ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
আজ বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় জীবনের জন্য এক অপ্রতিরোধ্য শূন্যতার দিন। আমাদের মধ্যে নেই সেই নারী নেতা, যিনি শুধু স্বপ্ন দেখেছিলেন না, লড়াই করেছিলেন, কারাবাস সহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, অথচ কখনও দেশকে ছেড়ে যাননি। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
৮০ বছর ৪ মাস ১৫ দিনের উজ্জ্বল, সংগ্রামী ও অনন্য জীবনের অধ্যায় আজ সমাপ্ত হলো। কিন্তু তার সাহস, ত্যাগ, দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব এবং আপোষহীন নীতি চিরকাল আমাদের মনে অম্লান থাকবে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের অভিভাবক হিসেবেও তিনি স্মরণীয়, যিনি দেশের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন এবং যার নেতৃত্বে কোটি মানুষ অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
আজ আমরা শুধু এক নেত্রীকে হারাইনি; হারিয়েছি সেই শক্তি, দৃঢ়তা এবং দেশপ্রেমের প্রতীককে, যিনি দেশের জন্য সবসময় অটল থেকেছেন। তার জীবন আজ আমাদের শেখায়, নেতৃত্ব মানে সাহস, ত্যাগ এবং দেশপ্রেমে আপোষহীন থাকা।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সংগ্রামের, ত্যাগের ও আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক। একজন নারী নেতা হিসেবে তিনি রাজনীতির প্রতিটি জটিল পথে দাঁড়িয়েছেন। কারাবাস, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক চাপে ভেঙে পড়েননি; বরং আরও দৃঢ়, আরও আপোষহীন হয়ে উঠেছেন। দেশের জন্য তার প্রান উৎসর্গ ছিল তার জীবনের মূলমন্ত্র। তিনি বলেছিলেন, “আমি এদেশ ছেড়ে কখনো যাব না।” এই কথায় ধরা পড়ে তার দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
তার রাজনৈতিক জীবন ছিল অসংখ্য চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মুখোমুখি হওয়া। অনেকবার হয়তো মনে হয়েছে, অবস্থা অচল, ক্ষমতার শূন্যতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা, সবই তাকে ভেঙে দেবে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া কখনো হাল ছাড়েননি। কারাবাসের সময়েও তিনি দেশের জন্য চিন্তা করতে, মানুষের জন্য কাজ করতে ও রাজনীতির নৈতিকতার প্রতীক হয়ে থাকতে থাকেন। এভাবেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়, তা হলো দৃঢ়চেতা, দৃঢ়সংকল্প ও ত্যাগের সংমিশ্রণ।
তিনি ছিলেন একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন নেত্রী, এই সব পরিচয় তার জীবনের অঙ্গ। তবে এই সব পরিচয়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল তার নেতৃত্ব ও দেশপ্রেম। তার জীবন প্রমাণ করে যে সত্যিকারের নেতৃত্ব কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থে আবদ্ধ থাকে না। বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম এবং আপোষহীন নীতি চিরকাল নৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
খালেদা জিয়ার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে দেশের জন্য ত্যাগ ছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ, দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক সংকট, পরিবার ও স্বাস্থ্যের প্রতি আঘাত, সবকিছুই তাকে ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। বরং সবচেয়ে কঠিন সময়েও দেশের প্রতি তার দায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। এই অনবরত সংগ্রামের মধ্যেই তিনি দেশপ্রেমের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন, এবং তার সাহস, দৃঢ়চেতা ও ত্যাগ চিরকাল অম্লান থাকবে।
তার মৃত্যুতে শুধু দেশে নয়, বহির্বিশ্বেও শোকের ছায়া নেমেছে। আজ আমরা বুঝতে পারছি, তিনি কত বড় মাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সরকার ও দেশের সকল রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও তিনি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, একজন নেতা যিনি সবসময় দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আপোষহীনতা। কঠিন পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দমন বা বিপরীত মতাদর্শ, কিছুই তাকে নীতি থেকে সরাতে পারেনি। তিনি সবসময় দেশ ও মানুষের জন্য দাঁড়িয়েছেন। এই নীতি, এই দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব আজো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।
তার ব্যক্তিগত জীবনও আমাদেরকে শেখায় কিভাবে ত্যাগ ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়। রাজনৈতিক চাপের মাঝেও তিনি পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন, মায়ের ও স্ত্রীর ভূমিকায় অবিচল থেকেছেন। এই সমস্ত দিক মিলিয়ে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানবিক ও রাজনৈতিক নেতা, যিনি ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টকেও দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন।
আগামীকাল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ মানিক মিয়া এভিনিউয়ে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করার মাধ্যমে জাতি জানাবে সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা। তবে বিদায়ের এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও তাঁর সংগ্রাম, সাহস, ত্যাগ এবং আপোষহীন নেতৃত্ব চিরকাল দেশের সকল স্তরের মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর গৌরবময় জীবনের কর্মধারা আমাদের শেখায়, কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জনে ধৈর্য, দৃঢ়সংকল্প এবং আত্মত্যাগই হলো সত্যিকারের পথপ্রদর্শক।
খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের নেতা হওয়া মানে কেবল ক্ষমতার অলংকার ধারণ করা নয়। নেতৃত্ব মানে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা, দেশের স্বার্থে আপোষহীন থাকা এবং সংকটের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তেও সাহসিকতার সঙ্গে সামনে দাঁড়ানো। তিনি ছিলেন সেই বিরল নেত্রী, যিনি ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে নীতি ও আদর্শকে ধারণ করেছেন এবং ইতিহাসে এক মহৎ, অনন্য ও অনুকরণীয় অধ্যায় হয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবেন।
আমরা প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাআলা তার সকল খিদমত কবুল করুন, ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। তার জীবন ও সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব চিরকাল জাতির স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে- একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী, আপোষহীন ও ত্যাগী মহীয়সী নেত্রীর অবিস্মরণীয় উত্তরাধিকার হিসেবে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন; মানবিকতা, ধৈর্য ও মমত্ববোধে বাংলার সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল ‘ম্যাডাম খালেদা জিয়া’ নামেই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে
আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন