বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনে যাঁদের প্রভাব নীরব কিন্তু গভীর, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গশারদুল মেজর আবদুল গনি (১৯১৫-১৯৫৭) তাঁদের অন্যতম। তিনি সরাসরি ১৯৭১ এর রণাঙ্গনে ছিলেন না, কিন্তু বাঙালি সৈনিকদের যে আত্মপরিচয়, শৃঙ্খলা ও সামরিক চেতনার ভিত তিনি গড়ে দিয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয় সংগঠিত প্রতিরোধে। উপমহাদেশের সামরিক কাঠামোয় যখন বাঙালির উপস্থিতি ছিল নগণ্য ও অবহেলিত, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মেজর গনি বাঙালি সৈনিকদের জন্য সৃষ্টি করেন একটি স্বতন্ত্র শক্তির প্ল্যাটফর্ম। এই রেজিমেন্টই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর নবগঠিত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে বাঙালি সৈনিকদের অবস্থান ছিল দুর্বল ও প্রায় প্রান্তিক। এই বাস্তবতায় মেজর আবদুল গনি গভীর দূরদর্শিতা নিয়ে উপলব্ধি করেন, বাঙালিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র সামরিক কাঠামো গড়ে তোলাই সময়ের দাবি। পাকিস্তানের নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান ব্রিটিশ জেনারেল স্যার ফ্রাঙ্ক মেসার্ভির অনুমতি নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার বাঙালি যুবকদের নিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করেন। রেজিমেন্টের রিক্রুটিং অফিসারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে তিনি শুধু সৈনিক সংগ্রহেই থেমে থাকেননি; বাঙালিদের মধ্যে সামরিক চেতনা, শৃঙ্খলা ও আত্মমর্যাদার বোধ জাগ্রত করার এক নিরব আন্দোলন শুরু করেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা ছিল তার সেই স্বপ্নসাধের প্রথম বাস্তব রূপ।
যদিও প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আনুষ্ঠানিক কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভি জে ই প্যাটারসন, রেজিমেন্ট গঠনের প্রকৃত রূপকার ছিলেন মেজর আবদুল গনিই। পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন, প্রতিটি ধাপে তাঁর ছিল সরাসরি সম্পৃক্ততা। পূর্ব বাংলার এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে বেড়িয়ে তিনি বাঙালি যুবকদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। সুঠাম, বলিষ্ঠ ও শারীরিকভাবে উপযুক্ত দীর্ঘদেহী যুবকদের তিনি নিজ হাতে খুঁজে বের করতেন। তাঁর উপস্থিতি যেখানে পড়েছে, সেখানেই সৃষ্টি হয়েছে অভূতপূর্ব সাড়া; যুবকদের ঢল নেমেছে রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে। বাঙালিদের সেনাবাহিনীতে প্রবেশ ঘটাতে মেজর গনি শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নেননি, তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক প্রকার সামাজিক আন্দোলন—যার লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতির মধ্যে সামরিক আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার বোধ প্রতিষ্ঠা করা।
মেজর আবদুল গনির প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধের আগেই আটটি পূর্ণাঙ্গ রেজিমেন্টে রূপ নেয়। এই রেজিমেন্টগুলোই পরবর্তীকালে বাঙালি সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়ায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘বেবি টাইগার্স’ নামে পরিচিত একটি কোম্পানি নিউক্লিয়াস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে নবম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হয়। এই নয়টি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাহসী সৈনিকদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বদানকারী এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ছিলেন এই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সন্তান। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২য় ব্যাটালিয়নের একজন অফিসার হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই রেজিমেন্ট থেকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় অবস্থান অর্জন করেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাই শুধু একটি সামরিক ইউনিট নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব, সাহস ও আত্মত্যাগের এক জীবন্ত প্রতীক।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি সেনা ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্র করার সময় ১৭ জন বাঙালি অফিসার আত্মত্যাগ করেন। অন্যান্য র্যাঙ্কের ৯১৫ জন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গ করেন। অগণিত বাঙালি সৈনিকের এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আসে বাঙালির বহুদিনের আরাধ্য স্বাধীনতা। ফলে দেশ বিভাগের পর বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের সূচনালগ্নেই মেজর গনি যে স্বপ্ন বুকে লালন করেছিলেন, তা পূর্ণতা পায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।
মেজর মোহাম্মদ আবদুল গনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নাগাইশ গ্রামে। তিনি ছিলেন সুঠাম, বলিষ্ঠ দেহের এবং উদার মনের মানুষ। তার ব্যবহার ছিল অমায়িক, কথা বলার ভঙ্গি ছিল স্পষ্ট ও নির্ভীক। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি কখনো আপস করেননি।
১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলায় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার দিন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বোর্ন, মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খানসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান ঘোষণা দেন, “এখন থেকে বাঙালি সৈনিকরা বাংলা নয়, উর্দুতে কথা বলবে।” সঙ্গে সঙ্গে মেজর গনি প্রতিবাদ করে বলেন, “ক্ষমা করবেন স্যার, আমরা বাঙালি সৈনিকরা উর্দুতে কথা বলতে পারব না। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।” এই সাহসী অবস্থানের জন্যই তিনি ‘টাইগার গনি’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানও স্বীকার করেন মেজর গনির অবদান। তার মৃত্যুর পর এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “মেজর গনি সেনাবাহিনী ও জাতির জন্য যে সেবা করে গেছেন তার মূল্য অত্যন্ত বেশি।”
দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত কোনো সেনাবাহিনীর অবকাঠামো ছিল না। এই শূন্যতা পূরণে কুমিল্লা ও ঢাকায় সেনানিবাস গড়ে ওঠে। কুর্মিটোলায় প্রথম কুঁড়েঘর নির্মাণ করা হয়েছিল মেজর গনির জন্যই। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জন্য সৈনিক সংগ্রহ শুরু করেন। পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের মধ্য থেকে বাঙালি যুবক বাছাই করেন। ১৯৫০ সালের অক্টোবরে কুমিল্লায় প্রায় পাঁচ হাজার যুবকের সমাবেশ থেকে শতাধিক যুবক বাছাই করা হয়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অবহেলা ও শারীরিক অজুহাতে অবসর নিতে বাধ্য হলেও মেজর গনি থেমে থাকেননি। ১৯৫৪ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থা পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হন। পরবর্তীতে ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যাতে বাঙালি ছাত্ররা ছোটবেলা থেকেই সামরিক নেতৃত্বে গড়ে উঠতে পারে।
১৯৫৭ সালের ১১ নভেম্বর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশ্ব প্রাক্তন সৈনিক সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে মেজর আবদুল গনি ইন্তেকাল করেন। তার মরদেহ ঢাকায় এনে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় কুমিল্লা সেনানিবাসে সমাধিস্থ করা হয়। হাজারো মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
এই ক্ষণজন্মা জাতীয় বীর বঙ্গশার্দুল মেজর আবদুল গনিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, রাওয়া ক্লাব ও মেজর গনি পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সামরিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করছে। তবে সময় এসেছে, তাকে জাতীয় পর্যায়ে সম্মানের সঙ্গে স্বরণ করার। ইতিহাসের বিচারে মেজর গনি ছিলেন কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা নয়; তিনি বাঙালি সৈনিক পরিচয়ের স্থপতি, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর দেখানো পথ এবং প্রতিষ্ঠিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শক্ত ভিতের ওপরই গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, যা আজও বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।
লেখক:
মোহাম্মদ আনোয়ার, সদস্য সচিব, মেজর গণি পরিষদ
এমএসএম / এমএসএম
বঙ্গশারদুল মেজর গনি: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান
ফিরে দেখা দুই হাজার পঁচিশ
জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য: বিপন্ন জনপদ ও আমাদের করণীয়
ম্যাডাম খালেদা জিয়া নেই: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে বিবেক ও নৈতিকতা
সংকট কালের স্থিতিশীল নেতৃত্বে তারেক রহমান
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তা: তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন
স্বৈরাচার মরে না, বারবার ফিরে আসে
আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জনআস্থা: হাদীর রাজনৈতিক দর্শন