স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়; বরং এমন এক সময়ে সংঘটিত একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত, যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং সংবিধানিক সংস্কারের আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই প্রত্যাবর্তন ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এক অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে তারেক রহমান দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মামলা ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তাকে দীর্ঘ প্রবাসজীবনে ঠেলে দেয়। প্রায় সাড়ে সতেরো বছর দেশের বাইরে থেকেও তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় রাজনীতি ও নীতিগত আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় তাকে কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কেও সচেতন করেছে- যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ও ধারাবাহিক গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং দেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো- রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের প্রশ্ন সামনে এনেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ও তার নেতৃত্বের ভূমিকা শুধু নির্বাচনী নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তারেক রহমানের বক্তব্য- “I have a plan. For the people of my country, for my country.” এই প্রত্যাবর্তনের বৌদ্ধিক ভিত্তি হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এই উক্তি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি থেকে সরে এসে রাষ্ট্র ও জনগণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি ভাষ্য উপস্থাপন করে। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন রয়ে গেছে- এই পরিকল্পনা কতটা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির দিকে নির্দেশিত।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক চিন্তার অভাব। ব্যক্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের কাঠামোগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- তিনি নিজেকে কেবল দলীয় নেতা হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন কিনা।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারত- এই চারটি শক্তির কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অবাধ নির্বাচনের প্রশ্নে পশ্চিমা বিশ্ব বরাবরই বাংলাদেশকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে ভারত ও চীনের দৃষ্টিও ঢাকার রাজনৈতিক গতিপ্রবাহের ওপর নিবদ্ধ।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক মহলে একটি প্রশ্নও উত্থাপন করেছে- বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে? কূটনৈতিকভাবে এটি একটি সংবেদনশীল সময়, যেখানে রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংলাপ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা না গেলে আন্তর্জাতিক আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষ্য যদি সংযত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিষ্ঠানমুখী হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক পরিসরেও ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই দিনে প্রস্তাবিত ‘জুলাই চার্টার’ সংবিধান সংশোধনী রেফারেনডাম এই রাষ্ট্রচিন্তা ও কূটনৈতিক আস্থার বাস্তব পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস হলেও, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মূল মানদণ্ড হবে- নির্বাচনের স্বচ্ছতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতার ন্যায্যতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিসর।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন তাই একদিকে আশার সঞ্চার করছে, অন্যদিকে দায়িত্বের পরিধিও বাড়াচ্ছে। জনগণ এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বাংলাদেশ থেকে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, স্থিতিশীল রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা আশা করছে।
তাই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেবল একটি ঘটনাভিত্তিক আলোচনা নয়, বরং সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একযোগে সুযোগ ও পরীক্ষা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যদি তিনি রাষ্ট্রচিন্তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারেন, কূটনৈতিক সংযম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে রাজনৈতিক আচরণের কেন্দ্রে স্থাপন করেন, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে কেবল ক্ষমতার লড়াই দিয়ে নয়, বরং নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, দায়িত্বশীলতা ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সামনে রেখে নেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে
আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন