স্মার্টফোনের নেশায় শৈশব বিপন্ন: ‘ডিজিটাল মাদকে’ বুঁদ শিশু থেকে অভিভাবক
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির জয়জয়কারের আড়ালে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। স্মার্টফোনের নীল আলোর নেশায় মগ্ন হয়ে শিশুরা হারিয়ে ফেলছে তাদের প্রাণচঞ্চল শৈশব। পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অধিকাংশ শিশু মোবাইল ফোন ছাড়া কোনো খাবারই মুখে নিতে চাইছে না। অভিভাবকরাও অনেকটা বাধ্য হয়ে বা নিজেদের কাজ সহজ করতে শিশুর হাতে ফোন তুলে দিচ্ছেন। এর ফলে শিশু কী খাচ্ছে, কতটুকু চিবিয়ে খাচ্ছে বা খাবারের স্বাদ কেমন—সে সম্পর্কে তাদের কোনো বোধই তৈরি হচ্ছে না। এই অভ্যাসটি শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের শরীরে একাধিক জটিল রোগ সৃষ্টি করছে। দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের চোখের রেটিনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে খুব অল্প বয়সেই দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া, মোবাইল ফোনের নীল আলো শরীরের 'মেলাটোনিন' নামক হরমোন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে, যা শিশুদের ঘুমের চক্রকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং তারা খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠছে।
শারীরিক পরিশ্রম না থাকায় এবং বসে বসে স্ক্রিন দেখার ফলে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এটি পরবর্তীতে শিশুদের হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের ব্রেনের স্বাভাবিক বিকাশ বা পরিস্ফুটন থমকে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনের দ্রুত গতির ভার্চুয়াল জগতের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে শিশুরা বাস্তব জগতের ধীরগতির শিক্ষা বা কথা বলা শিখতে দেরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা অটিজমের মতো লক্ষণ প্রকাশ করছে এবং মানসিকভাবে অনেকটা প্রতিবন্ধীর মতো আচরণ নিয়ে বেড়ে উঠছে।
অন্যদিকে, বর্তমান প্রজন্মের বাবা-মাদের মধ্যেও স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দিনশেষে বাড়িতে ফিরে সন্তানদের সময় দেওয়ার বদলে অনেক বাবা-মা নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকছেন। এতে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে যে আত্মিক বন্ধন থাকার কথা ছিল, সেখানে এক বিশাল দেয়াল তৈরি হচ্ছে। শিশুরা নিজেদের অবহেলিত মনে করে আরও বেশি ফোনের দিকে ঝুঁকছে, যা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
আগেকার দিনে আমাদের পারিবারিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। ডাইনিং টেবিলে বসে সবাই মিলে গল্প করা, একে অপরের সমস্যার কথা শোনা এবং সম্মিলিতভাবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। এখনকার চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক—একই পরিবারের চারজন সদস্য পাশাপাশি বসে থাকলেও প্রত্যেকেই নিজের ফোনের ভার্চুয়াল জগতে ডুবে আছেন। একই ছাদের নিচে থেকেও তারা একে অপরের কাছে অপরিচিত। কারো মনে কী চলছে, কারো শরীর কেমন আছে—সেসব জানার চেয়ে ফোনের নোটিফিকেশন চেক করাটাই যেন আজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের অতি আদরের সন্তানদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যে পারিবারিক উষ্ণতা আর খোলামেলা পরিবেশ প্রয়োজন ছিল, তা আজ স্মার্টফোন নামক যন্ত্রটি পুরোপুরি গিলে খেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এখনই যদি অভিভাবকরা সচেতন না হন এবং শিশুদের ফোনের বদলে মাঠের খেলাধুলা ও বই পড়ার অভ্যাস না করান, তবে ভবিষ্যতে আমরা এক রুগ্ন ও আবেগহীন প্রজন্মের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। প্রযুক্তির ব্যবহার হোক প্রয়োজনে, আসক্তিতে নয়—এই হোক আমাদের বর্তমান সময়ের অঙ্গীকার।
এমএসএম / এমএসএম
স্মার্টফোনের নেশায় শৈশব বিপন্ন: ‘ডিজিটাল মাদকে’ বুঁদ শিশু থেকে অভিভাবক
র্যাগিং নয়, সম্মানই হোক ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি
ফ্রিজের বরফ জমা মাছ-মাংস দ্রুত নরম করার কৌশল
পূর্ণিমা রাতে লঞ্চভ্রমণ: নদী, জোছনা ও নিঃসঙ্গতার ত্রিভুজপ্রেম
দরজায় কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনীবার্তা
দরজায় কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনীবার্তা
ফেসবুক ছিল বিনোদনের জায়গা, এখন আয়ের মূল উৎস
তোমাদের মৃত্যুর দায় আমরা এড়াতে পারি না
সুফি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার ১ যুগ পার করল সুফি স্পিরিচুয়াল ফাউন্ডেশন
ব্যতিক্রমী ধারার আলো নেভার পথে
টেকসই কৃষির জন্য চাই জৈব বালাইনাশক
ঈদযাত্রা হোক দুর্ঘটনামুক্ত