সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অন্তর্বর্তী সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেই উদ্দেশ্য খুব একটা সাধিত হয়নি। বিগত সরকার আমলে সৃষ্ট অধিকাংশ সমস্যা এখনো বিদ্যমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যার গভীরতা আরও বেড়েছে। নির্বাচিত সরকার ব্যতীত এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা বিদ্যমান তা সমাধা করে অর্থনীতির হারানো শক্তি ফিরে পেতে হলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। এ নির্বাচনে আমাদের সঠিক এবং যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে। অতীতে বাংলাদেশের কোনো কোনো নেতা বিদেশে নির্বাসন শেষে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাবর্তন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটা উদ্দীপনা প্রত্যক্ষ করা যায়নি।বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সতেরো বছরের বেশি সময় লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর শেষ পর্যন্ত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন, যার মাধ্যমে তাকে ঘিরে তার দলের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া উদ্বেগের অবসান হচ্ছে। বিএনপির দিক থেকে দীর্ঘকাল ধরেই তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরছেন ওই সরকারের পতনেরও পনেরো মাস পর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান তার দেশে ফেরার বিষয়ে নিজেই যে উদ্বেগ তৈরি করেছিলেন, তার অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরাটা তার দলের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের কাছে অনেকটা ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো, যা দলের জন্য স্বস্তি বয়ে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন তারা।
আর এর মাধ্যমে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যা-সঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সময়ে পদার্পণ করলো। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন নিছক একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকারহীনতা, একদলীয় কর্তৃত্ববাদ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের যে অচলাবস্থা দেশকে গ্রাস করেছে; পতিত স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন জনগণের মধ্যে নতুন আশা, সাহস ও প্রত্যয়ের সঞ্চার করেছে।বাংলাদেশ আজ গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। পতিত স্বৈরাচার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলোকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে, নির্বাচনব্যবস্থায় জনগণ আস্থা হারিয়েছে। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী, সংগঠিত ও আপসহীন নেতৃত্ব ছাড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন ও সঠিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব নয়। তারেক রহমান সেই নেতৃত্বের প্রতীক।যিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়ে এসেছেন এবং মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। তারেক রহমানের নেতৃত্বের মূলশক্তি তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। অতীতে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিএনপি দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সুসংগঠিত হয়েছে এবং ২৪-এর গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রবাসে থেকেও তিনি দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে দূরত্ব তাঁর নেতৃত্বকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতা তাঁকে আরো দৃঢ় ও আপসহীন করে তুলেছে।
তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে বহুগুণে বাড়াবে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে নতুন গতি সঞ্চার করবে।এই প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য শুদু বিএনপির জন্য নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি শক্তিশালী বিএনপি মানেই একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক শক্তি। তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি আগামীর বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে দৃশ্যমান রূপ দেবে।একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তরুণদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সংযোগ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রতি তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার সর্বোপরি ঘোষিত ৩১ দফা বিএনপিকে একটি আধুনিক, গণমুখী ও ভবিষ্যত্মুখী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এ সময় একটি মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। তারেক রহমানের মাতা, দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। এমন সংকটময় সময়ে পুত্র হিসেবে তাঁর মায়ের পাশে থাকা যেমন নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া একটি ঐতিহাসিক কর্তব্য। এই দুই দায়িত্বই তাঁর নেতৃত্বের মানবিকতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। অবশ্যই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। তবে বিএনপির রাজনীতি প্রতিহিংসার নয়, প্রতিরোধের; সহিংসতার নয়, সংগ্রামের; ক্ষমতার নয়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করেই বিএনপি তার আন্দোলনকে এগিয়ে নেবে-এই প্রত্যাশাই জনগণের। সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
এই আগমন বিএনপিকে আরো শক্তিশালী করবে, জনগণের সংগ্রামকে সুসংগঠিত করবে এবং দেশকে আবারও গণতন্ত্রের পথে ফেরাতে সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস দৃঢ় ও যৌক্তিক। এখন সময় সাহসী নেতৃত্ব, আপসহীন রাজনীতি এবং জনগণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। সেই পথেই যদি এই প্রত্যাবর্তন পরিচালিত হয়, তবে ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২শে জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। এটাই ছিলো দলের রাজনীতিতে তার বড় উল্লম্ফন। জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবেই এটা তিনি পেয়েছেন। তাকে ঘিরে পরে দলের মধ্যে একটি প্যারালাল নেতৃত্ব বলয় তৈরি হয়েছিলো।
তারেক রহমান ওই সময়ে সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং দলের তৃণমূলে যোগাযোগ তৈরি করতে পেরেছিলেন। এরপর ২০০৯ সালে দলের সম্মেলনে তাকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরপরই তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে বিএনপি। অন্য কোনো সংকট না হলে এটি পরিষ্কার যে, খালেদা জিয়ার পর তিনিই হবেন দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান।রাজনীতির যে কানাগলি তা যেমন দেখেছেন, তেমনি এদেশের সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতির একটি অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দলের নেতা থেকে সামনে দেশের নেতা হয়ে উঠতে পারেন কি-না সেটিই হবে এখন দেখার বিষয়। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন অনেকেই মনে করেন। সেই দলটিতে এখন সময়ের পরিক্রমায় এখন তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তারেক রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে কখনোই ঝড়ঝঞ্জা থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। এমনকি দেশে ফ্যাসিবাদের পতনের পরও তার দেশে ফেরা নিয়ে কুয়াশা তৈরি হয়েছিলো। তিনি নিজেই বলেছেন যে সব বাধা অপসারিত হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি তার দলের তৃণমূলের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ পেতে সবার সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছেন। ২০০১ সালের পর তিনি তৃণমূলে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তার ভিত্তিতেই তিনি রাজনীতিকে জ্ঞান ভিত্তিক ও উন্নয়ন কেন্দ্রিক করার চিন্তা করেন। দেশের প্রতিটি খাত নিয়ে তিনি ওয়াকিবহাল, আবার আরও জানার আগ্রহও তার আছে। ফলে মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে, দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিএনপি সঠিক নেতৃত্বই পেয়েছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, নেতৃত্ব কেউ এমনি এমনি পায় না। নেতৃত্ব অর্জন করতে হয়। ক্ষমতার উৎস হলো দুটি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা পারসোনাল কোয়ালিটি। অন্যটি হচ্ছে, তিনি যে সমাজের নেতৃত্বে দেবেন সেখানকার ঘটনাবলি বা ঘটনাপ্রবাহ তার অনুকূলে থাকা। এ দুটি যোগ্যতা থাকলে একজন ব্যক্তি সেই সমাজে নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়ে থাকেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন গণতন্ত্র ছিল না। মানুষ গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করেছিল। তারেক রহমান সে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। অতএব, তার ব্যক্তিগত গুণাবলি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তাকে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। দেশবাসী আগামীতে এমন একজন নেতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে দেখতে চান যিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টেকসই এবং স্থিতিশীল করতে পারবেন। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারবেন। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারবেন। কারও প্রতি নতজানু হয়ে থাকা নয় বরং সবার সঙ্গে মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নির্ণীত হবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য
Aminur / Aminur
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে
আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন