র্যাগিং নয়, সম্মানই হোক ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুটা হওয়ার কথা ছিল স্বপ্ন আর সম্ভাবনার এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু সেই শুরুতেই অনেক শিক্ষার্থীর সামনে এসে দাঁড়ায় ভয়, অপমান আর মানসিক চাপে ভরা বাস্তবতা। র্যাগিং নামের এই আচরণ কখনো প্রকাশ্যে আসে, কখনো থাকে নীরবে। কেউ সরাসরি এর শিকার হয়, কেউ আবার প্রতিদিন এর প্রভাব অনুভব করে। নিরাপদ ক্যাম্পাস, সম্মানজনক সম্পর্ক এবং মানবিক শিক্ষাঙ্গনের প্রত্যাশায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ ও ভাবনার কথাই তুলে ধরেছেন মবিনুল ইসলাম রাশা।
"র্যাগিংয়ের ভয় নয়, চাই নিরাপদ ও সম্মানজনক ক্যাম্পাস"
এস. এম. আফ্রিনা আদনিন
১ম বর্ষ, কৃষি অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়াই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে র্যাগিংয়ের ভয় যুক্ত হলে মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়। প্রকাশ্যে হোক বা আড়ালে, এমন আচরণ শিক্ষাজীবনের স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করে এবং নতুনদের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তা সব সময় সমানভাবে কার্যকর হয় না—বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। মেসে থাকা মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। মেসের পরিবেশ, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে তারা নানাভাবে মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া র্যাগিং সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে যে র্যাগিং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এখানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।র্যাগিংকে বন্ধুত্ব বা সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বন্ধুত্ব কখনো ভয়, অপমান বা জবরদস্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। নিরাপদ ও সম্মানজনক ক্যাম্পাস গড়তে হলে নিয়মের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা ও পারস্পরিক সম্মানের পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
"নীরব সহিংসতার অদেখা মুখ র্যাগিং"
হাদিসুর রহমান তাওহীদ
৪র্থ বর্ষ, বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীকেই এক ধরনের অপ্রকাশ্য বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যার নাম র্যাগিং। এটি সব সময় প্রকাশ্য অপমানের রূপ নেয় না, কিন্তু এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। সাভারের স্থানীয় হয়েও আমি নিজের বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর হাতে র্যাগিংয়ের শিকার হয়েছি। শুধু আমি নই, আমাদের ব্যাচের আরও কয়েকজন একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। সব সিনিয়র এক রকম নন- অনেকেই সহযোগী ও সহানুভূতিশীল। তবে কিছু শিক্ষার্থী আছেন, যারা নিজেদের প্রভাব দেখাতে নতুনদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন। পরিচয়পর্বের আড়ালে একসময় এমন একটি অঘোষিত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে নতুনদের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভয় তৈরি করা হতো। র্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার পর বিষয়টি আমি শিক্ষকের কাছে জানিয়েছিলাম। তিনি কঠোর অবস্থান নেন। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়েছে, প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। আমাদের বিভাগের শিক্ষকদের দৃঢ় ভূমিকার কারণে বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। র্যাগিং আসলে এক ধরনের নীরব সহিংসতা, যা বন্ধ করা সম্ভব সচেতনতা ও প্রশাসনিক কঠোরতার মাধ্যমে।
"র্যাগিংয়ের আশঙ্কাই অনেক নবীনকে বন্দী করে রাখে"
মিশকাতুল জান্নাত মিনহা
১ম বর্ষ, রসায়ন বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
নতুন শিক্ষার্থীদের অনেকেই সরাসরি র্যাগিংয়ের শিকার না হলেও এর আশঙ্কা ও মানসিক চাপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। এই ভয় অনেক সময় ঘটনার চেয়ে চারপাশের অভিজ্ঞতা ও গল্প থেকেই তৈরি হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো র্যাগিংয়ের শিকার হইনি। আমার বিভাগ বা ক্যাম্পাসেও চোখে পড়ার মতো কোনো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়নি। আমি মেসে থাকি না, বাসা থেকেই নিয়মিত যাতায়াত করি। ফলে মেসজীবনের অভিজ্ঞতা সরাসরি না থাকলেও বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। বন্ধুদের অনেকেই জানিয়েছেন, কিছু মেসে এখনো র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে এবং এতে তারা মানসিক চাপে ভোগে। র্যাগিংয়ের শিকার না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিনের যাতায়াতে সময় ও নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে। র্যাগিংয়ের আশঙ্কাই বড় কারণ, যার জন্য পরিবারও আমাকে মেসে থাকতে দিতে রাজি হয়নি। আমার মনে হয়, নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য পরিকল্পিত ওরিয়েন্টেশন এবং সিনিয়রদের সঙ্গে মেন্টরশিপভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি হলে অনেক ভয় দূর হতে পারে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না থাকলেও বন্ধুদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে বলা যায়, এই শঙ্কা এখনো অনেক নবীন শিক্ষার্থীর সঙ্গে নীরবে রয়ে গেছে।
"র্যাগিংয়ের নামে এই অমানবিকতা আমাদের ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি"
মো. মেরাজ হোসেন সজীব
৩য় বর্ষ, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া র্যাগিংয়ের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত একটি সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। প্রকাশ্যে না এলেও র্যাগিং নানা সূক্ষ্ম রূপে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। ব্যক্তিগতভাবে চরম র্যাগিংয়ের শিকার না হলেও আমার ব্যাচমেটদের অনেকেই সূক্ষ্ম মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ম্যানার শেখানোর নামে নবাগতদের অপমান কিংবা কর্তৃত্ব দেখানোর প্রবণতা প্রায় নিয়মিত দেখা যায়। এসব আচরণ অনেক সময় তুচ্ছ মনে হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। নতুন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসে গভীর প্রভাব পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে হতাশাজনক ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের। র্যাগিংয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের বদলে সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। র্যাগিং কোনোভাবেই ক্ষমতার প্রকাশ নয়; এটি নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়তে হলে প্রশাসনের দৃঢ়, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান অপরিহার্য।
এমএসএম / এমএসএম
র্যাগিং নয়, সম্মানই হোক ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি
ফ্রিজের বরফ জমা মাছ-মাংস দ্রুত নরম করার কৌশল
পূর্ণিমা রাতে লঞ্চভ্রমণ: নদী, জোছনা ও নিঃসঙ্গতার ত্রিভুজপ্রেম
দরজায় কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনীবার্তা
দরজায় কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনীবার্তা
ফেসবুক ছিল বিনোদনের জায়গা, এখন আয়ের মূল উৎস
তোমাদের মৃত্যুর দায় আমরা এড়াতে পারি না
সুফি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার ১ যুগ পার করল সুফি স্পিরিচুয়াল ফাউন্ডেশন
ব্যতিক্রমী ধারার আলো নেভার পথে
টেকসই কৃষির জন্য চাই জৈব বালাইনাশক
ঈদযাত্রা হোক দুর্ঘটনামুক্ত
রমজানে ভ্রমণে যে বিষয় মেনে চলা জরুরি