা পেরিয়ে হাদীর রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার। এই দর্শন বাস্তবায়িত হলেই বাংলাদেশ একটি ন্যায়পরায়ণ, কার্যকর ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যার সুফল ভোগ করবে দেশের সাধারণ জনগণ।
সাধারণভাবে গণতন্ত্রের মান নির্ধারিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো গণতন্ত্র টিকে থাকবে নাকি দুর্বল হয়ে পড়বে- তার ফয়সালা হয় আরও আগে। তা নির্ভর করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা, বিচার বিভাগের কার্যকারিতা এবং একজন সাধারণ নাগরিক দৈনন্দিন জীবনে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না- সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর।
আজ বাংলাদেশ কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থার গভীর সংকটে ভুগছে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা দুর্বল, অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন এবং বিতর্কিত বলে বিবেচিত, সেখানে কার্যকর গণতন্ত্র কতটা সম্ভব- এই প্রশ্ন অবধারিতভাবেই সামনে আসে। এমন বাস্তবতায় আসন্ন নির্বাচন কতটা অবাধ, ভয়হীন, সহিংসতামুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য হবে- তা নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে আইন আছে, আদালত আছে, নির্বাচন হয়—তবু অনেক নাগরিকের কাছে গণতন্ত্র বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে না। কারণ আইন অনেক সময় সুরক্ষার পরিবর্তে চাপের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, আর ন্যায়বিচার অধিকার নয়, বরং প্রভাব ও সামর্থ্যের ফল হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
হাদীর রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা ছিল সরল কিন্তু দৃঢ়-গণতন্ত্র কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর হতে হবে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হলে এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে তবেই জনগণ প্রকৃত গণতান্ত্রিক সুফল পেতে পারে। আর সেই দৈনন্দিন গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য ন্যায়বিচার।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা রাষ্ট্র পরিচালনার মেরুদণ্ড। কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই টেকসই হতে পারে না। নাগরিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ- সবকিছুর ভিত্তি একটি মৌলিক বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: অন্যায় হলে রাষ্ট্র নিরপেক্ষভাবে নাগরিকের পাশে দাঁড়াবে।
যেখানে পুলিশ নিরপেক্ষ ও পেশাদার, সেখানে সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। যেখানে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য, সেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মেনে চলে। এগুলো কোনো আদর্শবাদী কল্পনা নয়; বরং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব শর্ত।
কিন্তু বাস্তবতায় পরিস্থিতি ভিন্ন ও উদ্বেগজনক। দেশে আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক নাগরিকের কাছে থানা আজ নিরাপত্তার প্রতীক নয়; বরং এটি অনিশ্চয়তার উৎসে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, অর্থ বা প্রভাবের ওপর নির্ভর সহায়তা, মামলার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মিথ্যা মামলার শিকার সাধারণ মানুষ, এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থার বিরুদ্ধে নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ- এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান।
সমাজ বিজ্ঞানীদের মত, দেশে যখন পুলিশকে নিরপেক্ষ মনে করা যায় না, তখন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা জনগণের সেবার পরিবর্তে ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করে। এই ধারণা সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত- গণতন্ত্রের জন্য এর প্রভাব সমানভাবে ক্ষতিকর।
একই সংকট দেখা যায় নিম্ন আদালত ব্যবস্থায়। সাধারণ মানুষের বিচার অভিজ্ঞতা মূলত এখানেই সীমাবদ্ধ। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। দরিদ্র মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের অনুসরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিলম্বিত বিচার শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের অর্জন নয়; বরং ন্যায়বিচারের পরাজয়।
এই পরিস্থিতিতে মানুষ সততার পরিবর্তে অর্থ ও ক্ষমতাকেই ফলাফল নির্ধারণকারী হিসেবে দেখতে শুরু করে। আইনি পথে আস্থা হারিয়ে তারা অনানুষ্ঠানিক ও সহিংস সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে সমাজে প্রতিশোধ, ভিড়ের বিচার এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নাগরিক অধিকারের জায়গা দখল করে নেয়। এমন বাস্তবতায় নির্বাচন হলেও গণতন্ত্র কার্যকরভাবে টিকে থাকে না।
এই প্রেক্ষাপটে, যদি হাদীর রাজনৈতিক দর্শন প্রতীকের বাইরে বাস্তবে রূপ নিতে চায়, তবে সংস্কারের সূচনা হতে হবে সেই জায়গা থেকে, যেখানে গণতন্ত্র প্রতিদিন পরীক্ষিত হয়।
প্রথমত, পুলিশ প্রশাসনের রাজনৈতিক নির্ভরতা কমানো অত্যন্ত জরুরি। শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ নিশ্চিত করতে হবে, স্বাধীন অভিযোগ ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, এবং মামলা ও তদন্ত প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা প্রয়োজন। পুলিশকে ক্ষমতার নয়, আইনের প্রতি সম্পূর্ণ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এছাড়া, ঘুষ ও দুর্নীতির জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিম্ন আদালতের সংস্কার সময়ের দাবি। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে, বিচারকদের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, এবং আদালতের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার হতে হবে দৃশ্যমান, দ্রুত এবং নাগালের মধ্যে।
সংস্কারের সবচেয়ে শক্ত বার্তা আসে এখান থেকেই- যদি আইন কাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে। যদি ক্ষমতাবানরাও আইনের আওতায় আসে, তবে আস্থা ফিরতে শুরু করে। না এলে কোনো ভাষণ বা নির্বাচন সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।
আইনশৃঙ্খলা কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার নৈতিক চুক্তি। মানুষ আইন মানে তখনই, যখন বিশ্বাস করে রাষ্ট্র ন্যায়বিচার দেবে। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে আইন মানা টিকে থাকে কেবল ভয়ের ওপর- গণতন্ত্র নয়। হাদীর দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র ভয় দিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে টিকে থাকে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কেবল নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি মূলত একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে- একজন সাধারণ নাগরিক কি বিশ্বাস করে যে, অন্যায় ঘটলেও আইন তাকে নিরপেক্ষভাবে রক্ষা করবে, কোনো অর্থ, পরিচয় বা ভয় ছাড়াই? নাগরিকদের এই আস্থা ও বিশ্বাসই গণতন্ত্রকে টেকসই করে এবং রাষ্ট্রকে জনগণের জন্য সেবা প্রদানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
গণতন্ত্র শুরু হয় না শুধুমাত্র ভোটের দিনে; এটি শুরু হয় থানায়, শুরু হয় আদালতে, শুরু হয় প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার অভিজ্ঞতায়। শহীদ হাদীর রাজনৈতিক দর্শন আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত গণতন্ত্র কেবল ঘোষণার বা শোকের বিষয় নয়; এটি হলো একটি দায়িত্ব-নাগরিক এবং রাষ্ট্রকে প্রতিদিনের চর্চায়, আইনশৃঙ্খলা এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতায় প্রতিফলিত করতে হবে। হাদীর দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রকে স্থায়িত্বশীল ও শক্তিশালী করতে হলে প্রতিটি দিনে, প্রতিটি স্তরে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে
আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন